সরাসরি উত্তরে লম্বা সরু শৈলশিরা ও মালভূমি খাড়া পাচিলের মতো মাথাচাড়া দিয়ে আছে, যেনো সছিদ্র দুর্গ-প্রাকার, অসংখ্য ভাঁজ আর খাজ বিশিষ্ট। আরো দূরে ও উপর দিকে অস্পষ্ট পাহাড়শ্রেণী, পর্বতমালার চূড়া, কাছাকাছি উজ্জ্বল নীল আফ্রিকান আকাশের গায়ে স্নান নীল পাখির পালকের মতো।
প্রকৃতির বিধ্বস্ত রূপ, নিজের চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করলো রোয়েন। টাইটা এ জায়গা কেন বেছে নিয়েছিল, বোঝা যায়। অনুপ্রবেশ এখানে প্রায় অসম্ভব।
ছবিটা এখন পরিষ্কার, বলল নিকোলাস, হাত লম্বা করে নিচের উপত্যকাটা দেখালো। উপত্যকার বিভক্তিরেখা স্পষ্ট। জমিনের স্বাভাবিক পতনও দেখতে পাচ্ছি। ওদিকে, খাদের ওপার থেকে আমাদের নিচের পয়েন্ট পর্যন্ত সবচেয়ে সরু। সরু গলা বলতে পারি, নদী সংকুচিত হয়ে ওটা দিয়ে বেরিয়েছে-বাঁধ তৈরির জন্য আদর্শ সাইট। শরীরটা মুচড়ে বাম দিকটা দেখালো রোয়েনকে। নদীর পানি উপত্যকায় ছড়িয়ে দেওয়া কঠিন কাজ ছিল না। গহ্বরের ভেতর নদী শুকিয়ে যাবার পরও সে ওখানে কী করেছে আমরা জানি না। তারপর বাঁধের দেয়াল ভেঙে ফেলে সে, সেটা আরো সহজ কাজ ছিল। ভেঙে ফেলার পর নদী আবার তার স্বাভাবিক কোর্স ফিরে পায়।
ওদের দু জনের মুখভাব গভীর আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ করছে তামের, যে যখন কথা বলে তখন তার দিকে তাকায়। কিছুই বুঝছে না, তবু রোয়েনের প্রতিটি হাবভাব ও আচরণ তার উপর বিরাট প্রভাব ফেলছে। রোয়েন মাথা ঝাঁকালে সে-ও আঁকায়। রোয়েন ভুরু কোঁচকালে সে-ও তাই করে। আর রোয়েন যখন হাসে, খিকখিক করে সে-ও হেসে ওঠে।
নদীটা ছোট নয়, বলল রোয়েন।
নিশ্চয়ই মাটি দিয়ে বাঁধটা বানায় নি?
মাথা নাড়ল নিকোলাস। মাটি দিয়ে এ নদীকে বশ মানানো সম্ভব নয়। রক স্ল্যাব বা পাথরের ফলক দিয়ে সম্ভব। পরে বাঁধটা ভেঙে ফেললেও কিছু কিছু আলামত থাকার কথা।
তাহলে খোঁজ শুরু করতে হয়, বলল রোয়েন। প্রথমে খাদের সরু গলায়। তারপর ভাটির দিকে এগিয়ে যাব।
ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করলো ওরা। রোয়েনের জন্য সহজ পথ অনুসরণ করছে তামের। রোয়েনের হাতছানি দিচ্ছে সে। উপত্যকার গলায় বেরিয়ে এলো ওরা, দাঁড়ালো নদীর পাথুরে পাড়ে, নিজেদের চারদিকে চোখ বুলাচ্ছে।
বাঁধের পাঁচিল কত উঁচু ছিল? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন।
খুব বেশি উঁচু হওয়ার কথা না। পাঁচিলের পাশ ধরে খানিকটা ওপরে উঠলো নিকোলাস, ওখানে উবু হয়ে বসে সামনে-পেছনে মাথা ঘোরাল, প্রথমে দেখে নিল উপত্যকার নিচের দিকের দৈর্ঘ্য,. তারপর দেখলো গহ্বরের মুখে পতনশীল জলপ্রপাতের ঠোঁট। তিনবার স্থান বদল করলো নিকোলাস, প্রতিবার ঢালের আরেকটু উপর উঠে গেল। যত উঠলো ততই খাড়া হচ্ছে ঢাল। শেষে দেখা গেল ঢালের গায়ে অনেক কষ্টে ঝুলে আছে ও, তবে চেহারা দেখে মনে হলো সন্তুষ্ট। ওখান থেকেই চিৎকার করলো রোয়েনের উদ্দেশে, আমার ধারণা এ পর্যন্ত উঁচু ছিল বাঁধটা। ধরুন, পনেরো ফুট।
রোয়েন এখনো নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, ওখান থেকে এবার উল্টোদিকের পাড়ে তাকালো, পাড় থেকে খাড়া উঠে যাওয়া হলে একশো ফুট, গলা চড়িয়ে বলল।
কঠিন কাজ, তবে অসম্ভব নয়, বলল নিকোলাস।
কাজের কোনো চিহ্ন দেখতে পাচ্ছেন? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন। বাধের পাঁচিল পাহাড়ের গায়ে ঠেকাতে হয়েছিল টাইটাকে।
একই লেভেলে থেকে জায়গা বদল করলো নিকোলাস। এক সময় সরাসরি জলপ্রপাতের উপর চলে এলো, তারপর আর সামনে এগোবার উপায় দেখছে না। নিচে, রোয়েন আর তামেরের পাশে নেমে এসে বলল, প্রায় চার হাজার বছর আগের ঘটনা। কোনো চিহ্ন না থাকাই স্বাভাবিক। রক ব্লক বা পাথরের ফলক পাওয়া যায় কিনা দেখতে হবে। বাঁধ ভেঙে ফেলার পর তীব্র স্রোতে ভেসে গেলেও কত দূর আর যাবে।
উপত্যকা বেয়ে নামতে শুরু করলো ওরা। খানিক দূর নামার পর একটা পাথরের খণ্ড দেখতে পেল রোয়েন, আশপাশের অন্যান্য পাথরের সঙ্গে যেনো বেমানান। পুরানো আমলের কেবিন ট্রাংকের মতো আকার। শ্যাওলা আর লতাপাতায় অর্ধেকটাই ঢাকা, তবে বেরিয়ে থাকা অংশে ডান দিকে মোচড় খাওয়া একটা কোণ স্পষ্ট। নিকোলাসকে ডেকে দেখালো ও।
স্ল্যাবটার গায়ে হাত বুলালো নিকোলাস। সম্ভব। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বাটালির দাগ পেতে হবে, রাজমিস্ত্রী যেখানে ফাটল ধরাবার চেষ্টা করেছিল। আপনি জানেন, প্রথমে পাথরের গায়ে বাটালি দিয়ে গর্ত করা হতো, তারপর গজাল ঢুকিয়ে চাপ দেওয়া হতো, যতক্ষণ না ফেটে যায়।
আরো আধ কিলোমিটার পর্যন্ত উপত্যকার মেঝে সার্চ করলো ওরা। বন্যায় সময়ও এতো দূরে কোনো ব্লক ভেসে আসবে না, বলল নিকোলাস। চলুন, দেখি জলপ্রপাত হয়ে গহ্বরের মুখে কিছু পড়েছে কিনা।
ডানডেরার পাড়ে ফিরে এলো ওরা, ঢাল বেয়ে নামলো জলপ্রপাত পর্যন্ত। উঁকি দিয়ে তাকালো নিকোলাস।
ভাটির চেয়ে এদিকটায় গভীরতা কম, বলল নিকোলাস। আমার ধারণা একশো ফুটও হবে না।
ভাবছেন আপনি ওখানে নামতে পারবেন? রোয়েনের চোখে সন্দেহ। নিচ থেকে বিস্ফোরিত হয়ে উঠে আসছে বাষ্পকণা ঘন মেঘের মতো, চোখ-মুখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। পানির বিরতিহীন পতন বজ্রপাতের মতো আওয়াজ করছে, কথা বলার সময় চিৎকার করছে ওরা।
রশি, টেনে তোলার লোক থাকলে ভেবে দেখা যেত। কিনারায় শক্ত হয়ে বসলো নিকোলাস, চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে নিচের গামলার দিকে তাকালো। আলগা পাথরের ছোটবড় অনেক প রয়েছে ওখানে-ছোট আকৃতির গোল পাথর, কয়েকটা বেশ বড়। কিছু পাথর কোণ বিশিষ্ট, কল্পনার সাহায্য নিলে কিছু পাথরকে চৌকো বলেও মনে হবে। তবে ওগুলোর সারফেস পানির তোড়ে মসৃণ হয়ে আছে, ভেজা ও চকচকে। বেশিরভাগই আংশিক জলমগ্ন, সচল জলকণায় ঢাকা।
