নিকোলাস বলতে চাইলো, ডেকে কোনো লাভ নেই, সে বেঁচে থাকলে তোর কিন্তু বলল না।
ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে আছে রোয়েনের, তবু হাল ছাড়তে রাজি নয়। তামের! সাড়া দাও! তামের, কোথায় তুমি?
রোয়েন কেঁদে ফেলবে, এ বয়ে ওর দিকে তাকাচ্ছে না নিকোলাস।
আর ঠিক তখন আরো ওপরের ঢাল থেকে অস্পষ্ট একটা কাতর শব্দ ভেসে এলো। গুঙিয়ে উঠে ডার আঁচড়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে রোয়েন। বাধা না দিয়ে পিছু নিল নিকোলাস। খানিক দূর ওঠেই কেঁদে ফেললো রোয়েন। প্যাক ফেলে ওর পাশে চলে এলো নিকোলাস। ইতোমধ্যে ঢালের উপর হাঁটুগেড়েছে রোয়েন।
পাথর ধসের নিচে চাপা পড়েছে তামেরের শরীর। ছেঁড়া-ফাড়া মুখটা প্রায় চেনাই যায় না, চামড়ার অর্ধেকটাই নেই। মাথাটা কোলে তুলে নিল রোয়েন, শার্টের আস্তিন দিয়ে নাকের ফুটো থেকে ধুলো বের করছে, আরো যাতে ভালো ভাবে শ্বাস নিতে পারে। তামেরের মুখের কোণ থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। আবার যখন কাতর আওয়াজ করলো, গলগল করে বেরিয়ে এলো। সেটা মুছতে গিয়ে সারা মুখে লেপ্টে দিল রোয়েন।
তামেরের শরীরের নিচের অংশ পাথরে চাপা পড়েছে। পাথর সরাতে চেষ্টা করলো নিকোলাস, তবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করলো কাজটা সম্ভব নয়। বড় একটা খণ্ডের নিচে রয়েছে তামের, আকারে সেটা বিলিয়ার্ড বোর্ডের দ্বিগুণ হবে। কত টন ওজন হবে পাথরটার আন্দাজ করা কঠিন, বিশ থেকে পঁচিশ টরে কম হবে না। সন্দেহ নেই, শিরদাঁড়া আর পেলভিস চুরমার হয়ে গেছে। সাহায্য ছাড়া একজনের পক্ষে এ পাথর সরানোর প্রশ্নই ওঠে না। সম্ভব যদি হতো, পাথরটার নড়াচড়া চিড়ে চ্যাপ্টা শরীরটাকে আরো শুধু কষ্টই দিত।
অদ্ভুত এক অভিমান নিয়ে নিকোলাসের দিকে তাকালো রোয়েন। কিছু একটা করুন! প্লিজ, কিছু একটা করুন!
নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখলো নিকোলাস। নিঃশব্দে মাথা নাড়লো ও। ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললো বোয়েন, চোখের জল বৃষ্টির ফোঁটার মতো পড়ছে তামেরের কপালে।
ও এভাবে মারা যাবে আর আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবো? নিকোলাসের দিকে করুণ চোখে তাকালো রোয়েন। এ সময় চোখ মেলে ওর দিকে তাকালো তামের।
ছাল ছাড়ানো রক্ত ভেজা মুখ, অথচ হাসছে তামের। কুৎসিত বীভৎস চেহারা ওই হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। আম্মি! ফিসফিস করলো সে। আপনি আমার মা। মা ছাড়া এতো আদর কে করে! আম্মি, তোমাকে আমি ভালোবাসি!
কথাগুলো আড়ষ্ট, শেষ হতেই শরীরে একটা খিচুনি উঠলো। ব্যথায় বিকৃত হয়ে গেল চেহারা, ককিয়ে উঠলো একবার, তারপর স্থির হয়ে গেল। আড়ষ্ট ভাবটুকু দূর হলো কাঁধ থেকে, মাথাটা কাত হয়ে গেল একদিকে।
কাঁদছে রোয়েন, মাথাটা কোলে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলো। তারপর ওর কাঁধ ছুঁয়ে নিকোলাস বলল, ও মারা গেছে, রোয়েন।
মাথা ঝাঁকালো রোয়েন। জানি। শুধু আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য বেঁচে ছিল ও।
তামেরের মাথাটা রোয়েনের কোল থেকে তুললাম নিকোলাস, সরে এসে ধীরে ধীরে দাঁড়ালো রোয়েন। তামেরের মাথা নামিয়ে রেখে তার হাত দুটো বুকের উপর ভাঁজ করে দিল নিকোলাস। তারপর আলগা পাথর দিয়ে ঢেকে দিল লাশটা।
এবার আমাদের যেতে হয়, তামের।
তামেরের কবরে একটা চুমো খেলো রোয়েন। তারপর নিকোলাসের কাঁধে ভর দিয়ে নেমে এলো নদীতে।
পানি কেটে উজানের দিকে রওনা হলো ওরা। পাথর ধস নদীর অর্ধেকটাই ভরাট করে ফেলেছে, ফলে অবশিষ্ট ফাঁক গলে পানি খুব দ্রুত ছুটে চলেছে। দুর্গত এলাকা, ছাড়িয়ে এসে নদীর পাড়ে উঠলো ওরা, তারপর খাড়া ঢাল বেয়ে, পৌঁছল ট্রেইলে। এখানে সামান্য বিশ্রাম নিল, তাকালো পেছন দিকে। পাথর ধসের নিচে লালচে-খয়েরি দেখাচ্ছে নদীর পানি। মঠের সন্ন্যাসীরা বিস্ফোরণের আওয়াজ যদি না-ও শোনে থাকে, ঘোলা পানি দেখে চিন্তায় পড়ে যাবে, কী ঘটেছে দেখার জন্য এদিকে আসবে। লাশগুলো তুলে নিয়ে যাবে মর্যাদার সঙ্গে কবর দেয়ার জন্য। চিন্তাটা খানিকটা হলেও সান্ত্বনা এনে দিল নিকোলাসের মনে। রোয়েনকে নিয়ে আবার রওনা হলো ও। এ ট্রেইল ধরে দু দিনের কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে ওদেরকে।
রোয়েন এখন খুব বেশি খোঁড়াচ্ছে। কিন্তু নিকোলাস সাহায্য করতে গেলে ঝাঁপটা দিয়ে সরিয়ে দিল ওর হাত। কিছু না, শুধু একটু আড়ষ্ট লাগছে। হাঁটুটা পরীক্ষা করতেও দিল না, জেদ করে নিকোলাসের সামনে থাকলো।
রাতটা ওরা ঢালের নিচে কাটালো। সামনেই খাড়া পাচিল বেয়ে ওঠে গেছে। পথটা। পথ থেকে রোয়েনকে বেশ খানিকটা সরিয়ে আনলো নিকোলাস, থামলো গাছপালায় ঢাকা একটা নালায়। ঝোঁপ-ঝাড়ের ভেতর আগুন জ্বাললো, জানে বাইরে থেকে দেখা যাবে না। এবার হাঁটুটা নিকোলাসকে দেখতে দিল রোয়েন। চামড়া ওঠা জায়গাটা ফুলে আছে, ছুঁতে খুব গরমও লাগলো। মাথা নাড়লো নিকোলাস।
এ পা নিয়ে আপনার হাঁটা ঠিক হচ্ছে না।
আর কোনো উপায় আছে? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন। জবাব না দিয়ে বোতলের পানি দিয়ে নিজের ব্যানড্যানাটা ভেজাল ও, তারপর শক্ত করে বেঁধে দিল পায়ে। দুটো পেইনকিলার ট্যাবলেট খেতে দিল।
সারভাইভালো রেশন সামান্যই অবশিষ্ট আছে, আধপেটা খেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হলো। আগুনের ধারে বসে ফিসফাস করছে দু জন। চূড়ায় ওঠার পর কী ঘটবে? জানতে চাইলো রোয়েন। যেখানে রেখে এসেছি সেখানে কী ট্রাকগুলো পাব? পাহারাদাররা আছে, নাকি কেটে পড়েছে? আর যদি পেগাসাসের লোকজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়? তাহলে কী হবে?
