বড় বড় যুদ্ধের দৃশ্য দেখানো হয়েছে, নীলনদের পানিতে যুদ্ধজাহাজগুলো পরস্পরের মুখোমুখি। আছে শিকারের দৃশ্য, সিন্ধুঘোটক আর বিশাল সব হাতিকে ধাওয়া করছে শিকারীরা, লম্বা গজদন্ত রোদ লেগে চকচক করছে। কোথাও রক্তপিপাসু পদাতিক বাহিনী উন্মত্ত আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ছে প্রতিপক্ষ বাহিনীর উপর। শত শত রথ নিয়ে বীর যোদ্ধারা ছুটে চলেছে রণক্ষেত্র অভিমুখে, গিরিখাদের তলায় ধুলো উড়ছে, ঘোড়সওয়ারদের অস্পষ্টভাবে দেখা যায়।
প্রতিটি দেয়ালচিত্রের নিচের দিকে দীর্ঘদেহী এক যোদ্ধার মূর্তি দেখা যাচ্ছে। একটা দৃশ্যে সে তার ধনুক পুরোপুরি টেনে ধরেছে, আরেকটায় ব্রোঞ্জের তৈরি তলোয়ার ঘোরাচ্ছে। শত্রুরা মাথা নোয়াচ্ছে তার সামনে, সে তাদেরকে পায়ের নিচে পিষছে, কিংবা অনেকগুলো মাথা একহাতে ধরে অট্টহাসি হাসছে।
টর্চের আলো সেন্ট্রাল প্যানেলের উপর স্থির করলো নিকোলাস। কফিনের উপর দেয়ালটা কাভার করছে এ প্যানেল। এখানে দেবতুল্য সেই মূর্তি রথের উপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, তার এক হাতে ধনুক, অপর হাতে বল্লম। মাথায় পাগড়ি বা হেলমেট নেই, চুলগুলো তার পেছনে পতাকার মতো উড়ছে-সিংহের সোনালি কেশর যেন। চেহারায় আভিজাত্য ও গর্ব, দৃষ্টিতে অদম্য স্পর্ধা।
তার নিচে ধ্রুপদী মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক্সে লেখা কয়েকটা লাইন। গলা খাদে নামিয়ে অনুবাদ করলো রোয়েন :
মিশরের সাহসী সিংহ
এক হাজারের সেরা উপাধিপ্রাপ্ত
প্রশংসার স্বর্ণশেকলে ভূষিত
ফারাও-এর চিরকালীন বান্ধব
সমস্ত দেবতার সৈনিক
আপনি চিরজীবী হোন!
প্রবল আবেগে ফুঁপিয়ে উঠলো রোয়েন তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বিড়বিড় করে বলল, এই শিল্পীকে আমি চিনি। তার শিল্পকর্ম নিয়ে পাঁচ বছর গবেষণা করেছি। আমি যিশুর কসম খেয়ে বলতে পারি, এ দেয়ালচিত্র চার হাজার বছর আগে ক্রীতদাস টাইটার আঁকা। আর এ সমাধির ডিজাইনও তারই করা। হাত তুলে কফিন রাখা শেলফের খানিক উপরে আথরে খোদাই করা নামটা দেখালো। না, এটা কোনো খ্রিস্টান সেইন্টের কফিন নয়। কয়েক শো বছর আগে কোনো একজন প্রাচীন পুরোহিত হঠাৎ এটা দেখতে পান, নিজ ধর্মের নামে দখল করে নেন। কাঁপা কাঁপা নিঃশ্বাস ফেললল ও। ওদিকে তাকান! ওটা ট্যানাস-এর সীল-লর্ড হেরাব, সমগ্র মিশরীয় সেনাবাহিনীর সেনাপতি, রানী লসট্রিস-এর প্রেমিক, প্রিন্স মেমনন এর প্রকৃত পিতা, যিনি পরে ফারাও টামোস হয়েছিলেন।
অনেকক্ষণ পর নিস্তব্ধতা ভাঙল নিকোলাস, সবই তাহলে সত্যি। সপ্তম স্ক্রোলের সমস্ত রহস্যই দেখা যাচ্ছে এখানে। এখন শুধু চাবিটা পেলেই হয়।
হ্যাঁ, চাবি-টাইটার স্টোন টেস্টামেন্ট! ধীরে ধীরে ঘুরলো রোয়েন, চেহারায় শ্রদ্ধা আর ভয় ফুটে রয়েছে, এগুচ্ছে ট্যাবট স্টোনটার দিকে। তারপর হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো ও। নিকোলাস, আমার ভয় করছে। যা ভেবেছি ওটা হয়তো তা নয়। প্লিজ, আপনি দেখুন।
লম্বা কাঠামোটার সামনে এসে দাঁড়ালো নিকোলাস, কাপড়টা সরিয়ে নিল। ফ্যাকাসে লাল একটা এ্যানিট পিলার দেখতে পাচ্ছে ওরা, গায়ে বহুরঙা চিত্রবিচিত্র দৃশ্য খোদাই করা। পিলারটা প্রায় ছয়ফুট লম্বা, গোড়ার দিকে এক বর্গফুটের মতো হবে। ক্রমশ সরু হয়ে যাওয়ায় চ্যাপ্টা বা সমতল চূড়ার কাছে আধ বর্গমিটার। দাঁড়িয়েছে। এ্যানিট প্রথমে পালিশ করা হয়েছে, খোদাই করা হয়েছে পরে। এগিয়ে এসে ঠাণ্ডা পাথরটা ছুঁলো রোয়েন, হায়ারোগ্লিফিক্সের উপর হাত বুলাচ্ছে।
আমাদেরকে লেখা টাইটার চিঠি, ফিসফিস করলো ও। খোদাই করা লিপির ভিড় থেকে একটা প্রতীকচিহ্ন খুঁজে নিল-ডানাভাঙা একটা বাজপাখি। ওটা স্পর্শ করার সময় আঙুলগুলো কাঁপতে শুরু করলো। লেখা হয়েছে প্রায় চার হাজার বছর আগে। প্রতীক্ষায় আছে, এতো বছর পর আমরা পড়ব, অর্থ উদ্ধার করব। দেখুন কীভাবে সে সই করেছে। এ্যানিট পিলারটাকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে রোয়েন, পালা করে চার। দিকেই পরীক্ষা করছে হেসে উঠে মাথা ঝাঁকাচ্ছে, কখনো বা ভুরু কুঁচকে মাথা নাড়ছে, তারপর আবার হাসছে, যেনো একটা প্রেমপত্র পড়ছে ও।
পড়ে শোনান আমাকে, বলল নিকোলাস। ক্যারেক্টরগুলো বুঝতে পারি, তবে সেন্স বা মিনিং সহজে ধরতে পারি না। আপনি ব্যাখ্যা করুন।
নিখাদ টাইটা! হেসে উঠলো রোয়েন, উত্তেজনায় লালচে হয়ে উঠেছে চেহারা। বরাবরের মতো অস্পষ্ট ভাষায়, ধাঁধার সাহায্যে মেসেজ দিয়েছে এখানেও। এ সম্ভবত তার নিজস্ব কোনো কোড। একটা হায়ারোগ্লিফিক্স লাইনে আঙুল দিয়ে। প্রকাণ্ড ডানা মেলে শকুনরা উঠলো সূর্যকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য। ডেকে উঠে লেজের দিকে ঘুরে গেল শেয়ালরা। নদী বয়ে চলল জমিনের দিকে। পবিত্র স্থানের অমর্যাদাকারীরা সাবধান! সমস্ত দেবতার অভিশাপ নেমে আসবে তোমাদের উপর!
অর্থহীন প্রলাপ নয় তো? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস।
না, অর্থহীন নয়! টাইটা কখনো অর্থহীন কথা বলে না। নিজেকে সে দুর্লভ প্রতিভা বলে দাবি করে, কাজেই আমরা ধরে নিতে পারি একটু হয়তো ছিটগ্রস্ত। তাকে বুঝতে হলে তার চিন্তাধারা বুঝতে হবে। সে আমাদের জন্য কিছু ধাঁধা রেখে গেছে, অর্থ বের করতে কিছুটা সময় তো লাগবেই। সেজন্যই আমরা ক্যামেরা নিয়ে এসেছি। ছবি তোলার পর ওই পাথর থেকে ছাপ নিব আমরা। পরে যাতে স্টাডি করা যায়।
