কিন্তু আপনি… রেগে গিয়ে ফোঁস করে ফণা তুললাম রোয়েন, তবে নিকোলাস আবার ওর হাতে জোরে চাপ দিতে থেমে গেল।
আপনি যেমন বলছেন, যা কিছু ঘটেছে তার জন্য আমাদের অবহেলাই সম্ভবত দায়ী, বলল নিকোলাস। তবে আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি হয় নি, ক্ষতি যা হবার ক্যাম্প স্টাফ আর সন্ন্যাসীদের হয়েছে। ওরা বেশ কয়েকজন আমাদের সঙ্গে ছিল, সবাই মারা গেছে। আদ্দিসে পৌঁছে কর্তৃপক্ষের কাছে ফুল স্টেটমেন্ট দেব আমি।
আশা করি আপনি কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনছেন না?
কারো বিরুদ্ধেই আমাদের কোনো অভিযোগ নেই, কর্নেল নগু, বলল নিকোলাস। আপনার বিরুদ্ধে তো নয়ই। খাদের ভেতর শুফতারা আছে, এ কথা বলে আপনি আমাদেরকে সাবধান করে দিয়েছিলেন। তাছাড়া, আপনি যেখানে উপস্থিত ছিলেন না, এ সব ঠেকাতেন কীভাবে?
অসংখ্য ধন্যবাদ, মি. নিকোলাস। কর্নেলকে সন্তুষ্ট দেখালো। এবার বলুন, স্যার, আপনাদের জন্য কি করতে পারি আমি?
মনে মনে গাল দিল নিকোলাস। তারপর জোর করে হাসলো ও। দেখুন আপনি আমার এ উপকারটা করতে পারেন কিনা। ডানডেরা জলপ্রপাতের নিচের গুহায় আমি আমার ব্যাগ আর হান্টিং ট্রফি ফেলে এসেছি। ব্যাগটায় আমাদের পাসপোর্ট আর ট্যাভেলার্স চেক আছে। একজন লোককে পাঠিয়ে ওগুলো আনিয়ে দিতে পারলে সত্যি কৃতজ্ঞ বোধ করব। হবু আততায়ীকে দিয়ে এতো নগণ্য একটা কাজ করাচ্ছে ভেবে হাসি পেল নিকোলাসের।
কর্নেল নগু আপাতত সরে গেলেন। জিওফ্রেকে নিকোলাস জিজ্ঞেস করলো, এখানে তুমি পৌঁছতে কীভাবে?
হালকা প্লেন নিয়ে ডেবরা মারিয়ামে আসি। ওখানে একটা ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং ফিল্ড আছে। কর্নেল গু দেখা করেন, আর্মি জীপে চড়িয়ে এখানে নিয়ে আসেন আমাদেরকে। পাইলট আর প্লেন ডেবরা মারিয়ামে অপেক্ষা করছে।
ক্যাম্পের একজন সার্ভেন্ট এসে খবর দিল, নিকোলাস আর রোয়েনের গোসলের জন্য গরম পানি দেওয়া হয়েছে।
সত্যি বলছি তোমাদের দু জনকে জীবিত দেখে ভারী আনন্দ হচ্ছে, বলে রোয়েনের কাঁধ চাপড়ে দিল জিওফ্রে।
*
পরদিন সকালে ডেবরা মারিয়াম থেকে প্লেনে চড়ে আদ্দিস আবাবায় ফিরছে ওরা। পাইলটের সঙ্গে সামনে বসেছে জিওফ্রে, রোয়েনকে নিয়ে নিকোলাস পেছনে। কাল রাতে নিভৃতে আলাপ করার সুযোগ হয় নি, প্লেনে বসে সেটা সেরে নিচ্ছে ওরা দু জন। ডিক-ডিকের ছালটা রয়েছে নিকোলাসের সিটের নিচে। কাল রাতেই একজন লোককে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কর্নেল নগু, আজ সকালে ব্যাগ আর ছাল ফিরে পেয়েছে ও।
হোয়াইট হলো থেকে সেই থেকে একের পর এক ফ্যাক্স আসছে। এখন যখন ওদের খোঁজ পাওয়া গেছে, ইথিওপিয়ার পুলিস কমিশনার বলেছেন তিনি নিজে নিকোলাস ও রোয়েনের সঙ্গে কথা বলবেন। প্লেনে বসে ওরা দু জন সিদ্ধান্ত নিল, বোরিসের মৃত্যুর সঙ্গে মেক নিমুরকে কোণাখানে। জড়ানো চলবে না। আরো সিদ্ধান্ত হলো, পেগাসাসকে তো বটেই, ইথিওপিয়ান কর্তৃপক্ষকেও কোনোভাবে সতর্ক করা হবে না। ওদের প্রতিদ্বন্দ্বি পেগাসাস, এটা ওরা জানে বলে স্বীকার করলে প্রতিপক্ষ ভয়ংকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে। আর ইথিওপিয়া কর্তৃপক্ষ যদি বুঝতে পারে মামোসের গুপ্তধন পাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, ওদের ভিসা বাতিল হয়ে যাবে, এমনকি ওদেরকে ইথিওপিয়ায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করাও হতে পারে। অজ্ঞতার ভান করে নিরীহ ভালো মানুষ সাজাই সব দিক থেকে ভালো।
নিকোলাস আর রোয়েনের ব্যাপারে লন্ডন এতো বেশি গুরুত্ব দিয়েছে যে, ব্রিটিশ অ্যামব্যাসাডর ওদেরকে নিজের বাড়িতে অতিথি হওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন জিওফ্রের মাধ্যমে। তিনতলায় পাশাপাশি দুটো বেডরুম ছেড়ে দেওয়া হলো ওদেরকে।
হিজ এক্সিলেন্সির বাড়িতে তোমাদের কোনো অসুবিধে হবে না, জানালো জিওফ্রে।
*
ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের বাড়িটা নির্মিত হয়েছিল পুরোনো সম্রাট হাইলে সেলাসির আমলে, ১৯৩০ সালে মুসোলিনি ইথিওপিয়া অধিগ্রহণের আগে। শহরতলীতে চমৎকার কলোনিয়াল ঘরানার স্থাপত্যরীতিতে তৈরি। বড়ো বারান্দা, লন। এতো বছরেও ম্যানশনের কোনো ক্ষতি হয় নি।
পাশের কামরার সংলগ্ন বাথরুম থেকে রোয়েনের শাওয়ার সারার আওয়াজ শুনলো নিকোলাস নিজের বাথটাবে আধ শোয়া অবস্থায়। খানিক পর বেডরুম থেকে ডাক্তারের গলা ভেসে এলো, রোয়েনের হাঁটু প্রসঙ্গে কথা বলছেন।
রাষ্ট্রদূত স্যার অলিভার ওদের অপেক্ষাতেই বারান্দায় বসে ছিলেন। লাল-মুখো, সাদা চুলো মানুষ একজন। জিওফ্রে দ্রুত এগিয়ে এসে ওদের পরিচয় করিয়ে দিল, সঙ্গে ওর পত্নী সিলভিয়া টেনেন্ট। এছাড়াও, আরো জনা বারো অতিথি রয়েছে ডিনারে।
অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিত্বের মধ্যে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে ইথিওপিয়ার পুলিশ কমিশনার জেনারেল ওবেঈদকে।
অ্যামব্যাসাডর নিজে নিকোলাস ও রোয়েনের সঙ্গে জেনারেলের পরিচয় করিয়ে দিলেন। জেনারেল ওবেঈদ দীর্ঘদেহী মানুষ, ব্লু মেস ইউনিফর্ম তাঁকে মানিয়েছেও খুব। হ্যান্ডশেক করার সময় রোয়েনের হাতের উপর কপালটা প্রায় ঠেকিয়ে ফেললেন ভদ্রলোক। খুবই রসিক আর হাসিখুশি মানুষ তিনি।
মনে করিয়ে দেয়ার সুরে বললেন, কাল আপনাদের সঙ্গে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট। স্রেফ একটা রুটিন ইন্টারভিউ, আপনাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই।
হ্যাঁ, অবশ্যই, বলল নিকোলাস। কখন যেতে বলেন, জেনারেল?
