পর্দার কাঁপন তখনো পুরোপুরি থামেনি, সবেমাত্র দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছে ওরা, কয়েক জোড়া পায়ের আওয়াজ ভেসে এলো কানে। পর্দা সামান্য ফাঁক করে বাইরে তাকালো নিকোলাস। সাদা আলখেল্লা পরা চারজন পুরোহিত গির্জার ভেতর দিক থেকে এগিয়ে আসছেন, আউটার চেম্বার পার হয়ে গেটের সামনে থামলেন, বাইরে বেরিয়ে গিয়ে বন্ধ করে দিলেন মেইন গেট।
আজ রাতে আর ওই গেট খোলা হবে না, ফিসফিস করলো নিকোলাস। ভেতরে আটকা পড়েছি আমরা।
কেউ আমাদেরকে বিরক্ত করবে না, জবাব দিল রোয়েন। চলুন, এখুনি কাজ শুরু করি।
পা টিপে টিপে পর্দার আড়াল থেকে বেরুল ওরা, আউটার চেম্বার পার হয়ে একটা দরজার দিকে এগুলো। রোয়েনকে নিয়ে মিডল চেম্বারে পা রাখলো নিকোলাস।
প্রথম চেম্বারের তুলনায় আকারে ছোট আর নিচু এটা। দেয়ালচিত্রগুলোয় সম্ভবত নিয়মিত রঙের প্রলেপ লাগানো হয়। মেঝে খালি, শুধু বাঁশ দিয়ে পিরামিড আকৃতির একটা কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, তাতে দাঁড়িয়ে আছে পিতলের তৈরি প্রদীপ, প্রতিটি প্রদীপে তেলের উপর ভাসছে সলতে। আলোর অন্য কোনো উৎস চোখে পড়লো না। সিলিং আর চেম্বারের কুলুঙ্গিগুলোয় অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে।
মেঝে পেরিয়ে আরেকটা দরজার দিকে এগুলো নিকোলাস, মাকডাসে ঢুকতে হলে এ তালামারা দরজা পেরুতে হবে ওদেরকে। টর্চ বের করে দরজাটা পরীক্ষা করলো ও। দুটো কবটেই সেইন্ট ফুমেনটিয়াসের প্রতিকৃতি খোদাই করা হয়েছে, মাথার চারধারে আলোর একটা বৃত্ত, ডান হাত আশীর্বাদ করার ভঙ্গিতে উপরে ভোলা।
তালাটা কয়েকশো বছরের পুরানো, ব্যাগ থেকে যন্ত্রপাতি বের করে খুলতে বিশ সেকেন্ডের বেশি লাগলো না। তালা খোলার পর একটা কবাটে কাঁধ ঠেকিয়ে চাপ দিল নিকোলাস। কজায় তেল দেওয়া হয় না, কাঁচকাঁচ করে প্রতিবা। জানালো। ভেতরে ঢোকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু ফাঁক হলো কবাট, ভেতরে ঢোকার পর সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিল।
মাকডাসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বোবা বিস্ময়ে চারদিকে তাকালো ওরা। হোলি অব হোলিজ খুব ছোট একটা চেম্বার, এতো ছোট হবে বলে ওরা ধারণা করে নি। দশ-বারো কদম ফেললে এক মাথা থেকে আরেক মাথায় পৌঁছনো যায়। গম্বুজ আকৃতির ছাদ এতো নিচু পায়ের আঙুলের উপর ভর দিয়ে হাত উঁচু করলে ছোঁয়া যাবে।
মেঝ থেকে ছাদ পর্যন্ত সারি সারি শেলফ, ভক্তদের দেওয়া উপহারসামগ্রী সাজানো রয়েছে-ট্রিনিটি ও ভার্জিন আইকন, বাইজেনটাইন স্টাইলে গড়া, অলংকৃত রূপোয় মোড়া। সেইন্ট আর সম্রাটদের খুদে মূর্তিও আছে। আর আছে পালিশ করা মেটাল দিয়ে তৈরি পাত্র, গহনার বাক্স, মেডেল, মালা, শাখা-প্রশাখাসহ মোমদানি– প্রতিটিতে মোমবাতি জ্বলছে।
মেঝের মাঝখানে সিডারউডের অলটার, প্যানেলে বিশ্ব সৃষ্টির ছবি খোদাই করা-স্বর্গ থেকে আদমের পতন থেকে শুরু করে শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত সবই দেখানো হয়েছে। সিল্কে মোড়া অলটার, ক্রসটা রূপোর তৈরি। প্রধান পুরোহিতের মুকুট মোমবাতির আলোয় চকচক করছে, টাইটার নীল সিরামিক সীল মুকুটটার ঠিক কপালের মাঝখানে।
নিঃশব্দে এগিয়ে এসে বেদীর সামনে হাঁটু গাড়ল রোয়েন। প্রার্থনার বসে মাথা নত করলো ও। অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকলো নিকোলাস, মোটেও বিরক্ত হচ্ছে না।
রোয়েনের প্রার্থনা শেষ হতে ওর পাশে চলে এলো নিকোলাস। ট্যাবট পাথর। ইঙ্গিতে বেদীর সামনেটা দেখালো। একসঙ্গে সেদিকে এগোলে ওরা। মাকডাসের পেছনে কাপড় মোড়া একটা কাঠামো দেখা যাচ্ছে। রূপো আর সোনার তৈরি সুতোয় এমব্রয়ডারি করায় কাপড়টা ভারী বলে মনে হলো। কাঠামোটা মানুষের মতোই লম্বা। ওটাকে ঘিরে ঘুরছে দু জন ছুঁতে ভয় পাচ্ছে-যদি প্রত্যাশা পূরণ না হয়! উত্তেজনা থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য উপাসনালয়ের পেছন দিকের দেয়ালে তাকালো নিকোলাস, ওদিকে বার লাগানো একটা গেট রয়েছে। সেইন্ট ফ্রমেনটিয়াসের সমাধি। বলে গ্রিলের দিকে এগুলো। ওর পাশে চলে এলো রোয়েন। কাঠের গায়ে চৌকো ফোকর, সেগুলোর একটা দিয়ে ভেতরে তাকালো। ভেতরটা অন্ধকার। ফোকরের ভেতর টর্চ ঢুকিয়ে বোতামে চাপ দিল নিকোলাস।
টর্চের আলোয় রঙধনুর সব কয়টা রঙ ওদের চোখ যেনো ধাধিয়ে দিল। আলোটা চোখে সয়ে আসতে চেঁচিয়ে উঠলো রোয়েন, ওহ, সুইট হেভেন! এমন কাঁপুনি শুরু হলো, যেনো প্রবল জ্বরে ভুগছে ও। মুখ থেকে সমস্ত রক্ত নেমে যাওয়ায় ফ্যাকাসে হয়ে গেল চেহারা।
সেলের মতো দেখতে সমাধি কক্ষে পেছনের দেয়ালে, একটা পাথুরে শেলফের উপর, সেট করা হয়েছে কফিনটা। কফিনের গায়ে একটা মানুষের প্রতিকৃতি আঁকা, ভেতরে শুয়ে থাকা মানুষটার আদলে। ছবিটা অস্পষ্ট হয়ে গেছে, অনেক জায়গাতেই রঙ নেই, তা সত্ত্বেও মানুষটার স্নান চেহারা, লালচে দাড়ি ইত্যাদি আলাদাভাবে চেনা যায়।
রোয়েনের বিস্ময় বোধ করার এটাই একমাত্র কারণ নয়। কফিন শেলফটার উপরে এবং দুপাশে তাকিয়ে আছে ও। ওখানে যেনো বিভিন্ন রঙের দাঙ্গা বেধে গেছে, দেয়ালের প্রতিটি ইঞ্চিতে সূক্ষ্ম ও দৃষ্টিনন্দন পেইন্টিং সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নেয়। ভাবতে আশ্বর্য লাগে, এতো কালো পরও পেইন্টিংগুলো অক্ষত ও অম্লান রয়েছে কীভাবে।
ওগুলোর উপর টর্চের আলো ঘোরাল নিকোলাস, যেনো পড়ে যাবার ভয়ে নিকোলাসের একটা বাহু আঁকড়ে ধরে থাকলো রোয়েন। ওর আঙুল নিকোলাসের মাংসে সেঁধিয়ে যাচ্ছে, অথচ নিকোলাস কোনো ব্যথা অনুভব করছে না।
