নিকোলাসের মাথার ভেতর ঝড় বইছে। ওরা এপথে আসবে এটা জানার পর কেউ যদি পাহাড়-প্রাচীরে জেলিগনাইট বসিয়ে থাকে, তাহলে আলোর যে প্রতিফলন দেখা গেছে সেটা বিস্ফোরকগুলোর মাঝখানে পড়ে থাকা কপার ওয়ায়্যারিং-এর কয়েল থেকে সৃষ্টি হতে পারে। সেক্ষেত্রে অপারেটর লোকটা এ মুহূর্তে পেছনের পাহাড়ে কোথাও শুয়ে আছে। বুড়ো হরিণ সম্ভবত তাকে লুকিয়ে তাকতে দেখে ভয় পেয়েছিল।
কিফ! নিকোলাসের গলার শিরা ফুলে উঠলো। থামাও ওদের। ফিরিয়ে আনো! কাফেলার মাথায় পৌঁছনোর জন্য ছুটলো ও, এ বলছে এরই মধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ওদের পেছনে পাহাড়ে সত্যি যদি কেউ থাকে, নিকোলাসের প্রতিটি নড়াচড়া পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সে। কাফেলার মাথায় পৌঁছে খচ্চরগুলোকে সরু ট্রেইলে ঘোরানো, তারপর নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে আনা, সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ছোটার গতি কমিয়ে আনলো নিকোলাস, তবে এখনো চিৎকার করে ফিরে আসতে বলছে ওদেরকে, সেই সঙ্গে হাতছানি দিয়ে ডাকছে রোয়েনকে।
ছুটে আসছে রোয়েন, ধৈর্য হারিয়ে নিকোলাসও খানিকটা পিছিয়ে এলো। কী ব্যাপার, নিকোলাস? রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইলো রোয়েন।
ট্রাক থেকে সরে যেতে হবে। পরে ব্যাখ্যা করব।
রোয়েনের হাত ধরে ফেলে আসা পথ ধরে ছুটলো নিকোলাস, আবার আলির নাম ধরে ডাকলো।
পঞ্চাশ গজও কভার করতে পারে নি, পাহাড়-প্রাচীনের মুখ বিস্ফোরিত হলো। বাতাসের তীব্র আলোড়ন ধাক্কা, মারন, হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবার অবস্থা হলো ওদের। কান ও মাথার ভেতর ব্যথা করে উঠলো। তারপর বিস্ফোরণের মুল শক্তি ঝাঁকি দিয়ে গেল ওদেরকে-একটামাত্র বিস্ফোরণ নয়, একের পর এক অনেকগুলো, যেনো মাথার উপর বিরতিহীন বজ্রপাত হচ্ছে। দিশেহারা হয়ে উঠলো ওরা, পরস্পরের সঙ্গে জড়িতে গেল। রোয়েনকে আঁকড়ে ধরে পেছন দিকে তাকালো নিকোলাস, দেখলো পাহাড়-প্রাচীরের চূড়ায় পর পর কয়েকটা বিস্ফোরণ ঘটলো। লম্বা, নৃত্যরত পাথর আর ধূলোর ঝরনার একের পর এক উথলে উঠছে।
আতংকে দিশেহারা, তবু জেলিগনাইট সাজানোর দক্ষতা লক্ষ্য করে নিকোলাসের মনে সমীহ জাগলো। এ একজন মাস্টার বম্বারের কাজ। পাথরখণ্ডের ধস এক সময় থামলো, এখন শুধু স্বচ্ছ নীল আকাশের গায়ে মিহি ধুলো দেখা যাচ্ছে। মুহূর্তের জন্য মনে হলো ধ্বংসযজ্ঞের সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু তারপরই পাহাড়-প্রাচীরের কাঠামো বদলে যেতে শুরু করলো।
প্রথমে ধীরে ধীরে পাথরের পাঁচিল বাইরের দিকে কাত হলো। পাহাড়ের গায়ে বিশাল ফাটল সৃষ্টি হতে দেখলো নিকোলাস, যেনো রাক্ষসের প্রকাণ্ড মুখ শুলে যাচ্ছে। পাথরের বিরাট পাত ধসে পড়ছে, স্লো মোশনে নেমে আসছে ওদের উপর। ভেঙে পড়ার আওয়াজ শোনে মনে হলো একই সঙ্গে হুংকার ছাড়ছে আর গোঙাচ্ছে শত শত টন পাথর, গোটা পাহাড়-প্রাচীর অনেক নিচের নদীতে পড়ে যাচ্ছে।
দৃশ্যটা সম্মোহিত করে ফেলেছে নিকোলাসকে, মনে হলো বিস্ফোরণের ফলে ব্রেন অবশ হয়ে গেছে। চিন্তা শক্তি ফিরে পেতে কিংবা তৎপর হতে সময় লাগলো, নিজের উপর জোর খাটাতে হলো। ও দেখলো, বেশিরভাগ বিস্ফোরণ ঘটেছে ট্রেইলের সামনের দিকে, কাফেলার মাথার কাছে। ওদিকে তামের ছিল, আলির পাশে। এক্সপ্লোসিড ট্র্যাপের ভেতরে ওরা দু জনও ঢুকবে, এ আশায় পাহাড় প্রাচীরের মাথায় অপেক্ষা করছিল বহুবার। কিন্তু রোয়েনকে নিয়ে নিকোলাস যখন উল্টোদিকে ছুটতে শুরু করলো, বিস্ফোরণ ঘটাতে বাধ্য হয়েছে সে।
অসহায় দাঁড়িয়ে থেকে পতনশীল পাথরের বিশাল স্রোতটাকে নেমে আসতে দেখছে নিকোলাস ওর সামনে ট্রেইলের উপর, গ্রাস করছে লোকজন আর খচ্চরগুলোকে, কিনারা থেকে বিরতিহীন জলপ্রপাতের মতো লাফ দিয়ে পড়ছে নদীর তলায় পাথর ধসের কান ফাটানো গর্জনের ভেতর থেকেও লোকজনের আর্তনাদ ভেসে আসছে।
ধ্বংসযজ্ঞ ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমশ, এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। ব্যাখ্যা করার সময় নেই, যে কোনো মুহূর্তে টন টন পাথরের নিচে ওরাও চাপা পড়ে যাবে। ঝট করে রোয়েনকে দু হাতে ধরে বুকে তুলে নিল নিকোলাস, লাফ দিয়ে পাড় টপকে নদীর দিকে পড়লো। পাড়ের ঢালে দু জন একসঙ্গে পড়লো ওরা, বারবার গড়িয়ে নেমে এলো ত্রিশ ফুট। এখানে বড় একটা পাথর পড়ে আছে, আকারে একটা বাড়ির মতো হবে। ওই পাথরে লেগে স্থির হলো শরীর দুটো।
ধীরে ধীরে সোজা হলো নিকোলাস, রোয়েনের হাত ধরে দাঁড় করালো, তারপর ওকে নিয়ে লে এলো পাথরটার উল্টোদিকে। এদিকে, জমিন ঘেঁষে, ভেতর দিকে একটা ভাঁজ খেয়েছে পাথর, সেই ভাঁজের ভেতর ঢুকে পড়লো ওরা।
যতোটা সম্ভব পিছিয়ে এসে পাথুরে খোলের ভেতর শুয়ে থাকলো দু জন। ধ্বংসযজ্ঞ আরো বিস্তৃত হয়েছে, এতোক্ষণে ওদের উপর নামতে শুরু করলো ধসটা। বিশার রাবার বলের মতো লাফ দিতে দিতে প্রকাণ্ড টুকরোগুলো ছুটে আসছে, প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে গতি, তারপর ওদের শেলটারের সামনের দিকটায় লেগে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। গড়িসে এসে একটা করে টুকরো ভাঙে, অমনি প্রচণ্ড আঁকি খেয়ে কাঁপতে শুরু করে ওদের শেলটার। ধাক্কা খেয়ে বিস্ফোরিত পাথরের ছোট টুকরোগুলো মিসাইলে পরিণত হলো, বাতাসে শিস খেটে নদীতে গিয়ে পড়ছে। নদীতে বড় বড় ঢেউ জাগলো, আছড়ে পড়ে ভাঙার সময় দুই তীরে ফেনা জমে উঠলো।
