রিসিভার নামিয়ে রাখতেই কলিংবেল বেজে উঠলো।
দরজা খুলে দিতে ভেতরে ঢুকলো রোয়েন, কোটের পকেট থেকে হলুদ একটা প্যাকেট বের করে দেখালো নিকোলাসকে। আপনি সত্যি মাস্টার ফটোগ্রাফার। সবগুলো ছবি নিখুঁত হয়েছে। ফলকের প্রতিটি ক্যারেক্টর খালি চোখে পড়তে পারছি আমি। টাইটার সঙ্গে খেলাটায় আবার আমরা ফিরে এসেছি।
ডেস্কের উপর গ্লসি ফটোগ্রাফগুলো সাজালো ওরা, মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আপনি দেখছি ডুপ্লিকেটও করিয়েছেন গুড। নেগেটিভগুলো আমার ব্যাংকের সেফ ডিপোজিটে চলে যাবে। দ্বিতীয়বার ওগুলো হারাবার ঝুঁকি আমরা নিতে পারি না।
নিকোলাসের বড় সাইজের ম্যাগনিফাইং গ্লাস নিয়ে প্রতিটি প্রিন্ট এক এক করে স্টাডি করলো রোয়েন, ফলকের চারটে সাইডেরই একটা করে সবচেয়ে পরিষ্কার প্রিন্ট আলাদা করলো। এগুলো ব্যবহার করব আমরা। রাবিংগুলো না থাকায় খুব একটা অসুবিধে হবে না। তারপর হায়ারোগ্লিফিক্স-এর একটা অংশ পড়তে শুরু করলো, গোক্ষুর কুণ্ডলী ছাড়িয়ে মণি পরানো ফণা তুললাম। প্রভাতের তারাগুলো তাঁর চোখে ঝিলিক মারলো। তার কালো আর পিচ্ছিল জিভ তিনবার চুমো খেলো বাতাসকে। উত্তেজনায় গরম আর লালচে হয়ে উঠলো ওর চেহারা। এখানে টাইটা কি বলছে বুঝতে পারছি না। উদ্বিগ্ন ও অস্থির হয়ে উঠলো ও।
ও-সব এখন রেখে দিন, একটু কঠিন সুরে বলল নিকোলাস। আপনাকে আমি চিনি, একবার শুরু করলে সারাদিন আর উঠবেন না। ইয়র্কে যেতে হলে এখনো রেঞ্জ রোভারে বহু রাস্তা পাড়ি দিতে হবে, এদিকে আবহাওয়ার খবর বলছে বাইরে তুষারপাত হবে। অন্তত অ্যাবি গিরিখাতের চেয়ে ভিন্ন কিছু তো উপভোগ করা যাবে!
হঠাৎ কী যেনো মনে পড়ায় একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়লো রোয়েন। হ্যাঁ। মাঝেমধ্যে আমি একটু বেশি বেশিই করে ফেলি। দাঁড়িয়ে পড়লো রোয়েন, যাওয়ার আগে কি দেশে একটা ফোন করতে পারি?
অবাক হলো নিকোলাস। দেশে মানে কায়রোতে?
হ্যাঁ–মানে–ডুরেঈদের পরিবার তো ওখানে–
আরে, এটা আবার বলতে হয় নাকি! ফোন আছে ওখানে, যতো খুশি করুন। নিচে, কিচেনে আছি আমি। রওনা হওয়ার আগে এক চাপ চা না খেলেই নয়।
আধা ঘণ্টা পরে চেহারায় একরাশ অপরাধবোধ নিয়ে নিচে নেমে এলো রোয়েন। সরাসরি নিকোলাসের দিকে তাকিয়ে বলল, ভয় লাগছে। কিন্তু একটা কথা না বললেই নয়!
বলুন, নিকোলাস বলে।
দেশে যেতে হবে আমাকে কায়রোতে। অবাক বিস্ময়ে ওর দিকে তাকালো। নিকোলাস। অল্প কিছুদিনের জন্য, দ্রুত বলে চলে নিকোলাস। ডুরেঈদের ভাইয়ের সাথে কথা বললাম মাত্র। কিছু কাজ পরে আছে ওখানে।
কিন্তু একা একা আপনার ওখানে যাওয়াটা আমার মনঃপুত হচ্ছে না, মাথা নাড়ে নিকোলাস। অন্তত গতবার যা হলো, তারপর?
আপনার কথা সত্য হলে–নাহুত গাদ্দাবি যদি বেঈমান হয়, তবে তো আর কোনো চিন্তা নেই। সে এখন ইথিওপিয়ায়।
তারপরেও, ব্যাপারটা ঠিক পছন্দ হলো না। টাইটার খেলায় আপনি হলেন আমার চাবিকাঠি।
অনেক ধন্যবাদ। গলার সুরে ব্যঙ্গ ফুটিয়ে তুললাম রোয়েন। কেবল এ জন্যই আমার জন্য চিন্তা করেন?
না, সত্যি করে বললে, আপনার সান্নিধ্যে থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
আরে, আপনি টের পাওয়ার আগেই আমি চলে আসবো। মাত্র কয়দিনের ব্যাপার। আর তাছাড়া, ব্যস্ত থাকার বহু উপায় আপনার হাতের নাগালে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিকোলাস বলে, আপনাকে ঠেকানো আমার সাধ্য নয়। কখন রওনা হচ্ছেন
আজই সন্ধের ফ্লাইটে।
একটু যেনো তাড়াহুড়ো করে ফেললেন। আজই মাত্র এলাম। চলুন, আপনাকে নামিয়ে দিয়ে আসি এয়ারপোর্টে।
মাথা নাড়ে রোয়েন। না, নিকি। আমি ট্রেনে যেতে পারবো। হিথরো আপনার বিপরীত দিকে।
তবুও আমি যাবো! নিকোলাস নাছোরবান্দা।
বিকেলে রোয়েনকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেওয়ার সময় নিকোলাস বলল, কর্নেল মারিয়াম কিদেনের মাধ্যমে আমার বন্ধু মেক নিমুরের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। আমার প্ল্যানে মূল চাবিই হলো মেক। তার সাহায্য ছাড়া টাইটার সঙ্গে খেলাটায় আমরা অংশগ্রহণই করতে পারব না।
এয়ারপোর্ট বিল্ডিঙে অদৃশ্য হওয়ার আগে রোয়েন বলল, আমি কায়রো পৌঁছে জানাবো। আপনিও তাই, নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে ফোন করবেন।
রোয়েন চলে যেতেই অদ্ভুত একটা দুঃখবোধ ঘিরে ধরলো নিকোলাসকে। যেনো কি একটা হারিয়েছে সে। পরক্ষণেই, মনের গহীন কোণে বেজে উঠলো সতর্কঘণ্টি। খারাপ কিছু একটা ঘটতে চলেছে। রোয়েন মিশরে পৌঁছলেই ব্যাপারটা শুরু হবে। কিন্তু কিছুতেই অনুমান করতে পারছে না নিকোলাস, ব্যাপারটা কি হতে পারে।
ওহ্। দয়া করে ওর কোনো ক্ষতি করো না। নিজের অজান্তেই জোরে জোরে বলল নিক, কার উদ্দেশ্যে এটা অবশ্য বোঝা গেল না। একবার মনে হলো, জোর করে রোয়েনকে ফিরিয়ে আনে। কিন্তু কোন অধিকারে?
পছন্দ হলো না ব্যাপারটা, বিড় বিড় করে নিজের মনেই বলল নিকোলাস।
*
কর্মচারীরা সবাই জানে ভদ্রলোক তাদের কাছ থেকে ঠিক কি আশা করেন। প্রতিটি জিনিস যেমনটি চান তেমনটিই পেলেন তিনি। কোয়ানসেট হাট এর চারদিকে সপ্রশংস দৃষ্টি বুলালেন হের ফন শিলার। বস-এর আগমন উপলক্ষ্যে বেসটাকে ভালোভাবেই সাজিয়েছে হেলম্।
লম্বা পোর্টেবল বিল্ডিঙের অর্ধেকটাই দখল করে রেখেছে তাঁর নিজের প্রাইভেট কোয়ার্টার। ভেতরে জীবাণুনাশক স্প্রে আর এয়ার ফ্রেশনার ব্যবহার করা হয়েছে। কাবার্ডে ঝুলছে তার কাপড় চোপড়, কসমেটিক্স আর মেডিসিন সাজানো হয়েছে : বাথরুম কেবিনেটে। প্রাইভেট কিচেনে সব রকম ইকুইপমেন্ট রাখা হয়েছে, তার প্রিয় ডিশ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণেরও কোনো অভাব নেই। সঙ্গে করে নিজের চাইনিজ শেফকেও তিনি নিয়ে এসেছেন।
