শিলালিপির বসন্ত পর্বের বাকি অংশটুকু ডিসাইফার করেছি আমি। নোটবুকটা খুলে নিজের হাতের লেখাটুকু দেখালো রোয়েন। এগুলো প্রাথমিক নোট, এখানে সেখানে কিছু প্রশ্ন চিহ্ন আছে। কোথাও অনুবাদ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি নি, কোথাও হয়তো টাইটা নতুন সংকেত ব্যবহার করেছে। এগুলো নিয়ে পরে মাথা ঘামাব। সবুজ কালিতে লেখা এগুলো উদ্ধৃতি, মৃতের পুস্তক থেকে নেওয়া। খানিকটা পড়ি। বিশ্বকে আঁকা হয়েছে বৃত্তাকারে, সূর্য দেবতার চাকতি, আমন রা। মানুষের জীবন একটা বৃত্ত, শুরু জরায়ুতে, শেষ সমাধিতে। রথের চাকার বেড় তার নিচে হত্যা করে একটা সরীসৃপকে।
হলুদ কালিতে এ যে, লেখাগুলো দেখছেন, এগুলো মৃতের পুস্তক বা অন্য কোনো উৎস থেকে এসেছে বলে মনে হয় নি আমার। এগুলো টাইটারই লেখা বলে আমার ধারণা। বিশেষ করে এ প্যারাগ্রাফটার উপর আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি। পড়ছি-দেবীর কন্যা গর্ভবতী হলো। সে গর্ভবতী হলো এমন একজনের দ্বারা যার কোনো শুক্র নেই। সে তার যমজ বোনকেও নিজের ভেতর ধারণ করছে। তার নিজের জরায়ুতে চিরকালের জন্য কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে ণটা। তার যমজ কোনোদিনই জন্ম নেবে না। আর আলো কোনোদিনই তার দেখা হবে না। চিরকাল অন্ধকাররেই কাটাতে হবে তাকে। বোনের জরায়ুতে বোন, তার বর তাকে চিরকালীন বৈবাহিক সূত্রে বাঁধতে চাইলো। জন্ম না হওয়া যমজ বোন হলো দেবতার কনে, যিনি কিনা একজন মানুষ। ওদের নিয়তি পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ওরা অনন্তকাল বাঁচবে। ওদের বিনাশ নেই।
নোট বুক থেকে মুখ তুললো রোয়েন। আমরা আগেই একমত হয়েছি, দেবীর কন্যা মানে হলো ডানডেরা নদী। গড বা দেবতা এক সময় মানুষ ছিলেন, তার মানে পরে তিনি ফারাও হন। দেবতা হিসেবে বরণ করে একমাত্র মামোসকেই মিশরের সিংহাসনে তোলা হয়। তার আগে তিনি একজন মানুষ ছিলেন।
মাথা ঝাঁকালো নিকোলাস। শুক্ৰহীন ব্যক্তি টাইটা নিজেই, বোঝা যায়। সে যে খোঁজা পুরুষ, এ-কথা বারবার বলেছে। তবে রহস্যময় যমজ বোন সম্পর্কে কী ভাবছেন আপনি?
নদীর যমজ স্বভাবতই একটা শাখা হবে, কিংবা স্রোতের আরেকটা ধারা, তাই না?
আপনি বলতে চাইছেন সিঙ্কহোল ডানডেরার যমজ বোন। খাদের তলায় ওটা কোনোদিনই রা-র আলো দেখবে না। টাইটা, যার শুক্র নেই, পিতৃত্ব দাবি করছে, তার মানে বলতে চাইছে সে-ই আসলে আর্কিটেক্ট।
ঠিক তাই। আর নদীর যমজ বোনের সঙ্গে ফারাও মামোসের বিয়ে দিয়েছে, যে বিয়ে অনন্তকাল স্থায়ী হবে। সব মিলিয়ে দেখার পর আমি উপসংহারে পৌঁছেছি, ওই সিঙ্কহোলের ভেতরটা দেখার সুযোগ না পেলে ফারাও মামোসের সমাধির লোকেশন কোনোদিনই আমারা খুঁজে পাব না।
কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব বলে আপনার ধারণা?
কাঁধ ঝাঁকালো রোয়েন। আমি ইঞ্জিনিয়ার নই, নিকোলাস। কীভাবে কী করবেন, আপনার উপর ছেড়ে দিলাম। আমি শুধু জানি, টাইটা ওই সিঙ্কহোলে কাজ করেছে। সে পারলে, চার হাজার বছর পর আজ আপনারও পারা উচিত।
কিন্তু টাইটার সঙ্গে কি আমার তুলনা চলে? টাইটা ছিল একটা প্রতিভা। আমি পণ্ডিত, এ-কথা বারবার বলছে সে। আর আমি? আমি তো সামান্য একজন….
আপনি যা-ই হোন, আমি জানি আমাকে আপনি হতাশ করবেন না! মুচকি হেসে বলল রোয়েন।
*
বোরিস আর টিসে ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাবার পর গোপনীয়তা বজায়। রাখার আর কোনো প্রয়োজন থাকলো না, এখন আর রোয়েনের কুঁড়েতে চুপিচুপি ঢুকে ফিসফিস করে কথা বলতে হয় না নিকোলাসকে। যে কুঁড়েতে বসে খাওয়াদাওয়া সারত ওরা সেটাকে বানানো হলো ওদের নতুন হেডকোয়ার্টার। ক্যাম্প স্টাফকে দিয়ে বড় একটা টেবিল তৈরি করালো নিকোলাস, তাতে জড়ো করা হলো স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফসহ অন্যান্য জিনিসপত্র, ইতোমধ্যে ওরা যা সংগ্রহ করতে পেরেছে। কিচেন থেকে নিয়মিত চা যোগান দিয়ে গেল শেফ, কাগজপত্রের উপর হুমড়ি খেয়ে ঘন্টর পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিল ওরা।
একটা ব্যাপারে একমত হলো দুজনেই, সিঙ্কহোলটা মানুষের অর্থাৎ টাইটার তৈরি কিনা বুঝতে হলে উপযুক্ত ইকুইপমেন্ট নিয়ে আবার নামতে হবে ওখানে। তার মানে স্কুবা দরকার হবে। রোয়েন জানালো, ডুরেঈদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে লোহিত সাগরে অ্যাকুয়াল্যাঙ ব্যবহার করেছে সে, তবে তাকে এক্সপার্ট বলা যাবে না।
শুধু ইকুইপমেন্টই নয়, এক্সপার্টদের সাহায্যও দরকার হবে। অপারেশনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করার জন্য এ সব নিয়ে ওদেরকে এলাকায় আবার ফিরে আসতে হবে যথাসম্ভব দ্রুত, বর্ষা মরশুম শুরু হয়ে যাবার আগেই।
ঠিক হলো সিঙ্ক-হোলটা সম্পর্কে আরো খানিক পরিষ্কার ধারণা পাওয়ার পর রওনা হবে ওরা, ফিরে এসে যাতে সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করা যায়।
সিঙ্ক-হোল প্রসঙ্গে নিজের ধারণার কথা বলল নারা, যা ঢোকে তা বেরিয়েও আসে, যেমন উপরে কিছু উঠলে সেটা নেমে আসতেও বাধ্য। ফাটলটার ভেতর এতো জোনে পানি ঢুকছে, নিশ্চয়ই কোথাও দিয়ে বের হচ্ছেও সেই পানি, তাই না?
বলে যান।
একটা ব্যাপার পরিষ্কার। নদীর তলা থেকে ওই সিঙ্কহোলে ঢাকা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। পানির প্রেশার ওখানে ভয়ঙ্কর। তবে আমরা যদি আউটলেটটা খুঁজে পাই, সেদিক থেকে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে দেখতে পারি।
একটা সম্ভাবনা বটে। চেহারা দেখে মনে হলো নিকোলাসের বক্তব্য প্রভাবিত করেছে রোয়েনকে। একটা স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফ টেনে নিল ও। মঠটা চিহ্নিত করে ফটোগ্রাফের উপর একটা বৃত্ত এঁকেছে নিকোলাস। গহ্বরের ভেতর নদীর কোর্সও চিহ্নিত করেছে, যদিও খাদটা এতো সরু আর ঘন ঝোপে এমনভাবে ঢাকা যে ছোট স্কেলের ছবিতে স্পষ্ট দেখা যায় না, হাই-পাওয়ারড ম্যাগনিফাইং লেন্স ব্যবহার করা সত্ত্বেও। এই পয়েন্টে নদীটা গহ্বরে ঢুকছে, আঙুল দিয়ে দেখালো রোয়েন। আর এটা হলো সাইড ভ্যালি, যেটা বেয়ে ট্রেইল ঘুরপথে এগিয়েছে। ঠিক আছে?
