শুধু পানি খেয়ে রাত কাটাব? মাথা নাড়লো নিকোলাস। বাম-ব্যাগ থেকে টর্চ বের করলো, গুহার মেঝে থেকে খুঁজে নিল মুঠো আকৃতির একটা পাথর। টর্চের আলো উপর দিকে তাক করতেই অসংখ পায়রার ডানা ঝাঁপটানোর আওয়াজ উঠলো। কার্নিসে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে ওগুলো। লক্ষ্যস্থির করে পাথরটা ছুঁড়লো নিকোলাস। এক ঢিলে তিন-চারটে পায়রা জখম হলো, তাড়াতাড়ি ছুরি বের করে সব কয়টাকে জবাই করলো ও। রোয়েনের দিকে তকিয়ে হাসলো। রোস্ট খেতে কেমন লাগবে গৃহকত্রীর?
পায়রাগুলোকে আগুনে সেদ্ধ করার সময় রোয়েন জিজ্ঞেস করলো, আমাদের চুরি যাওয়া কাগজপত্র যে পেগাসাসের হাতে পড়েছে তাতে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই, তাই না?
নেই, বলল নিকোলাস। জলপ্রপাতের উপর ওদের বেস ক্যাম্পে অ্যান্টেনা দেখেছি, মনে আছে? আমাদের ফটো আর কাগজপত্র টেলিফ্যাক্স করে জ্যাক তার বসের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।
তার মানে পেগাসাসের মালিক ট্যানাস-এর সমাধিতে পাওয়া ফলক সম্পর্কে সবই জানে এখন। আর সপ্তম স্ক্রোল তো আগেই পেয়েছে। লোকটা যদি নিজে ঈজিপ্টোলজিস্ট না-ও হয়, তেমন একজনকে ভাড়া করতে পারে।
আমার ধারণা লোকটা হায়ারোগ্লিফিক্স নিজেই পড়তে পারে। আমার আরো ধারণা, নোকটা নিশ্চয়ই একজন কালেক্টর হবে। এদের টাইপ আমার জানা আছে। অবসেশনে ভোগে, ম্যানিয়াক হয়ে ওঠে।
হ্যাঁ। এদের আমি চিনি। একজন তো আমার নিকটেই বসে এখন!
নাহ্! নিকোলাস হাসে। এদের তুলনায় আমি কিছুই না। জানি, বাকি দু জনের নাম ডুরেঈদের তালিকায় ছিল।
পিটার ওয়ালশ আর হের ফন শিলার।
দু জনই খুনী কালেক্টর, বলল নিকোলাস। ফারাও মামোসের ট্রেজার পাবার চেষ্টায় মানুষ খুন করতে ওদের বাধবে না।
রোয়েন বলল, কিন্তু আমি ওঁদের সম্পর্কে যত দূর জানি, দু জনেই বিলিওনেয়ার।
টাকার সঙ্গে খুব একটা সম্পর্ক নেই, বলল নিকোলাস। এই গুপ্তধন ওরা কেউ পেলে ছোট্ট একটা আইটেমও কখনো বিক্রি করবে না। ভল্টে লুকিয়ে রাখবে, দেখতে দেবে না কাউকে। একা একা উপভোগ করবে ব্যাপারটা। অনেকটা স্বমেহনের মতো ব্যাপার।
কি ধরনের শব্দ চয়ন! রোয়েন প্রতিবাদ জানায়।
বিশ্বাস করুন। ব্যাপারটা যৌন উত্তেজনার সাথে সম্পর্কিত। অনেকটা সিরিয়াল কিলারদের অনুরূপ।
যে কোনো মিশরীয় পুরাকীর্তি আমি পছন্দ করি, কিন্তু ওরকম কোনো আকাক্ষা কল্পনাও করতে পারি না।
বুঝতে হবে–এরা কোনো সাধারণ লোক নয়। সম্পদের জোড়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এরা। যা ইচ্ছে, তাই পেতে পারে। এতেই তারা একটা অপার্থিব আনন্দ পায়।
এই পেগাসাসের পেছনে যে-ই থাকুক, সে তো তবে পাগল, মন্তব্য করলো রোয়েন।
পাগলের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক, বলল নিকোলাস। আমরা বিশাল ধনী একটা অসুস্থ ম্যানিয়াকের পাল্লায় পড়েছি।
*
পায়রার মাংস দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারলো ওরা। তারপর কিছু না বলে গুহার পেছন দিকে চলে গেল রোয়েন, দেখেও না দেখার ভান করলো নিকোলাস। খানিক পর রোয়েন ফিরে আসতে কিছু না বলে নিকোলাসও গেল, রোয়েন ভান করলো লক্ষ্য করছে না। আরো খানিক পর পালা করে কাপড় চোপড় খুলে জলপ্রপাতের পানিতে গোসল করে এলো দু জন।
গুহাটা থেকে বের হওয়ার আগে পরস্পরের ক্ষত পরীক্ষা করলো ওরা। নিকোলাসের খুলির জখম দ্রুত সেরে উঠছে, কিন্তু রোয়েনের হাঁটুর অবস্থা কালকের মতোই খারাপ। ব্যানড্যানাটা আবার বেঁধে দেওয়া ছাড়া করার মতো কিছু নেই নিকোলাসের।
বাম-ব্যাগ আর ডিক-ডিকের ছাল এখানে ফেলে রেখে যেতে হচ্ছে, নিকোলাসকে। শরীরের সঞ্চিত শক্তি খরচ হতে শুরু করেছে, অতিরিক্ত এক পাউন্ড বোঝাও কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে, চূড়ায় পৌঁছুনোর আগে ট্রেইলের উপরই ঢলে পড়তে পারে শরীর। ডে-প্যাকে ক্যামেরাসহ তিন রোল ডেভলপ না করা ফিল্ম ছিল, প্রতিটি প্লাস্টিক ক্যাপসুলে ভরা। ডে-প্যাকে ছিল বলেই প্রক্সির খুনীদের হাতে পড়েনি ওগুলো। ট্যানাস সমাধির ফলকে পাওয়া হায়ারোগ্লিফিক্স-এর একমাত্র রেকর্ড এগুলো, হারাবার ঝুঁকি নিকোলাস নিতে পারে না। কাজেই খাকি শার্টের বুক-পকেটে ভরে বোতাম লাগিয়ে দিল। ব্যাগ আর ছাল গুহার পেছন দিকের একটা ফাটলে গুঁজে রাখলো, পরে সুযোগ মতো নিয়ে যাবে।
প্রস্তুতি নেয়ার পর শুরু হলো ওদের সবচেয়ে কঠিন যাত্রা। ট্রেইলের এ শেষ অংশটুকু অসম্ভব দুর্গম। প্রথম দিকে নিকোলাসের কাঁধে হাত রেখে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলো রোয়েন। কিন্তু মাত্র এক ঘণ্টা পরই পরাজয় স্বীকার করলো, বলল, আর পারছি না।
কে বলেছে পারতে হবে? রোয়েনের সামনে পেছন ফিরে বসে পড়লো নিকোলাস।
আবার রওনা হবার পর দেখা গেল বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ঘন ঘন থামছে নিকোলাস। ট্রেইল যেখানে ভালো, নিকোলাসের পিঠ থেকে নেমে এক পায়ে হাঁটলো রোয়েন, নিকোলাস এক হাতে জড়িয়ে ধরে রাখলো ওকে। তারপর এক সময় ঢলে পড়লো রোয়েন, ওকে আরার নিজের পিঠে তুলে নিতে হলো নিকোলাসের।
যাত্রাটা দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠছে। দু জনেই সময়ের হিসাব ভুলে গেল। অসহ্য যন্ত্রণার ভেতর ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে। এক সময় দেখা গেল ট্রেইলের উপর পাশাপাশি পড়ে আছে ওরা, অসুস্থ, বমি করছে, ক্ষুদা-পিপাসায় কাতর, ব্যথায় গোঙাচ্ছে।
