আপনার কোনো প্রশ্নের উত্তরই আমার জানা নেই, স্বীকার করলো নিকোলাস।
আদ্দিস আবাবায় পৌঁছে এ ম্যাসাকারের ঘটনা পুলিশকে আমি জানাব, বলল রোয়েন। আমি চাই জ্যাক হেলম্ আর তার লোকজন উপযুক্ত শান্তি পাক।
সেটা বোধহয় উচিত হবে না, বলল নিকোলাস। কারণ আবার আমরা ইথিওপিয়ায় ফিরে আসতে চাই। এ ব্যাপারটা নিয়ে বেশি হৈ-চৈ করলে গোটা উপত্যকায় ট্রপস আর পুলিশ গিজগিজ করবে। টাইটার ধাঁধার সমাধান পাবার রাস্তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। মামোসের সমাধির কথাও ভুলে যেতে হবে।
ও, হ্যাঁ, এদিকটা আমি ভাবিনি।
তাছাড়া, অভিযোগ করে লাভ হবে কিনা ভেবে দেখুন। কর্নেল নগু, হেলমের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। পেগাসাস যদি একজন আর্মি কর্নেলকে পকেটে ভরতে পারে, পুলিস অফিসারদের পকেটে ভরা তো আরো সহজ। ওদের হাত কতটা লম্বা কে জানে। হয়তো দেখা যাবে আর্মি চীফকে কিনে রেখেছে। কিংবা কেবিনেট মেম্বারদেরও।
এ-ও আমি ভাবিনি, স্বীকার করলো রোয়েন।
এখন থেকে ঠিক আফ্রিকানদের মতো করে ভাবতে হবে। টাইটার স্ক্রোল থেকে শেখার কিছু আছে বৈকি। তার মতোই আমাদের হতে হবে চতুর, ধূর্ত। এর ওর নামে অভিযোগ না করে, যদি কোনোমতে এবার বের হয়ে যেতে পারি ইথিওপিয়া থেকে, সবাই ভাববে আমরা পাথর ধ্বসে মারা গেছি। এতে করে গিরিখাদে ফিরে আসা সহজ হবে।
বেশ কিছুক্ষণ আগুনের শিখার দিকে চেয়ে রইলো রোয়েন। নিশ্চুপ। শেষমেষ বলল, আপনি বলেছিলেন এরচেয়ে ভালো প্রতিশোধও নাকি আছে?
ওদের নাকের ডগা থেকে ফারাও মামোসের সমস্ত গুপ্তধন সরিয়ে নেব আমরা।
সেই নিশৃংস, লম্বা দিনে প্রথমবারের মতো হাসলো রোয়েন, এ কথায়। ঠিক। সব জিনিস আমরা নিয়ে গেলে পেগাসাসের মালিকের উচিত সাজা হবে!
*
পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙার পর বসতে গিয়ে গুঙিয়ে উঠলো রোয়েন।
ব্যান্ড্যানা খুলে হাঁটুটা আবার দেখলো নিকোলাস। ফোলাটা আরো বেড়েছে, আকারে প্রায় দ্বিগুণ দেখাচ্ছে হাঁটু। আবার ওটা বাঁধল ও, শেষ দুটো ট্যাবলেট খাইয়ে দিল। নিকোলাসকে ধরে দাঁড়াতে পারলো রোয়েন, খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঢালের নিচে এস দাঁড়ালো। পাহাড়-প্রাচীর বেয়ে উঠে যাওয়া পথটার দিকে দু জনই ওরা তাকিয়ে থাকলো। আসার পথে কী রকম কষ্ট হয়েছে মনে পড়ে যাচ্ছে। চূড়া থেকে নিচে নামতে পুরো একটা দিন লেগেছিল ওদের।
শুরু হলো ওঠা। প্রতি পদক্ষেপের পর আরো যেনো খাড়া হয়ে ওঠছে পথটা। রোয়েন কোনো আওয়াজ করছে না, তবে যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আছে চেহারা, দরদর করে ঘামছে। দুপুর হয়ে গেল, এখনো ওরা জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছতে পারে নি। তবু বিশ্রাম নেয়ার জন্য রোয়েনকে থামতে বলল নিকোলাস। খাবার কিছু নেই, বোতল থেকে ঢক ঢক করে শুধু পানি খেলো রোয়েন। নিকোলাসও খেলো, মাত্র এক ঢোক।
কিন্তু রওনা হবার সময় দাঁড়াতে গিয়ে পারলো না রোয়েন। ওহ! অসহায়ভাবে তাকার নিকোলাসের দিকে। দাঁড়াব কি, পা তো নাড়তেই পারছি না!
কিছু আসে যায় না, হেসে উঠে বলল নিকোলাস। বাম-ব্যাগ থেকে অতি প্রয়োজনীয় কয়েকটা জিনিস চাড়া সব বের করে ফেললো ও, তারপর সেটা কোমরে জড়িয়ে নিল। লাফ দিন, ওঠে পড়ন ঘোড়ার পিঠে।
নিকোলাসের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলো রোয়েন। কী বলছেন? তারপর চোখ তুলে ট্রেইলের দিকে তাকালো, খাড়া একটা মইয়ের মতো ওঠে গেছে। মাথা নাড়লো ও। অসম্ভব!
এ স্টেশন থেকে এটাই একমাত্র ট্রেন ছাড়ছে, বলে রোয়েনের সামনে পেছন ফিরে বসলো নিকোলাস। খানিক ইতস্তত করার পর ক্রল করে ওর পিঠে ওঠে পড়লো রোয়েন।
কিছু দূর ওঠতেই হাঁপিয়ে গেল নিকোলাস, রসালাপ থেমে গেছে। ঘামে ওর শার্ট ভিজে গেল, সেই ঘাম রোয়েনের শার্ট ভিজিয়ে দিয়ে চামড়ায় পৌঁছে গেল। উষ্ণ ভেজা ভেজা ভাবটুকু অন্য সময় হলে হয়তো অশ্লীল লাগত, এখন লাগলো না। পুরুষ-পুরুষ গন্ধটাও খারাপ লাগছে না ওর, বরং আরাম আর স্বস্তিদায়ক বলে মনে হচ্ছে।
প্রতি আধ ঘণ্টা পরপর রোয়েনকে নামিয়ে নামিয়ে বিশ্রাম নিল নিকোলাস, চোখ বন্ধ করে পড়ে তাকালো যতোক্ষণ না আবার নিয়মিত হয় শ্বাস-প্রশ্বাস। বিশ্রাম বলতে ওইটুকু, দম ফিরে পাবার সঙ্গে সঙ্গে আবার পিঠে বোঝ তুলে নিয়ে খাড়া ট্রেইল ধরে ওঠা। এভাবে সারাটা দিন পেরিয়ে গেল। তারপর একটা বাঁক ঘুরতেই ট্রেইলের সামনে ঝুলে থাকতে দেখা গেল জলপ্রপাতটাকে, লেস লাগানো পর্দার মতো। হোঁচট খেতে খেতে বিপুল জলরাশির পেছনে চলে এলো নিকোলাস, গুহার ভেতর ঢুকে রোয়েনকে মেঝেতে নামালো, তাক হয়ে ঢলে পড়লো একপাশে, লাশের মতো স্থির হয়ে গেল।
আবার যখন চোখ মেললো নিকোলাস ততক্ষণে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে সন্ন্যাসীদের রেখে যাওয়া স্তূপ থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করেছে। রোয়েন, ছোট একটা আগুন ধরিয়েছে। নিকোলাস ওঠে বসতে যাচ্ছে দেখে ঝুঁকলো ও, নিকোলাসের মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে বলল, ওহ নিকোলাস, আজ আপনি আমার জন্য যা করলেন, আমি এর প্রতিদান দিব কীভাবে?
কৌতুক করে কিছু বলতে গিয়েও বলল না নিকোলাস, আসলে শক্তিতে কুলালো না। রোয়েনের আলিঙ্গনের ভেতর চুপচাপ শুয়ে থাকলো, ভয় লাগছে, এ আরামটুকুর মেয়াদ হঠাৎ না শেষ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে নিকোলাসের মাথাটা নামিয়ে দিল রোয়েন, একটু সরে বসলো। গৃহকর্তাকে স্যামন বা শ্যাম্পেন দিয়ে খুশি করতে পারছি না, বলল ও। নির্ভেজাল ও পুষ্টিকর পাহাড়ী জল পেলে চলবে কি?
