ওগুলো সে পেল কোত্থেকে? হঠাৎ জানতে চাইলো রোয়েন।
কে কি পেল? নিকোলাস বিস্মিত।
আপনি বুঝতে পারছেন না? ভুল দিক থেকে শুরু করেছি। আমরা জানার চেষ্টা করছি ব্লকগুলোর কি গতি হয়েছে। তার বদলে আমাদের খোঁজ করা উচিত নয়, ব্লকগুলো টাইটা পেল কোত্থেকে?
তাই তো! শেষটা জানার চেষ্টা করছি আমরা, শুরুটা নয়। বাঁধের ভাঙা পাঁচিল নয়, আমাদের খোঁজা উচিত পাথরের খনি।
কোত্থেকে শুরু করা যায়? রোয়েনের ব্যাকুল প্রশ্ন।
রোয়েনের প্রশ্ন বুঝতে পারুক বা না পারুক, খিক খিক করে হেসে উঠলো তামের। দু জনেই ওরা একযোগে তার দিক তাকালো। তারপর হাতছানি দিয়ে তামেরকে ডাকলো রোয়েন। পাশে বসিয়ে আরবিতে পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করে বলল তাকে। শোনার পর চোখ বড় বড় করলো তামের, তারপর উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলো, জেসাস স্টোন! জেসাস স্টোন! আসুন আমার সঙ্গে, আপনাদের দেখাই! দাঁড়ালো রোয়েন, তামের তাকে টেনে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে উপত্যকার ঢাল বেয়ে।
তামের ছুটছে, তার সঙ্গে রোয়েনকেও ছুটতে হচ্ছে। আনন্দে অ্যামহারিক গীত গাইছে ছেলেটা। ওদের পিছু নিয়ে আস্তে ধীরে হাঁটছে নিকোলাস। উপত্যকার আধ মাইল নিচে মিলিত হলো ওদের সঙ্গে।
এখানে নিকোলাস তামেরকে দেখলে হাঁচু গেড়ে বসে পাথুরে পাঁচিলে কপাল ঠেকিয়ে রেখেছে। প্রার্থনা করছে সে, চোখ দুটো বন্ধ। তার পাশে রোয়েনও বসে আছে।
খানিক পর লাফ দিয়ে সোজা হলো তামের, ধুলোর উড়িয়ে নাচল কিছুক্ষণ।
প্রার্থনা শেষ, এবার আমরা জেসাস স্টোনের কাছে যেতে পারি। রোয়েনের হাত ধরল আবার, পাথরে পাঁচিল ঘেঁষে এগুলো। নিকোলাসের সামনে থেকে ওরা দু জন যেনো চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল, যাকে বলে বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো নিকোলাস।
রোয়েন! ডাকলো ও।কোথায় আপনি? কী ব্যাপার?
এদিকে, নিকোলাস! এদিকে আসুন!
সাবধানে পা ফেলে পাথরের পাঁচিলের সামনে চলে এলো নিকোলাস। ওহ, গড! এ তো আমি এক বছর চেষ্টা করলেও খুঁজে পেতাম না!
পাহাড়-প্রাচীরের গা ভাঁজ খোঁজে, ভেতর দিকে ঢুকে গেছে, তৈরি করেছে গোপন একটা প্রবেশপথ। খাড়া দুই পাশ বেয়ে ওপরে উঠে গেল নিকোলাসের দৃষ্টি, ফাঁকটায় ঢুকে পড়েছে। ত্রিশ কদম পার হতে খোলা একটা অ্যামফিথিয়েটারে ঢুকলো, কম করেও একশো গজ লম্বা হবে, আকাশের দিকটা উন্মুক্ত। দেয়ালগুলো নিরেট পাথর, এক পলক তাকিয়েই নিকোলাস বুঝতে পারলো উপত্যকার মেঝেতে রোয়েনের পাওয়া পাথরটার মতো স্ফটিকতুল্য শিলা বা অভ্র এগুলো।
লক্ষণ দেখে বোঝা গেল গামলা থেকে পাথর কেটে ফাঁকা করা হয়েছে জায়গাটা, সারি সারি স্তর কাটার দাগ পাচিলের মাথা পর্যন্ত লম্বা। কাটার পর সব ব্লক সরানো হয়নি, অ্যাম্পিথিয়েটারের মেঝেতে স্থপ করা রয়েছে। আবিষ্কারটা হতভম্ব করে তুলেছে নিকোলাসকে, নড়তে বা কথা বলতে পারছে না। একেবারে নিখুঁত চারকোনা পাথরও পড়ে আছে মেঝেতে, প্রয়োজন না পড়ায় বের করা হয় নি। রোয়েনকে নিয়ে সেটার সামনে দাঁড়িয়েছে তামের।
রোয়েনের হাত ধরে ঝাঁকাচ্ছে তামের। জেসাস স্টোন। জেসাস আমাকে পথ দেখিয়ে এখানে নিয়ে আসেন। প্রথম যেদিন এলাম, দেখি এ পাথরে উপর দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। লম্বা সাদা দাড়ি ছিল, চোখ দুটো মায়া ভরা, দয়ালু, কিন্তু বিষণ্ণ। গান শুরু করে বুকে ক্রস চিহ্ন আঁকল সে, গানের তালে তালে দুলছে।
এগিয়ে এসে নিকোলাস দেখলো পাথরটার উপর শুকনো ফুল, মাটির পাত্র, তেজ ফ্লাস্ক ইত্যাদি পড়ে রয়েছে। তার মানে নিয়মিতই এখানে আসে তামের, জেসাস স্টোন তার ব্যক্তিগত বেদি, যিশুকে খুশি করার জন্য নৈবেদ্য দিয়ে যায়।
প্রাচীন বেদির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করছে রোয়েন, দেখা দেখি তামেরও। প্রার্থনা শেষ হতে নিকোলাসের পাশে চলে এলো রোয়েন, দু জন ঘুরেফিরে দেখছে পাথরখনির মেঝেটা। এতো নিচু গলায় কথা বলছে ওরা, জায়গাটা যেনো পবিত্র কোনো ধর্মীয় স্থান।
ঘুরেফিরে দেখার পর পাথরখনির প্রবেশমুখে থামলো ওরা, ইতোমধ্যে সূর্য ডুবে গেছে, দ্রুত অন্ধকার হয়ে আসছে চারদিক। একটা সাইজ করা চৌকো পাথরের উপর বসলো ওরা, তামের বসলো ওদের পায়ের কাছে হামাগুড়ি দেওয়ার ভঙ্গিতে; মুখ তুলে রোয়েনের দিকে তাকিয়ে আছে।
নিকি তামেরের দিকে তাকালো। তামের, তোমার উপর আমরা খুব খুশি।
তুমি খুব ভালো ছেলে।
ওর প্রশংসা পরে করলেও চলবে, বলল রোয়েন। চলুন, ফিরে যাই।
ফেরাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, বলল নিকোলাস। আজ চাঁদ উঠবে না, অন্ধকারে পা ভাঙব।
এখানে ঘুমানোর প্ল্যান করছেন? রোয়েন অবাক।
অসুবিধে কি? বললেই আগুন জালতে পারি। সঙ্গে সারভাইভাল রেশন আছে। আর আপনার সঙ্গে তো প্রহরী আছেই, কাজেই আপনার সম্ভ্রম হুমকির সম্মুখীন হবে। না।
সত্যিই তো, অসুবিধে কী!
আগুন জ্বালার জন্য শুকনো ডালপালা সংগ্রহ করতে যাবে নিকোলাস, হঠাৎ স্থির হয়ে কান পাতলো। শব্দটা রোয়েনও শুনতে পাচ্ছে। আবার সেই পেগাসাস হেলিকপ্টার, বলল নিকোলাস। এই অসময়ে কি খুঁজছে ওরা?
মাথার উপর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো ওরা, এক হাজার ফুট উপর দিয়ে উড়ে গেল কপ্টারটা, লাল আর সবুজ নেভিগেশন্যাল আলো মিটমিট করতে দেখা গেল। মঠের দিকে যাচ্ছে ওটা।
