হের ফন শিলার নিরামিষভোজী, অধূমপায়ী ও টিটোটেলার। চা, মদ আর মাংস তিনি বিশ বছর আগে পরিত্যাগ করেছেন। তখন তিনি মোটা ছিলেন, চোখের নিচে কালচে পোটলা ঝুলত। এখন তিনি একহারা, চামড়ায় যথেষ্ট লাবণ্য ফিরে পেয়েছেন। শক্তির বিচারে এখনো তাকে তরুণই বলা যায়, অথচ বয়েস হয়েছে সত্তর।
সেই যৌবন কাল থেকেই শারীরিক চাহিদাকে দমিয়ে রেখে মনের চাহিদাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন তিনি। মানুষ বা জীবিত কোনো প্রাণীর চেয়ে জড়পর্দাথকেই বেশি মূল্য দিয়েছেন। যে রাজমিস্ত্রী হাজার বছর আগে মারা গেছে, তার হাতে খোদাই করা একটা পাথর যে কোনো সুন্দরীর নরম দেহের চেয়ে বেশি উত্তেজিত করে তাঁকে। তিনি শৃংখলা পছন্দ করেন, কর্তৃত্ব ফলাতে ভালোবাসেন।
তাঁর বিশাল সংগ্রহে অমূল্য সব প্রাচীন বস্তু রয়েছে, সবই অন্য লোকদের আবিষ্কার করা। জীবনে এ একবার সুযোগ পেয়েছেন তিনি নিজে কিছু আবিষ্কার করার, একজন ফারাও-এর সমাধি ভেঙে ভেতরে ঢুকবেন, চার হাজার বছরের মধ্যে তিনিই হবেন প্রথম মানুষ যিনি নিজের চোখে দেখবেন কি আছে সেখানে। এ আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি আছেন হের ফন শিলার, পারেন না এমন কোনো কাজ নেই। এরইমধ্যে কিছু মানুষ মারা গেছে, আরো কিছু মারা গেলে তার কিছু আসে যায় না। কোনো মূল্যই তাঁর কাছে বেশি নয়।
প্রমাণ সাইজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলেন হের ফন শিলার। ঘন, কর্কশ, কালো চুলে আঙুল চালালেন। অবশ্যই কলপ লাগানো, শরীর বা চেহারার এতোটুকু যত্ন তাঁকে নিতেই হয়। কাঠের মেঘে ধরে এগিয়ে এসে কনফারেন্স রুমের দরজা খুললেন তিনি।
চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সবাই। টেবিলের মাথার দিকে এগিয়ে এলেন হের ফন শিলার, দাঁড়ালেন কার্পেট মোড়া নিচু ও ছোট একটা মঞ্চের উপর। এ মঞ্চটা সঙ্গে নিয়ে বেড়ান তিনি। মাত্র নয় ইঞ্চি উঁচু ওটা। পুরুষ ও মহিলাদের দিকে এ উঁচু মঞ্চ থেকে তাকান তিনি। বেশ কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকেন, সবাইকে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য। সবার চেয়ে উঁচু হয়ে থাকে তাঁর মাথা।
প্রথমে তিনি জ্যাক হেলমের দিকে তাকালেন। টেক্সান হেলম্ এক যুগ ধরে তাঁর কাজ করছে। অত্যন্ত বিশ্বস্ত, গায়ে গণ্ডারের মতো শক্তি, মনটাও ইস্পাতের মতো কঠিন। কোনো প্রশ্ন ছাড়াই যে কোনো আদেশ পালন করা তার প্রধান গুণ। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে যে কোনো কাজ দিয়েই পাঠানো হোক তাকে, সম্ভাব্য কম ঝামেলার মধ্যে কাজ সেরে নিরাপদে ফিরে আসবে।
এরপর হের ফন শিলার সুন্দরী মহিলার দিকে তাকালেন। উতে কেম্পার তার প্রাইভেট সেক্রেটারি। মনিবের সমস্ত ব্যক্তিগত দিকগুলো দেখেন তিনি। ওঁর অনুমতি ছাড়া ফন শিলারের সঙ্গে কেউ দেখা করতে পারে না। কেম্পার ফন শিলারের কমিউনিকেশন এক্সপাটও বটে। হাট-এর একদিকের দলে থরে থরে সাজানো ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্টগুলোর নিয়ন্ত্রণ ওঁর হাতে। বয়েস প্রায় চল্লিশ হলেও দেখে আরো কম মনে হয়। দেখতে খুবই সুন্দর।
ফন শিলারের স্ত্রী, ইনজেমার, আজ বিশ বছর হলো প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। সেই থেকে খালি জায়গাটা পূরণ করছেন কেম্পার।
টেবিলের উপর নিজের সামনে রেকর্ডিং ইকুইপমেন্ট নিয়ে বসেছেন কেম্পার তাঁকে ছাড়িয়ে ফন শিলারের দৃষ্টি গিয়ে পড়লো আরো দু জন কর্মচারীর উপর।
আদ্দিস আবাবা থেকে জেট রেজ্ঞার হেলিকপ্টার চড়ে নাইল গিরিখাদের চূড়ায় নিজেদের বেস ক্যাম্পে আজ সকালে পৌঁছেছেন হের ফন শিলার, হেলিকপ্টার থেকে নামার সময় আজই প্রথম কর্নেল নগুকে দেখেছেন। কর্নেল সম্পর্কে খুব কমই জানেন তিনি, তবে, হেলমের নির্বাচন মন্দ হবে না বলে ধরে নিয়েছিলেন। কর্নেলের কাজ সম্পর্কে হেলম্ সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও, তিনি নিজে ঠিক তৃপ্ত হতে পারেন নি। এরই মধ্যে দায়িত্ব পালনে গাফিলতির পরিচয় দিয়েছেন কর্নেল নগু। হারপার নিকোলাস আর ঈজিপশিয়ান মেয়েটাকে মুঠোয় পেয়েও বেরিয়ে যেতে দিয়েছেন। আফ্রিকায় বহু বছর ধরে অপারেশন চালাচ্ছেন ফন শিলার, কালো মানুষদের উপর তার কোনো শ্রদ্ধাবোধ জন্মায় নি। কর্নেল নগু তাকে সন্তুষ্ট করতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। তবে আপাতত তার সার্ভিস দরকার হবে। হাজার হোক দক্ষিণ গোজামের মিলিটারি কমান্ডার কর্নেল। চিন্তার তেমন কিছু নেই, কাজ পুরালে উটকো ঝামেলা সরিয়ে ফেলা যাবে। হেলই সে-ব্যবস্থা করবে। কীভাবে কী করা হলো বিশদ জানতে চাইবেন না ফন শিলার।
টেবিলে দাঁড়ানো শেষ লোকটার দিকে তাকালেন তিনি। এ আর এক লোক, আপাতত যাকে তাঁর খুব দরকার। নাহুত গাদ্দাবিই প্রথম তাঁকে সপ্তম স্ক্রোল সম্পর্কে সচেতন করেন। যতটুকু তিনি শুনেছেন, ওই স্ক্রোলের সূত্র ধরে একজন ইংরেজ লেখক একটা উপন্যাস লিখেছেন। না, উপন্যাসটি তিনি পড়েননি। এ সব ছাইপাঁশ কখনোই তাঁর পড়তে ইচ্ছে করে না। কথাটা সত্যি, নাহুত সচেতন না করলে একজন ফারাও-এর গুপ্তধন উদ্ধারের এ সুযোগ থেকে তিনি বঞ্চিত থেকে যেতেন।
আদি স্ক্রোলটা অনুবাদ করেন দুরেঈদ আল সিমা, কাজটা শেষ হওয়া মাত্র তাঁর সঙ্গে দেখা করে নাহুত। ইতিহাসে রেকর্ড করা হয় নি এমন একজন ফারাও আর তাঁর সমাধির অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা। সেই থেকে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন তাঁরা। ডুরেঈদ আর তার স্ক্রোলের সূত্র ধরে তদন্ত চালাচ্ছিলেন, তাদের তদন্তের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে জানার পর নাহুতকে তিনি ওদের ব্যবস্থা করতে বলেন, বলেন স্ক্রোলটা তার চাই।
