*
প্রস্তরখনির মুখের কাছে একটা আগুন প্রস্তুত করলো নিকোলাস। সবার মধ্যে খাবার বিলি-বণ্টন করে দিল। দারুণ তৃপ্তি নিয়ে খেলো রোয়েন।
প্ৰস্তুরখনির দেয়ালে আগুনের কারণে ওদের ভূতুড়ে ছায়া পড়েছে। আচমকা একটা নাইটজার ডেকে উঠতে ভয় পেয়ে নিকোলাসের একটু কাছে এসে বসলো রোয়েন।
কী জানি, টাইটা হয়তো এখন আমাদের নিয়ে তামাশা করছে, সে বলে, মনে হয়, এতোক্ষণে তার তো ভয় পাওয়ার কথা। প্রথম অংশের ধাঁধারা সমাধান আমরা করেই ফেলেছি।
পরের ধাপটাই যে কঠিন। ওই হ্রদের নিচে নেমে দেখতে হবে। কি মনে হয়, কি পাবো ওকানে? নিকোলাস জানতে চায়।
কী জানি, অস্বস্তিভরে বলল রোয়েন। কিছু অনুমান করতে ভয় হয়।
আমি মোটেও ভয় পাই না। ঠিক আছে, আপনার হয়ে আমি বলে দেই? রোয়েন হেসে সায় দিতে ও বলে চলে, ওখানে আমরা ফারাও মামোস-এর সমাধির প্রবেশ পথ খুঁজে পাবো। একদম আসল সমাধি! গোজামিল নয়!
কিন্তু অতো নিচে নামবেন কেমন করে? অ্যাকুয়ালাঙ তো নেই।
এখনো জানি না, নিকি স্বীকার যায়। তবে হয়তো পুরোদস্তুর ডুবুরির পোশাকে নামতে হবে।
নিস্তদ্ধতা জেঁকে বসে। অবশেষ নীরবতা ভেঙে একহাত দিয়ে রোয়েনের কাঁধে জড়িয়ে ধরে নিকি। চিয়ার আপ। একটা ব্যাপার পরিষ্কার–যদি আমরা না পাই, তবে আর কেউ মামোসের সমাধি খুঁজে পাবে না।
যদি সত্যিই হ্রদের নিচে সমাধির প্রবেশপথ থেকে থাকে, তবে সপ্তম ফ্রোলের অনেক কথাই ভুয়া। মানে যে তথ্য আমরা টাইটা, ডুরেঈদ এবং সবশেষে উইলবার স্মিথের মাধ্যমে পেয়েছি।
আরো কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর হঠাৎই উল্লসিত হয়ে উঠে রোয়েন।
ওহ নিকি! কী অসাধারণ একটা খেলায় আমরা নেমেছি। কিন্তু সত্যি পিরবো তো? সত্যি কোনো উপায় কি আছে?
দেখা যাক।
কখন দেখা যাবে?
সময় হলে। এখনো জানি না, তবে প্রচুর প্ল্যানিং আর পরিশ্রম পড়বে কাজটা শেষ করতে হলে।
তো, আপনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এ ব্যাপারে? রোয়েন জানতে চায়।
মুচকি হাসে নিকোলাস। সত্যি বলছি–জীবনেও ভাবি নি টাইটা এ পর্যন্ত নিয়ে আসবে আমাদের। আবার এমনও ভাবছি না, স্রেফ দরজা ভেঙে লুট করে আনবো মামোসের সম্পদ। হাওয়ার্ড কার্টার কতো কষ্ট করে তুতেনখামেনের সমাধি পেয়েছেন, জানেন না? তবে, সত্যি, রোমাঞ্চ পেয়ে বসেছে আমাকে। আমি এর শেষ দেখবো!
একসময় নিকোলাসের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো রোয়েন। ও ঘুমিয়েছে, নিশ্চিত হওয়ার পরই একটা চুমো খেলো নিকোলাস, ফর্সা কপালটায়।
আপনমনেই হাসলো একটু মেয়েটা।
*
ঘুমটা কোনো ভাঙল বুঝতে পারেনি নিকোলাস। কোথায় রয়েছে মনে পরল, দেখলো পাথরখনির ভেতর ওর কাছাকাছি শুকনো ঘাসের উপর শুয়ে রয়েছে রোয়েন। আকাশে চাঁদ নেই, তবে তারাগুলো যেনো মাটির কাছাকাছি নেমে এসেছে, একেকটা পাকা আঙুরের মতো বড়। আগুনটা নিভে এসেছে, ওধারে শুয়ে নাক ডাকছে তামের। ব্লাডার খালি করার জন্য উঠতে হলো নিকোলাসকে।
আগুনটাকে পাশ কাটিয়ে ফিরে আসছে, যে শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে সেটা আবার ভেসে এলো দূর থেকে অস্পষ্ট, পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলে আসছে, ফলে বোঝা যায় না উৎসটা ঠিক কোনো দিকে। এ আওয়াজ আগেও অনেকবার শুনেছে ও। অটোমেটিক গানফায়ারের শব্দ, সম্ভবত একে-ফরটিসেভেন অ্যাসল্ট রাইফেল থেকে বের হচ্ছে। বিরতিহীন নয়, প্রতিবার তিন রাউন্ড করে। প্রফেশনালের কাজ।
ভোরের দিকে রোয়েনের ঘুম ভাঙালো নিকোলাস। অবশিষ্ট রেশন থেকে ব্রেকফাস্ট সেরে গোলাগুলির কথাটা জানালো ওকে। বোরিস হতে পারে? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন।সে হয়তো মেক নিমুর আর টিসেকে ধরে ফেলেছে।
মনে হয় না। বোরিস কয়েকদিন আগে রওনা হয়েছে, তার গুলির আওয়াজ এতো দূর পৌঁছবে না।
তাহলে?
কী জানি। আমার ভালো ঠেকছে না রোয়েন। কেয়ারিটা আরেকবার দেখে ক্যাম্পে ফিরে যাই চলুন।
আলো জোরালো হতে পাথরখনির কয়েকটা ছবি তুললাম নিকোলাস। কয়েকটা ব্লকের ছবি তোলার সময় ওগুলোর পাশে পোজ নিল রোয়েন, মেরিলিন মনরোর ভঙ্গিতে একটা হাত মাথার পেছনে রেখে।
উপত্যকার ঢাল বেয়ে ফেরার পথে সন্তুষ্ট দেখালো ওদেরকে, প্রাচীন পাথরখনি আবিষ্কার ওদের অভিযানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। এরপর কীভাবে কী করা হবে, সে আলোচনায় মগ্ন হয়ে পড়লো ওরা। গহবরের নিচের অংশ ফ্যাকাসে লাল পাহাড় প্রাচীনের কাছে যখন পৌঁছল, বেলা তখন প্রায় এগারোটা। মঠ থেকে ট্রেইল ধরে উঠে আসা একদল সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা হলো ওখানে।
রোয়েনের নির্দেশে ব্যাপার কি জানার জন্য সন্ন্যাসীদের দিকে ছুটলো তামের। তামেরকে দেখে কেঁদে ফেললো সন্ন্যাসীরা, চিৎকার করে দুঃখজনক কোনো ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছে। একটু পরই ছুটে ফিরে এলো তামের।
আপনাদের ক্যাম্পে লোকজন নেই। একদল শয়তান এসেছিল। চাকরবাকরদের অনেকেই নেই–খুন হয়ে গেছে।
খপ করে রোয়েনের কব্জি চেপে দরল নিকোলাস। আসুন! ছুটলো ও, দেখি কি হয়েছে!
*
শেষ এক মাইল ছুটে ক্যাম্পে পৌঁছল ওরা, কিচেন শেডের সামনে কিছু একটাকে ঘিরে আরো একদল সন্ন্যাসীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেল। ভিড় ঠেলে সামনে চলে এলো নিকোলাস, পেটে শূন্য একটা অনুভূতি, আতংকে মুখের ঘাম ঠাণ্ডা লাগছে। ঝাঁকে ঝাঁকে ভন ভন করছে নীল মাছি, মাঝখানে পড়ে আছে রক্তে ভাসমান কুক সহ আরো তিনজন ক্যাম্প সার্ভেন্টের লাশ। প্রথমে তাদের হাতগুলো পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে, হাঁটু গাড়তে বাধ্য করা হয়েছে মাটিতে, তারপর খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে মাথার পেছনে।
