তা আছে, বলল নিকোলাস, কিন্তু আপনি আসলে বলতে চাইছেন কী?
এখানে আসার পথে আমরা মন্তব্য করেছিলাম এ উপত্যকা সম্ভবত এক সময় ডানডেরা নদীর আদি কোর্স ছিল, পরে নদীটা গহ্বরের ভেতর আলাদা একটা তলা তৈরি করে নেয়।
হ্যাঁ, মনে আছে।
এ পয়েন্টের জমিন নীলদের দিকে খুব বেশি ঢালু, তাই না? এবার বলুন, আপনার কী মনে আছে, শুকনো উপত্যকা বেয়ে নামার সময় আরেকটা ছোট প্রবাহ দেখেছিলাম আমরা? মনে হয়েছিল প্রবাহটা উপত্যকার পূর্বদিকের কোথাও থেকে বেরিয়েছে?
কী বলতে চাইছেন বুঝতে পারছি, বলল নিকোলাস। আপনার ধারণা সিঙ্ক হোল দিয়ে ঢুকে ওই পথে বেরিয়েছে স্রোতটা। দাঁড়িয়ে পড়লো নিকোলাস। সরেজমিনে তদন্ত করে দেখতে অসুবিধে কী?
ক্যামেরা ব্যাগ আর হালকা ডে-প্যাক নেওয়ার জন্য নিজের কুঁড়েতে চলে গেল নিকোলাস, ফিরে এসে দেখলো রোয়েন যাবার জন্য তৈরি হয়েছে, তবে ইতোমধ্যে ওর একজন সঙ্গী জুটেছে।
পথে ওদের সামনে থাকলো তামের, এগুচ্ছে নাচতে নাচতে, সরু কাঠির মতো পায়ের চারপাশে আলখেল্লার জুল ফুলে ফুলে উঠছে। নৃত্যের সঙ্গে গীতও গাইছে। ছেলেটা। অ্যামহারিক ভাষায় তার তেমন দখল নেই, তবে যিশু আর সেইন্টদের নিয়ে যত গান আছে তার প্রায় সবই মুখস্থ। কয়েক মিনিট পরপর পেছন ফিরে তাকাচ্ছে সে, দেখে নিচ্ছে রোয়েন ঠিকমতো আসছে কিনা। আগুনের মতো গরম রোদের ভেতর উপত্যকার ঢাল বেয়ে ওঠা অত্যন্ত ক্লান্তিকর, ওরা দু জন ঘেমে একেবারে নেয়ে উঠলো। কিন্তু তামেরকে যেনো পরিশ্রম বা রোদ স্পর্শই করছে না, আগের মতোই হাসি-খুশি আর অক্লান্ত লাগছে তাকে।
ঝরনার বা প্রবাহটা উপত্যকার যেখানে বেরিয়েছে সেখানে পৌঁছে কয়েকটা অ্যাকেইশা গাছের ছায়ার বসে পড়লো ওরা। বিশ্রাম নেয়ার সময় চোখে বাইনোকুলার তুলে উপত্যকার পাশটা পরীক্ষা করছে নিকোলাস। ঘন ঝোপে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, খানিক পর মন্তব্য করলো। দুঃখিত, পায়ে হেঁটেই উৎসের সন্ধান করতে হবে।
আবার হাঁটা শুরু হলো। উপত্যকার পাশ বেয়ে উঠে যাচ্ছে, মাথার উপর সূর্য। জলপ্রবাহের কিনারা ধরে হাঁটছে ওরা। কয়েক জায়গায় জমা হয়েছে ঝরনার পানি, সেখান থেকে খুদে জলপ্রপাত লাফ দিয়েছে নিচের দিকে। ঘন ঝোঁপ, শিকড় যেখানে পানির নাগাল রয়েছে সেখানে ওগুলো তাজা আর গাঢ় সবুজ। পানির উপর কালো আর হলুদ প্রজাপতি মেঘের মতো উড়ছে। সবুজ শ্যাওলা মোড়া পাথরে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে সাদা-কালো একটা খঞ্জনা। ঢালের অর্ধেক দূরত্ব পেরিয়ে ছোট একটা জলাশয়ের পাশে বিশ্রাম নিতে বসলো ওরা। বিরক্ত করছে দেখে হ্যাট দিয়ে একটা ফড়িংকে বাড়ি মারল নিকোলাস, ছিটকে সেটা ঝরনার পানিতে পড়লো। দুর্বল ভঙ্গিতে পা ছুঁড়ছে ওটা, স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে নিচের দিকে, এ সময় পানির ভেতর থেকে গাঢ় একটা ছায়া মাথাচাড়া দিল। আলোড়ন উঠলো পানিতে, আয়নার মতো রূপালি পেট ঝিক করে উঠলো, অদৃশ্য হয়ে গেল ফড়িংটা।
মাছ! কম করেও দশ পাউন্ড! ইস, রডটা আনি নি!
ঝরনার পাশে নিকোলাসের কাছাকাছি বসে আছে তামের। হঠাৎ একটা হাত তুলে লম্বা করলো সে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রজাপতি উড়ে এসে বসলো তার আঙুলে। হলুদ আর কালো ভেলভেটের মতো ডানা বারবার মেলছে আর গুটাচ্ছে। নিকোলাস আর রোয়েন তাকিয়ে আছে অবাক চোখে, কারণ ওদের মনে হলো তামের ডাক দেয়াতেই তার আঙুলে এসে বসেছে ওটা। খিকখিক করে হেসে উঠে হাতটা আমার দিকে সরিয়ে আনল তামের। দেখাদেখি রোয়েনও ওর হাত তুলে লম্বা করলো। এবং কি আশ্চর্য, প্রজাপতিটা উড়ে চলে এলো ওর আঙুলে।
খিলখিল করে হেসে উঠলো রোয়েন। ধন্যবাদ, তামের, এতো সুন্দর একটা উপহার দেয়ার জন্য, হাসি থামতে বলল ও। হালকা একটু ফুঁ দিয়ে প্রজাপতিটাকে উড়িয়ে দিল, নিকোলাসের দিকে ফিরে ইংরেজিতে বলল, বুনো পশু-পাখিদের সঙ্গে ওর খুব ঘনিষ্ঠতা লক্ষ্য করেছেন? ব্যাপারটা অদ্ভুত না?
সন্ন্যাসী আর পুরোহিতরা বিনা বাধায় ওকে ঘুরে বেড়াতে দেয়, পশু-পাখিরা সম্ভবত জেনে ফেলেছে ওর দ্বারা তাদের কোনো ক্ষতি হবে না।
যেনো ওদের কথা বুঝতে পেরেই হেসে উঠে আবার হাতটা লম্বা করলো তামের। এবারও প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রজাপতি এসে বসলো তার আঙুলে।
আরো পঞ্চাশ ফুট উপরে ওঠার পর ঝরনার উৎসটা দখেতে পেল ওরা। লাল স্যান্ডস্টোনের নিচু একটা পাঁচিল দেখা গেল, পাঁচিলের গায়ে একটা গুহামুখ, সেটার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে ঝরনার পানি। গুহামুখে ঘন ঝোঁপ, ভেতরটা দেখা যায় না। হাঁটু গেড়ে ঝোঁপ সরাল নিকোলাস, নিচু ফাঁকের ভেতর তাকাতে চেষ্টা করলো। তেমন কিছু দেখার নেই। ভেতরটা অন্ধকার, বলল ও। তবে অনেক লম্বা গুহাটা।
ওটার তুলনায় আপনি অনেক বড় হয়ে যাচ্ছেন, বলল রোয়েন। আমাকে ঢুকতে দিন।
ভেতরে কেউটে থাকতে পারে, সাবধান করলো নিকোলাস। প্রচুর ব্যাঙ দেখতে পাচ্ছি।
জুতো খুলে ঝরনার পানিতে নেমে পড়লো রোয়েন, নিকোলাসের কথা যেনো শুনতে পায় নি। স্রোত ঠেলে এগুতে কষ্ট হচ্ছে ওর, তবে ডুবেছে মাত্র উরুর অর্ধেকটা। গুহাটা নিচু, ভতরে ঢোকার সময় ঝুঁকে শরীরটাকে প্রায় অর্ধেক করে নিতে হলো। ভেতরে ঢোকার পর বলল, সামনের দিকে আরো নিচু হয়ে এসেছে ছাদ।
