অক্টোপাস নয়, ওয়াটার প্রেশার। পাথরের গায়ে সরু একটা ফাটল আছে, আন্ডারওয়াটার টানেলের মুখ। শ্যাফটের ভেতর তীব্র বেগে পানি ঢুকছে, সেই স্রোতে আটকা পড়েছে ওর পা, তবে শরীরের উপরের অংশে এখনও ওই স্রোতের কোনো প্রভাব পড়ে নি। নিকোলাস টের পাচ্ছে ফাটলটার নির্দিষ্ট একটা আকৃতি আছে, রাজমিস্ত্রির তৈরি চৌকো লিনটেল-এর মতো। এ লিনটেলই ওকে ভেতরে টেনে নিতে চাইছে। হাত দুটো উপরের পাঁচিলে মেলে সমস্ত শক্তি দিয়ে টানটা থেকে পা দুটোকে মুক্ত করতে চাইছে নিকোলাস, কিন্তু আঙুলগুলো ধরার মতো কিছু পাচ্ছে না, মসৃণ আর শ্যাওলায় মোড়া পিচ্ছিল পাথরে হড়কে যাচ্ছে হাত। বাঁকা হয়ে উপড়ে আসছে নখগুলো।
তারপর হঠাৎ সিঙ্কহোলের উপর শেষ ফোকরটার নাগাল পেয়ে গেল নিকোলাস। দু হাত ফোকরের কিনারা ধরে প্রাণপণে চেষ্টা করলো পা দুটোকে
ফাটল থেকে বের করে আনতে। রিজার্ভ শক্তিও ফুরিয়ে এসেছে, দুই হাতের পেশী কাঁপছে থরথর করে, মাংসের নিচে থেকে ফুলে উঠলো ঘাড়ের রগগুলো, মনে হলো মাথাটা বিস্ফোরিত হবে। একেবারে লাভ হলো না তা নয়, সিঙ্কহোলের ভেতর শরীরের ঢুকে যাওয়াটা বন্ধ হয়েছে।
ফুসফুসের সব বাতাস খরচ হয়ে গেছে। বড়জোর আর একবার চেষ্টা করতে পারবে নিকোলাস। গাঢ় মেঘের মতো আকৃতি দেখতে পাচ্ছে চোখের সামনে, নেতিয়ে পড়ে বিশ্রাম নেওয়ার ইচ্ছেটা অদম্য হয়ে উঠলো। কোত্থেকে এতো শক্তি পেল বলতে পারবে না, পা দুটোকে টানছে তো টানছেই। মাথার ভেতরটা অন্ধকার ছিল, হঠাৎ বিভিন্ন রঙের বিস্ফোরণ ঘটল সেখানে, চোখ দুটোকে ধাধিয়ে দিল। তবু ঢিল দেয়নি নিকোলাস, টেনে যাচ্ছে। অনুভব করলো পা দুটো বেরিয়ে আসছে সিঙ্কহোল থেকে স্রোতের টান দুর্বল হয়ে পড়েছে। শক্তির উৎস জানা নেই, নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত করার জন্য আরো জোর খাটালো।
হঠাৎ করেই ছাড়া পেল নিকোলাস, সারফেসের দিকে উঠে আসছে। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে, আবার অন্ধকার হয়ে গেল মাথার ভেতরটা, কানে গর্জন করছে জলপ্রপাতের মতো বিকট শব্দ। নিঃশেষ হয়ে গেছে ও। জানে না কোথায় রয়েছে, সারফেসে পৌঁছতে হলে আর কতটুকু উঠতে হবে। একবার মনে হলো উঠছে না, ডুবে যাচ্ছে। শেষ হয়ে গেছে ও।
পানির উপর ওঠার পরও বুঝতে পারে নি যে উঠেছে। এতো শক্তি নেই যে পানি থেকে মুখ তুলে শ্বাস নেবে। পানিতে মুখ দিয়ে যেনো একটা লাশ ভাসছে। তারপর অনুভব করলো মাথার চুল ধরে টান দিল রোয়েন, ঠাণ্ডা তাজা বাতাসের স্পর্শ পেল মুখে।
নিকোলাস! শ্বাস নিন! চিৎকার করছে রোয়েন। শ্বস নিন, নিকোলাস, শ্বাস নিন!
মুখ খুলে পানি ছাড়লো নিকোলাস, তারপর বিষম খেলো।
আপনি বেঁচে আছেন! ওহ, থ্যাঙ্ক গড! এতো দেরি করছেন দেখে ভাবলাম আপনি ডুবে গেছেন। কেঁদে ফেললো রোয়েন। আর একটু থাকলেই ঠিক ঠিক মরে যেতেন।
খাদ থেকে প্রথমে নিকোলাসকে তোলা হলো, তারপর রোয়েনকে।
*
নিকোলাসের নির্দেশে গ্যানট্রি খুটে ঝোঁপের ভেতর লুকিয়ে রাখা হলো, হেলিকপ্টার থেকে জ্যাক হেলম্ যাতে দেখতে না পায়। কাঁটাঝোঁপের ছায়ায় শুয়ে এক ঘণ্টা বিশ্রাম নিল নিকোলাস, প্রতিটি মুহূর্ত ওর সেবায় ব্যস্ত থাকলো রোয়েন। মাথার ব্যথাটা কোনমতে কমছে না, নিঃশ্বাস ফেলার সময় বুকে ব্যথা অনুভব করছে ও। এক সময় ওকে ধরে দাঁড় করালো রোয়েন। ক্যাম্পে ফেরার সময়। আড়ষ্ট একজন বুড়োর মতো লাগলো নিকোলাসকে, সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যথা। ক্যাম্পে ফিরে ওকে ওর কুঁড়েতে শুইয়ে দিল রোয়েন, মশারি টাঙাল, আগুনের মতো গরম এক মগ চায়ের সঙ্গে দুটো অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট খাওয়াল।
আরো এক মগ চা চাইলো নিকোলাস। সেটা খালি হতে রোয়েন জিজ্ঞেস করলো, এখন একটু ভালো লাগছে?
বোধহয় বাঁচব, বলে হাসলো নিকোলাস।
মুখের রঙ ফিরে এসেছে, বলল রোয়েন, চোখে-মুখে তৃপ্তির ছাপ। যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন না!
আপনার মনোযোগ কাড়ার আর কোনো উপায় ছিল? এখন যখন জানেন যে বাঁচবেন, বলে ফেলুন কী ঘটেছিল?
সিঙ্কহোলটার বর্ণনা দিল নিকোলাস। ও থামতে রোয়েন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো, তারপর বলল, সারফেস থেকে পঞ্চাশ ফুট নিচে ফোকর তৈরি করেছে টাইটা? মাথা ঝাঁকালো নিকোলাস। কীভাবে, নিকোলাস?
চার হাজার বছর আগে ওয়াটারলেভেল আরো হয়তো নিচে ছিল। হয়তো খরায় শুকিয়ে গিয়েছিল নদীর তলা।
কিন্তু তাহলে মাচা দরকার হবে কেন? তাছাড়া, শুকনো নদী খাদের অন্য যে . কোনো জায়গার মতোই, তাই না? না, দুর্গম বলেই এ স্পটটা বেছে নিয়েছিল। টাইটা। অন্তত একটা অন্যতম কারণ।
আপনার সঙ্গে আমি একমত।
তাহলে সারফেসের নিচে ফোকরগুলো টাইটা তৈরি করলো কীভাবে? হাসলো রোয়েন। জানি একই প্রশ্ন অযথা রিপিট করছি। ঠিক আছে, এ প্রসঙ্গ আপাতত থাক। এবার সিঙ্কহোলটার কথা বলুন। সাইজটা কী?
মাথা নাড়লো নিকোলাস। অন্ধকারে মাপার সুযোগ হয় নি। দুই কি তিন ফুট হবে।
দু সারি ফোকরের ঠিক মাঝখানে ফাটলটা?
না, একটু একপাশে। তবে নদীর একেবারে তলায়। চৌকো বলে মনে হয়েছে, তবে তা নাও হতে পারে। জান বাঁচাতে ব্যস্ত ছিলাম, অতশত খেয়াল করি নি।
মানুষের তৈরি? বিড়বিড় করলো রোয়েন, দরজার দিকে এগুলো। নোট আর ফটোগ্রাফগুলো নিয়ে আসি।
ফিরে এসে বিছানার পাশে মেঝেতে সুখাসনে বসলো রোয়েন, কাগজপত্র ছড়িয়ে রাখলো নিজের সামনে। মশারি থেকে মাথা বের করে ওর দিকে তাকালো নিকোলাস।
