নিকোলাস, আপনি যান…আমাকে রেখে আপনি উঠে যান।
সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলো নিকোলাস।
পালগ নাকি! চোখ রাঙালো ও।
চূড়া আর বেশি দূরে নয়, জিদ ধরলো রোয়েন। বোরিসের লোকজনকে ডেকে আনবেন, ওরা আমাকে তুলে নিয়ে যাবে।
ওরা ওখানে না-ও থাকতে পারে। প্রক্সির লোকজন আপনাকে পেয়ে যেতে পারে। টলতে টলতে সোজা হলো নিকোলাস। উঠুন! ধমক দিল ও। হাত ধরে সাহায্য করলে দাঁড়াতে।
নিকোলাস পা ফেলছে, রোয়েন গুনছে। নিকোলাসেরই নির্দেশ। একশো পর্যন্ত গোনা শেষ হলেই থেমে বিশ্রাম নিচ্ছে ও। দম ফিরে পেলেই আবার শুরু করছে যাত্রা। নিকোলাসের গলাটা দু হাতে জড়িয়ে রেখেছে রোয়েন, গুনছে ওর কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে। গোটা বিশ্ব যেনো কুঁকড়ে ওদের সামনে সরু ট্রেইলে পরিণত হয়েছে। ট্রেইলের একপাশে যে পাহাড়-প্রাচীর মাথাচাড়া দিয়েছে বা অন্য পাশে রয়েছে গভীর খাদ, সে-সম্পর্কে দু জনের কেউই সচেতন নয়। নিকোলাস হোঁচট খেলে বা ঝাঁকি দিয়ে পিঠের বোঝাটা অ্যাডজাস্ট করতে হাঁটুর ব্যথা ইলেকট্রিক শকের মতো রোয়েনের সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। দাঁতে দাঁত পিষে সহ্য করতে ও নিকোলাসকে বুঝতে দিতে চায় না, চোখ বুজে গুনছে।
এরপর বিশ্রাম নেওয়ার সময় পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে থাকে নিকোলাস, জানে শুয়ে পড়লে আর উঠে বসতে পারবে না। তারপর বিশ্রাম নেওয়ার সময় রোয়েনকে পিঠ থেকে নামালো না। কারণ আবার পিঠে তোলা বড় বেশি কষ্টকর।
প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, নিকোলাসের কানে ফিসফিস করলো রোয়েন। আজ রাতের মতো এখানেই থামুন। আপনি নিজেকে খুন করে ফেলছেন।
আর একশো কদম, অস্ফুটে বলল নিকোলাস।
না, নিকোলাস। নামিয়ে দিন আমাকে।
জবাবে পাথুরে পাঁচিল থেকে কাঁধ সরিয়ে টলমল করতে করতে সোজা হলো_ নিকোলাস, ট্রেইল বেয়ে ওপরে উঠছে। কাউন্ট! নির্দেশ দিল।
ফিফটি-ওয়ান, ফিফটি-টু, নির্দেশ পালন করলো রোয়েন। হঠাৎ করে পায়ের তলায় বিরাট একটা পরিবর্তন ঘটলো, ফলে পড়ে যাবার অবস্থা হলো নিকোলাসের। মাতালের মতো বিক্ষিপ্ত পা ধাপে তুলতে চেয়েছিল, কিন্তু আর কোনো ধাপ ওখানে নেই, পথটা অকস্মাৎ সমান হয়ে গেছে।
কোন রকমে ভারসাম্য রক্ষা করলো নিকোলাস। খাদের কিনারায় টলমল করছে শরীরটা, গোধূলির আবছা অন্ধকার সামনে, কি দেখছে ভালো করে বুঝতে পারছে না। অন্ধকারে আলো আছে, তবে ধারণা করলো চোখে ভুল দেখছে ও। তারপর কানে এলো লোকজনের আওয়াজ। মাথাটা ঝাঁকালো নিকোলাস, বাস্তবে ফিরে আসতে চাইছে।
ওহ, ডিয়ার গড! নিকোলাস, ওহ নিকোলাস! আপনি পেরেছেন! আমরা চুড়ায়! ওই তো আমাদের ভেহিকেল! আপনি জিতেছেন, নিকোলাস!
কথা বলতে চাইছে নিকোলাস, কিন্তু গলা শুকিয়ে যাওয়ায় কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। আলোটার দিকে এগুচ্ছে ও, ওর পিঠ থেকে চিৎকার জুড়ে দিল রোয়েন।
এদিক আসুন, প্লিজ! প্লিজ আমাদেরকে সাহায্য করুন! প্রথমে ইংরেজিতে, তারপর আরবিতে। প্লিজ সাহায্য করুন!
আঁতকে ওঠার আওয়াজ হলো, তারপরই শোনা গেল লোকজনের ছুটোছুটির শব্দ। ধীরে ধীরে নিচু হলো নিকোলাস, নরম ঘাসে রোয়েনকে শুইয়ে দিল। গাঢ় ছায়ামূর্তিরা ঘিরে ধরল ওদেরকে। তারপর টর্চের আলো পড়লো নিকোলাসের মুখে, বিশুদ্ধ ইংরেজিতে কথা বলে উঠলো পুরানো বন্ধু জিওফ্রে টেনেন্ট। হ্যালো, নিকোলাস? নাইস সারপ্রাইজ। আদ্দিস আবাবা থেকে আমি তোমার লাশের খোঁজে এসেছি। শুনলাম তুমি নাকি মারা গেছ, হাহ?
হ্যালো, জিওফ্রে! এতো কষ্ট করার জন্য ধন্যবাদ, দোস্ত।
দুটো ক্যাম্প চেয়ার আনতে বলল জিওফ্রে, যত্ন করে তাতে বসানো হলো নিকোলাস আর রোয়েনকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে দু জনের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো ধূমায়িত কফির মগ। খানিক পর নিকোলাস বলল, কোত্থেকে কী শুনেছ বলো আমাকে, জিওফ্রে। এখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ।
প্ৰথম খবর পাই সুদান সীমান্তের কাছে নদী থেকে তোমার গাইড বোরিসের লাশ পাওয়া গেছে, বুলেটে ঝাঁঝরা।
রোয়েনের দিকে তাকালো নিকোলাস, ভুরু কুঁচকে সাবধান করে দিল। তার সম্পর্কে শেষ খবর জানি আমরা, একা একটা স্কাউটিং এক্সপিডিশনে বের হলো। চার রাত আগে আমাদের ক্যাম্প হামলা করে শুফতারা, সে-ও হয়তো তাদের সামনে পড়ে যায়।
হ্যাঁ, তোমাদের উপর হামলার খবরও পেয়েছি আমরা। কর্ণেল নগু রেডিও মেসেজ পাঠিয়েছিলেন আদ্দিসে।
লোকজনের ভিড়ে কর্নেল নও রয়েছেন, ভিড় ঠেলে এগিয়ে না আসা পর্যন্ত তাঁকে ওরা দেখতে পেল না। ক্যাম্প লণ্ঠনের আলোয় এসে দাঁড়ালেন তিনি, তাঁর দিকে চোখ পড়তে শিউরে উঠে আড়ষ্ট হয়ে গেল রোয়েন। ও কিছু বলে ফেলবে, এ ভয়ে ওর হাতটা ধরে জোরে চাপ দিল নিকোলাস।
আপনাকে দেখে বড়ই আনন্দ বোধ করছি, মি. নিকোলাস, কর্নেল নুগু শাদা দাঁত বের করে অমায়িক হাসলেন। আমাদের সবাইকে আপনি ভয়ানক দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলেন!
সেজন্য ক্ষমা চাই, বিনয়ের অবতার সাজলো নিকোলাসও।
প্লিজ, স্যার, বললেন কর্নেল, ভুল বুঝবেন না। পেগাসাস এক্সপ্লোরেশন-এর তরফ থেকে আমরা একটা রিপোর্ট পাই, তাতে বলা হয়েছে একটা ব্লাস্টিং অ্যাক্সিডেন্টের মধ্যে ড়ে যান আপনারা। এক্সপ্লোরেশন কোম্পানির জ্যাক হেলম্ যখন আপনাদেরকে সাবধান করে বলেন যে খাদের ভেতর তারা পাথর বসাচ্ছে, আমি তখন ওখানে উপস্থিত ছিলাম।
