রোয়েনকে এগিয়ে আসতে দেখে বাধা দিল নিকোলাস, তাকাবেন না!
ওর কথায় কান না দিয়ে পাশে এসে দাঁড়ালো রোয়েন।ওহ, গড! দু হাতে মুখ ঢাকল।
এগিয়ে এসে লাশগুলো দেখলো নিকোলাস। কিফ, সালিন আর আলিকে দেখছি না। কোথায় ওরা? আলি, কোথায় তুমি?
ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো আলি। এখানে, ইফেন্দি! গলাটা কেঁপে গেল তার, মুখ ঝুলে পড়েছে। তার শার্টের সামনে শুকনো রক্ত দেখা গেল।
কি হয়েছে বলো! আলিকে ধরে সোজা করলো নিকোলাস।
ওরা ছিল শুফতা, ডাকাত, খুনী! ওরা ছিল হায়েনা, শিয়াল সাপ! রাতের অন্ধকারে হঠাৎ আসে, এসেই গুলি ছোঁড়ে কুঁড়ে লক্ষ্য করে। কতজন ছিল বলতে পারব না, কেন এভাবে খুন করলো তাও বলতে পারব না! ফোঁপাতে লাগলো আলি।
খানিক পর জানা গেল রোয়েনের ঘর তছনছ করা হয়েছে। ক্যানভাস ফোল্ডারের প্রচুর ফটোগ্রাফ আর কাগজপত্র ছিল, খালি করে নিয়ে গেছে সব। ওদের হেডকোয়ার্টারও তছনছ করা হয়েছে। স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফ আর ম্যাপ, পাথর ফলকের রাবিং, পোলারয়েড-কিছুই নেই।
নিজের কুঁড়ে থেকে ছুটে রোয়েনের কুঁড়েতে চলে এলো নিকোলাস। একই অবস্থা আমার ঘরেরও। সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে গেছে, রাইফেলটাও। পাসপোর্ট আর ট্রাভেলার্স চেক ডে-প্যাকে ছিল বলে রক্ষা পেয়েছে!
নিঃশব্দে কাঁদছে রোয়েন। আমাদের গবেষণার সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে গেছে ওরা, এমনকি পোলারয়েডগুলোও বাদ দেয়নি। ওহ, নিকোলাস, মিশরে আমাদের মরুভূমির বাসাতে যা ঘটেছিল, এখানে আবার ঠিক তাই ঘটলো। ওদের হাত থেকে এখানেও আমরা নিরাপদ নই। কাল রাতে আমরা ক্যাম্পে থাকলে কি ঘটত? ছুটে এসে নিকোলাসের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ওই রোদের মধ্যে আমরাও মরে পড়ে থাকতাম!
ভারপ্রাপ্ত পুরোহিতদের সঙ্গে কথা হয়েছে নিকোলাসের। ওঁদের ধারণা, আক্রমণটা ওকে আর রোয়েনকে খুন করার জন্যই করা হয়। বলছেন, এখান থেকে এখুনি ওদের চলে যাওয়া উচিত, কারণ আবার হামলা হতে পারে।
কিফ, সালিন আর আলিকে রওনা হবার প্রস্তুতি নিতে বলেছে নিকোলাস। ভারপ্রাপ্ত পুরোহিতরা কথা দিয়েছেন, যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি কর্তৃপক্ষকে ঘটনার কথা জানাবেন তাঁরা।
একঘণ্টার মধ্যে রওনা হবার জন্য তৈরি হয়ে গেল ওরা। সমস্ত ক্যাম্পিং ইকুইপমেন্ট আর বোরিসের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র প্রধান পুরোহিত জালি হোরার দায়িত্বে রেখে যাওয়া হচ্ছে। খচ্চরগুলোর পিঠে হালকা বোঝা চাপানো হলো।
প্রধান পুরোহিত এসকর্ট হিসেবে একদল সন্ন্যাসীকে পাঠালেন, ওদেরকে পাহাড় চূড়া পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। স্কিনিং শেডে ডোরাকাটা ডিক-ডিকের ছাল আর খুলিটা পেল নিকোলাস, গুটিয়ে একটা বাণ্ডিল রবানাল, স্ট্র্যাপ দিয়ে আটকে দিল একটা খচ্চরের বোঝার উপর।
এসকর্ট পার্টির সঙ্গে তামেরও রয়েছে। সারাক্ষণ রোয়েনের কাছাকাছি থাকলো সে। ট্রেইল ধরে রওনা হলো ওরা, প্রথম এক মাইল ওদের সঙ্গে আসছেন সন্ন্যাসীদের বড় একটা মিছিল।
দুপুর পার হয়ে গেল টাইটার ড্যাম সাইটে পৌঁছতে। নদীর পানিতে মাথা ধোয়ার কয়েক মিনিট এখানে থামলো ওরা। জলপ্রপাতের উপর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকলো, দু জনের মনই বিষণ্ণ ও কাতর হয়ে আছে।
কবে নাগাদ আবার ফিরব আমরা? ফিসফিস করে জানতে চাইলো রোয়েন।
বর্ষা শুরু হতে আর দেরি নেই, বলল নিকোলাস। হায়েনারাও গন্ধ পেয়ে কাছে চলে আসছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, রোয়েন।
গহ্বরের ভেতর তাকিয়ে বিড়বিড় করলো রোয়েন, এখনো তুমি জেতেনি, টাইটা। খেলায় আবার আমরা ফিরে আসব।
সন্ধে হয়ে এলেও নদীর পাশে স্থায়ী ক্যাম্পসাইটে থামলো না ওরা, অন্ধকারে পথ চলা অসম্ভব না হওয়া পর্যন্ত কয়েক মাইল এগুলো। তাঁবু ফেলে আরাম করার কথা ভাবল না কেই, সন্ন্যাসীদের দেওয়া রুটি আর ছাগলের দুধ খেয়ে পাথুরে জমিনের উপর বেডরোল খুলে শোয়ে পড়লো। ক্লান্ত শরীর, সঙ্গে সঙ্গে ঘুম এসে গেল।
*
পরদিন ভোরে সূর্য ওঠার আগে খচ্চরের পিঠে মালপত্র তোলা হলো, কড়া কফি খেয়ে ট্রেইল ধরলো ওরা। সদ্য ওঠা সূর্য ঢালের খাড়া পাঁচিল আলোকিত করে তোলায় এতো কাছে মনে হলো যেনো ছোঁয়া যাবে। রোয়েনের পাশে চলে এসে নিকোলাস বলল, এভাবে হাঁটলে আশা করা যায় বিকেলের দিকে ঢালের গোড়ায় পৌঁছে যাব। জলপ্রপাতের পেছনের গুহায় রাত কাটানো সম্ভব হতে পারে।
তারমানে কাল কোনো এক সময় ট্রাকের কাছে পৌঁছব, বলল রোয়েন। নিকোলাস, অনেকক্ষণ ধরে একটা কথা ভাবছি আমি। ধরুন, আমাদের পোলারয়েড আর রাবিংগুলো পেগাসাসের কারো হাতে পড়েছে, যে ওগুলোর অর্থ করতে পারবে। আমরা কতদূর এগিয়েছি এটা বোঝার পর তার প্রতিক্রিয়া কি হবে?
ও-সব কথা পরে ভাবা যাবে, রোয়েন, জবাব দিল নিকোলাস। সঙ্গে রিগবি রাইফেলটা পর্যন্ত নেই, কাজেই খুব অসহায় বোধ করছি। আগে প্রাণে বাঁচি, তারপর অন্য কিছু।
কিফ, খচ্চরচালক, আর সন্ন্যাসীরাও তাই ভাবছে, কারণ দেখা গেল তাদের হাঁটার গতি মুহূর্তের জন্যও মন্থর হচ্ছে না। দুপুরের দিকে অল্প সময়ের জন্য থামার নির্দেশ দিল নিকোলাস, নিজেরা কফি খাবে, খচ্চরগুলোকে পানি খাওয়াবে। কিফ আগুন জ্বালছে। বাইনোকুলার নিয়ে পাথুরে ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলো নিকোলাস। খুব বেশি দূর ওঠেনি, ঘাড় ফেরাতে দেখতে পেল পিছু নিয়ে উঠে
