ওদের শেলটারের উপর ইতোমধ্যে কয়েকশো টন পাথর ধসে পড়েছে, তবে এ সবে মাত্র শুরু। এক সময় মনে হলো পাহাড়ের অর্ধেকটাই নেমে আসছে ওদের উপর। ধুলো এখন ঘন মেঘের মতো, দু হাত দূরের জিনিস দেখা যায় না। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, খকখক করে কাশছে দুজনেই। বিশাল বাড়ির মতো শেলটার পাথর ধসে চাপা পড়ে যাচ্ছে, বুঝতে পেরে রোয়েনের উপর ওঠে এলো নিকোলাস, নিজের শরীর দিয়ে ঢেকে ফেললো ওকে। ছোট্ট একটা পাথর টোকা দিল ওর মাথার পাশে, তাতেই চোখে অন্ধকার দেখলো নিকোলাস। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথাটা সহ্য করলো ও, অনুভব করলো কানের পেছন গরম একটা স্রোত, জ্যান্ত প্রাণীর মতো চিবুকে নেমে আসছে ওটা।
তারপর ধীরে ধীরে মাটি ও পাথর ধস বন্ধ হলো। এখন আর ওদের শেলটার ঘন ঘন আঁকি খাচ্ছে না। মিহি ধুলো হালকা হয়ে যাচ্ছে। নিস্তেজ হয়ে পড়ছে পাথরের গর্জন।
সাবধানে চোখের পাতা থেকে ধুলো পরিষ্কার করলো নিকোলাস। ওর নিচে নড়ে উঠলো রোয়েন। হামাগুড়ি দিয়ে সরে এলো নিকোলাস, রোয়েন যাতে বসতে পারে। বসার পর দু জন দু জনের দিকে তাকিয়ে থাকলো। শাদা ধুলো মুখোশ পরিয়ে রেখেছে ওদেরকে। মাথার চুলকে মনে হচ্ছে উইগ। আপনার মুখে রক্ত, আতংকে কর্কশ শোনালো রোয়েনের গলা।
খুলির চামড়া সামান্য একটু কেটে গেছে, বলল নিকোলাস। আপনার খবর কী?
আমার হাঁটু মজকেছে। সিরিয়াস বলে মনে হয় না, অল্প অল্প ব্যথা করছে।
তাহলে বলতে হবে অদ্ভুত ভাগ্য আমাদের, বলল নিকোলাস। এ ঘটনার কারুরই বাঁচার ছিল না।
রোয়েন হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে বেরুতে যাচ্ছে দেখে হাত ধরে বাধা দিল নিকোলাস। না! গোটা ঢার আলগা হয়ে আছে। পুরোপুরি স্থির হতে আরো সময় লাগবে। তাছাড়া….
তাছাড়া কি?
ওদেরকে জানতে দেওয়া চলবে না আমরা বেঁচে আছি, বলল নিকোলাস।
জানলেই শেষ করার জন্য ছুটে আসবে।
নিকোলাসের কথা শেষ হওয়া মাত্র কপ্টার ইঞ্জিনের আওয়াজ ভেসে এলো, কাছাকাছি কোথাও থেকে টেক-অপ করছে। রোয়েনকে ধরে আবার শুইয়ে দিল নিকোলাস, নিজেও ওর পাশে শুয়ে পড়লো।
মাথার উপর এসে চক্কর নিচ্ছে কপ্টারটা। বোধহয় জীবিত কাউকে খুঁজছে, ভাবল নিকোলাস। রোরের আওয়াজ দূরে সয়ে যাচ্ছে, পাথরের ভাঁজ থেকে মাথা বের করে বাইরে উঁকি দিল নিকোলাস। আধ মাইল উজানের দিকে যান্ত্রিক ফড়িংটাকে দেখা গেল, পেগাসাসের জেট রেঞ্জারই বটে। দূরে সরে যাচ্ছে, ফলে উইন্ডস্ক্রীনের ভেতর ককপিটটা পরিষ্কার দেখা গেল না। তবে ঠিক সেই সময় কপ্টারের গতি কমে এলো, দিক বদলে উত্তর দিকে যাচ্ছে এখন, এবার প্যাসেঞ্জারদের দেখার একটা সুযোগ পাওয়া গেল। পাইলটের পাশেই বসে রয়েছে জ্যাক হেলম্, আর কর্নেল নগু বসেছেন ঠিক ওদের পেছনে। সবাই ওরা তাকিয়ে আছে নিচের নদী ও উপত্যকায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রিজের আড়ালে হারিয়ে গেল কপ্টারটা।
আর কোনো সন্দেহ নেই, বলল নিকোলাস। পেগাসাসের মালিক যে-ই হোক, আপনার ডুরেঈদকে খুন করা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত খারাপ যা কিছু ঘটেছে তার জন্য সে-ই দায়ী। হেলম্ আর কর্ণেল নগু তার বেতনভুক্ত চাকর মাত্র।
কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? রোয়েন মানতে পারছে না। কর্নেল ন ইথিওপিয়ান আর্মির একজন অফিসার।
এটা আফ্রিকা, রোয়েন, সম্ভাব্য সব কিছু বিক্রি হয়, বলল নিকোলাস। শুনুন, এ সব বিষয়ে পরে চিন্তা-ভাবনা করা যাবে। এখন আমাদের প্রথম কাজ এ খাদ থেকে বেরিয়ে সভ্য জগতে ফিরে যাওয়া। হামাগুড়ি দিয়ে পাথরের ভাজ থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো ও, ধীরে ধীরে দাঁড়ালো।
ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে গেল নিকোলাসের দৃষ্টি। ওদের ওপরে ট্রেইলটা পাথর ধসে চাপা পড়ে গেছে। ওর পাশে বেরিয়ে এসে দাঁড়াতে চেষ্টা করলো রোয়েন, গুঙিয়ে উঠে পড়ে যাবার উপক্রম করলো, নিকোলাস ধরে না ফেললে যেতে পড়ে। হাঁটু! শরীরের ভর ভালো অর্থাৎ ডান পায়ে চাপালো রোয়েন, সাহস করে হাসলো।
ঠিক হয়ে যাবে।
ট্রেইল ধরে যাওয়া সম্ভব নয়, বলে রোয়েনকে নিয়ে নদীতে নেমে এলো নিকোলাস, নামার সময় আবার পাথর ধস শুরু হয় কিনা ভেবে ভয়ে ভয়ে থাকলো।
কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে নিকোলাসের খুলির ক্ষতটা ধুয়ে দিল রোয়েন, নিকোলাসের ডে-প্যাক হাতড়ে অ্যান্টিসেপটিক মলমের একটা টিউব বের করলো। মলম লাগাবার পর নিকোলাসের গলা থেকে ব্যানড্যানা খুলে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল।
প্রথম কাজ তামেরকে খুঁজে বের করা, নিকোলাসকে মনে করিয়ে দিল।
নদীর পাড় ঘেঁষে পানি কেটে এগুলো ওরা। নদীর তলা আলগা পাথরে ভর্তি, খুব সাবধানে এগুতে হচ্ছে। প্যাকটা পানির উপর তুলে রেখেছে নিকোলাস। আলগা পাথরের ভেতর দিয়ে ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠা অত্যন্ত কঠিন মনে হলো। খানিক দূর ওঠার পরই দু জন সন্ন্যাসীর থেতলানো লাশ দেখতে পেল ওরা, পাথরের নিচে অর্ধেক চাপা পড়ে আছে। একটা খচ্চরের শুধু একটা পা বেরিয়ে আছে বাইরে। পিঠের বোঝা খুলে গেছে, জিনিসপত্র ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে। দেখতে পেয়ে ডিক-ডিকের গুটানো ছালটা তুলে নিল নিকোলাস, আটকে রাখলো ওর ব্যাগের সঙ্গে।
শেষবার যেখানে তামের আর কিফকে দেখা গেছে সেদিকে ওঠছে ওরা। কিন্তু এক ঘণ্টা সার্চ করার পরও দু জনের একজনকেও খুঁজে পাওয়া গেল না। ওদের উপর ঢালটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে, ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে ঝোঁপ আর গাছপালা। হাঁটুর জখম নিয়ে যতটা সম্ভম ওপরে উঠলো রোয়েন, হাত দিয়ে মুখের সামনে চোঙ তৈরি করে ডাকছে, তামের! তামের! তামের! ওর চিৎকার উপত্যকার পাঁচিলে বাড়ি খেয়ে ফিরে আসছে।
