আসছে রোয়েনও। কাছে এসে বলল, দেখতে এলাম কী করছেন আপনি।
সামান্য রেকি। সামনে স্কাউট রাখা দরকার ছিল, এভাবে অন্ধের মতো ট্রেইল ধরে যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। যত দূর মনে পড়ে, ঠিক সামনেই পড়বে অত্যন্ত কঠিন পথ। খোদা জানে কিসের মধ্যে গিয়ে পড়ব।
আরো ওপরে উঠলো ওরা, তবে চূড়ায় ওঠা সম্ভব হলো না বিশাল এক পাহাড় প্রাচীর পথরোধ করে দাঁড়িয়ে থাকায়। বাধাটার ঠিক নিচে ভালো একটা জায়গা বেছে নিয়ে উপত্যকার দুটো ঢালই বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে পরীক্ষা করলো নিকোলাস। এ এলাকার কথা মনে আছে ওর। খাড়া ঢাল ওয়াল-এর গোড়ায় পৌঁছতে যাচ্ছে ওরা, জমিন এ দিকে অসম্ভব এবড়োখেবড়ো আর রুক্ষ-কঠিন, খোলা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, অনুভবে ডাঙার অস্তিত্ব টের পেয়ে তীরে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার আগে সাজ সাজ রব তুলে ফুলে-ফেঁপে ওঠা। ট্রেইল খুব কাছ থেকে অনুসরণ করেছে নদীটাকে। নদীর পাড় বলতে সরু আল, তার উপর ঝুলে আছে পাহাড়-প্রাচীন-রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-বরফ নির্যাতনের স্টীমরোলার চালিয়ে অদ্ভুত, ভীতিকর আকৃতি দিয়েছে, ডিজনির কার্টুনে দেখা দুষ্ট ডাইনীর সচ্ছিদ্র দুর্গ যেন। এক জায়গায় ট্রেইলের উপর জ্বলে আছে লাল স্যান্ডস্টোনের বিশাল এক পাথুরে অবলম্বন, বাধ্য হয়ে ওঠাকে ঘুরে এগুতে হয়েছে নদীকে, ওখানে ট্রেইল এত সরু হয়ে গেছে যে বোঝা সহ একটা খচ্চর যেতে চাইলে পাড় থেকে নদীতে পড়ে যাবার ভয় আছে।
চোখে লেন্স লাগিয়ে উপত্যকার তলাটা সাবধানে দেখে নিল নিকোলাস। বেমানান সন্দেহজনক কিছুই দেখতে পেল না, কাজেই মাথা তুলে নিজেদের উপর দিকে পাহাড়-প্রাচীরে দৃষ্টি বুলাল।
এ সময় নিচের উপত্যকা থেকে আলির চিৎকার ভেসে এলো। জলদি, ইফেন্দি! খচ্চরগুলো রওনা হবার জন্য রেডি হয়েছে।
তাহ ঝাঁকিয়ে তাকে একটু অপেক্ষা করতে বলল নিকোলাস, তারপর আবার বাইনোকুলার তুলে সামনের জমিনের উপর দৃষ্টি বুলালো। ঝিক করে চোখে লাগলো উজ্জ্বল একটা আলো। ভুরু কুঁচকে পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে সমস্ত মনোযোগ এক করলো নিকোলাস।
কী ব্যাপার? দূত জিজ্ঞেস করলো রোয়েন। কী দেখলেন?
নিশ্চিত নই। বোধহয় কিছু না, চোখ থেকে বাইনোকুলার না নামিয়ে জবাব দিল নিকোলাস। পালিশ করা কোনো ধাতব বস্তুর সারফেসে, অন্য একজোড়া
বাইনোকুলারের লেন্সে, কিংবা একটা রাইফেলের ব্যারেলে রোদ লেগে থাকতে পারে।
জলদি, স্যার! খচ্চরচালকরা অপেক্ষা করতে রাজি নয়! আবার আলির চিৎকার ভেসে এলো।
দাঁড়ালো নিকোলাস।
কিছু না, চলুন। রোয়েনের হাত ধরে নামতে সাহায্য করছে নিকোলাস। হঠাৎ ঢালের উপর দিক থেকে ভেসে পাথর নড়াচড়ার আওয়াজ। রোয়েনকে ছেড়ে দিয়ে ঠোঁটে আঙুল রাখলো ও। অপেক্ষা করছে ওরা, স্কাইলাইনের উপর চোখ।
অকস্মাৎ বাঁকা একজোড়া শিং মাথাচাড়া দিল চূড়ার কিনারায়, ওগুলোর নিচে বুড়ো এক পুরুষ হরিণের মাথা। আড়ষ্ট হয়ে আছে কান দুটো, নিঃশ্বাস ফেলছে ঘন ঘন। পাহাড়-প্রচীরের কিনারায় থামলো ওটা, ঠিক ওরা যেখানে গুঁড়ি মেরে বসে আছে তার সরাসরি ওপরে, যদিও ওদেরকে দেখতে পায়নি এখনো। হরিণটা ঘাড় ফেরালো, ফেলে আসা পথের দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকের চোখটা রোদ লাগায় ঝিক করে উঠলো। দাঁড়ানোর সতর্ক ভঙ্গি, আড়ষ্ট কান আর পেছন ফিরে তাকানোই বলে দেয় কোনো কারণে ভয় পেয়েছে।
তারপর হঠাৎ যেনো বিদ্যুৎ খেলে গেল হরিণটার শরীরে। চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল রিজের পেছনে, দূরে মিলিয়ে গেল ছুটে পালানোর শব্দ।
কিছু একটা দেখে ভয় পেয়েছে ওটা, ঢালের নিচে তাকিয়ে বলল নিকোলাস। খচ্চর আর সন্ন্যাসীদের কাফেলা এরই মধ্যে রওনা হয়ে গেছে, নদীর উঁচু পাড়ের ট্রেইল ধরে এগুচ্ছে।
আমাদের এখন তাহলে কী করা উচিত? জানতে চাইলো রোয়েন।
সামনের পথ রেকি করা দরকার, কিন্তু সেজন্য যে সময় দরকার তা নেই।
কাফেলা দ্রুত এগুচ্ছে, এখুনি ঢাল বেয়ে নিচে না নামলে পেছনে পড়ে থাকবে ওরা। বিপদের নিরেট কোনো প্রমাণ এখনো পায়নি নিকোলাস, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করাও চলে না। আসুন! রোয়েনের হাত ধরলো ও, ছুটে নেমে আসছে ঢাল বেয়ে।
কাফেলার পেছনে চলে এলো ওরা, নিকোলাস এখনো ওদের মাথার উপর স্কাইলাইন গভীর মনোযোগের সঙ্গে পরীক্ষা করছে। পাহাড়-প্রাচীর কাত হয়ে ঝুলে আছে ওদের উপর, ঢেকে ফেলেছে অর্ধেক আকাশ। ওদের বাম দিকে নদী নিজের শব্দ দিয়ে অন্য সব শব্দ মুছে ফেলছে।
পাহাড়-প্রাচীরের মাথা থেকে একটা পাতা ঝরে পড়তে দেখছে নিকোলাস। গরম বাতাসে শুকনো পাতাটা ডিগবাজি খেতে খেতে নেমে আসছে। এতো ছোট, কোনো বিপদসংকেত হতে পারে না, তবু অলস কৌতূহলবশত ওটার পতন লক্ষ্য করছে ও। বাদামী পাতাটা অবশেষে ওর মুখ স্পর্শ করলো। হাত তুলে ধরলো নিকোলাস, দু আঙুলের মাঝখানে নিয়ে ঘষা দিল, জানে গুঁড়িয়ে যাবে।
কিন্তু মসৃণ আর নরম লাগলো জিনিসটা। হাত খুলল নিকোলাস, ভালো করে দেখলো। পাতা নয়, ভেঁড়া এক টুকরো গ্রিজড পেপার। মাথার ভেতর সতর্ক সংকেত বেজে উঠলো। সেমটেক্স আর প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভের যুগে সামরিক কাজে ব্লাস্টিং জেলিগনাইট আজকাল খুব কমই ব্যবহার করা হয়, তবে মাইনিং ইন্ড্রাস্ট্রি আর মিনারেল এক্সপ্লোরেশনে এখনো জিনিসটার চাহিদা ব্যাপক। সাধারণত নাইট্রোজেলাটিন স্টিক বাদামি রঙের গ্রিজড পেপারে মোড়া থাকে, স্টিকের মাথায় ডিটোনেটর সেট করার আগে এক্সপ্লোসিভ এক্সপোজ করার সময় কাগুঁজে মোড়কটার একটা প্রান্ত ছিঁড়ে ফেলা হয়।
