সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, নিকোলাস, বলল রোয়েন।
আমিও তাই বলি.. ফিসফিস করে বলে নিকোলাস। কথাটার উদ্দেশ্যে বুঝতে পেরে ধুপধাপ পা ফেলে ওর পাশ থেকে উঠে চলে গেল রোয়েন। রাগ করেছে ভীষণ।
*
ওদের জন্য দু জন তরুণ উপাসককে এসকর্ট হিসেবে পাঠিয়েছেন বিশপ, ভিড় সরিয়ে পথ তৈরি করবে তারা। কিন্তু দেখা গেল সিঁড়ির গোড়ায়। পৌঁছবার আগেই এসকর্ট দু জন সচল জনারণ্যে হারিয়ে গেল। কাছাকাছি থাকুন, বলে ইমার একটা বাহু খামচে ধরল নিকোলাস, কাঁধ দিয়ে ভিড় তো নয় যেনো পাহাড় ঠেলছে।
দীর্ঘ সংগ্রামের পর অবশেষে চাতাল দাঁড়িয়ে থাকা অনেকগুলো পাথুরে স্তম্ভের একটার গায়ে পিঠ ঠেকাতে পারলো ওরা। এখান থেকে ক্যাথেড্রালে ঢোকার পথটা পরিষ্কারই দেখা যায়। রোয়েন যথেষ্ট লম্বা নয়, সামনে জনসমুদ্র থাকায় প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, তাই ওকে সিঁড়ির নিচের ছোট একটা স্তম্ভের মাথায় তুলে দিল নিকোলাস। অবলম্বন হিসেবে নিকোলাসের একটা কাঁধ আঁকড়ে ধরল রোয়েন, কারণ ওর পেছনেই গভীর খাদ, নিচে বয়ে চলেছে নীলনদ।
উপাসকরা একঘেয়ে সুরে ভক্তিগীত গাইছে। বাদ্যযন্ত্রীদের বারোটা দল ড্রাম সহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে। প্রতিটি ব্যান্ডকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে ভক্তরা, তাদের পরনে বিচিত্র বাহারি আলখেল্লা, মাথার উপর বহুরঙা ছাতা।
প্রচণ্ড গরম আর উৎকট দুর্গন্ধের মতোই জনারণ্যে ছড়িয়ে পড়েছে বিপুল উত্তেজনা আর প্রত্যাশা। গান ও বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে উন্মাদনা ক্রমশ বাড়ছে; হাজার হাজার উপাসক, ভক্ত পূজারি, যেনো একটিমাত্র জ্যান্ত প্রাণীতে পরিণত হয়ে বিশেষ একটা ছন্দে দোল খাচ্ছে।
হঠাৎ করে ক্যাথড্রালের ভেতর থেকে পিতলের অনেকগুলো ঘণ্টা একযোগে। বাজতে শুরু করলো, পরমুহূর্তে সেই কান ঝালাপালা করা আওয়াজের সঙ্গে যোগ দিল কয়েক শো হর্ন আর ট্রামপিট বা ভেরী। সিঁড়ির মাথায় গোত্রপ্রধানদের দেহরক্ষীরাও বসে থাকলো না, অটোমেটিক রাইফেল থেকে ফাঁকা গুলিবর্ষণ শুরু করলো বিরতিহীন। মহিলারা শুরু করলো উলুধ্বনি, সে আওয়াজ যেমন রোমহর্ষক তেমনি রক্ত পানি করা। ধর্মীয় উন্মাদনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো পুরুষদের চেহারা। মেঝেতে হাঁটু গাড়ল তারা, আকুল আবেদন জানাবার ভঙ্গিতে মাথার উপর দু হাত তুলে ঈশ্বরের কৃপা ভিক্ষে চাইছে। মহিলারা তাদের শিশুসন্তানকে মাথার উপর তুলে ধরল, কৃঞ্চবর্ণ গাল বেয়ে অনর্গল নেমে আসছে চোখের পানি।
ভূগর্ভস্থ চার্চ থেকে গেট হয়ে বেরিয়ে এলো পুরোহিত আর সন্ন্যাসীদের একটা বিশাল মিছিল। প্রথমে এলো সাদা আলখেল্লা পরা ভক্তরা, তাদের পিছু নিয়ে এলো তরুণ উপাসকদের দল, আজ নদীর কিনারায় তারা ব্যাপ্টাইজড হবে। তামেরকে চিনতে পারলো রোয়েন, আশপাশের কিশোরদের চেয়ে যথেষ্ট লম্বা সে, চোখাচোখি হতে লজ্জা পেয়ে হাসলো।
ইতোমধ্যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। কড়াই আকৃতির জায়গাটা ছায়ার ভেতর অস্পষ্ট দেখাচ্ছে, মাথার উপর ঝুলে আছে দু একটা রূপালি তারা নিয়ে রক্তবর্ণ শামিয়ানার মতো সরু আকাশ।
তরল লাভা স্রোতের মতো মশার মিছিল কুণ্ডলি ছড়াতে শুরু করলো পাহাড় প্রাচীরের গা থেকে, পুরোহিতরা সুর করে গান করছেন, ড্রামের গুরুগম্ভীর আওয়াজ পাহাড়ে লেগে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ব্যাপ্টিজম প্রার্থীদের পিছু নিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত পুরোহিতরা, তাঁদের আলখেল্লায় পিতলের তৈরি রূপালি ক্রস সঁটা, মাথায় জড়ানো সিল্ক পট্টি, অনেকেই ব্যানার বহন করছেন। তাঁদের পেছনে দু জন পুরোহিতকে দেখা গেল, ট্যাবট বহন করছেন। পুরোহিত দু জন অস্বাভাবিক লম্বা, মাথায় রত্নখচিত পাগড়ি, পরনে বহুরঙা আলখেল্লা। আর্ক অভ ট্যাবারন্যাকল বা চন্দ্রাতাপ আবৃত আসন লাল কাপড়ে মোড়া, সেটা জমিনে লুটিয়ে পড়েছে। কাপড়ে মোড়ার কারণ অপবিত্র বা পাপীরা যাতে চামড়ায় চোখে ওটাকে সরাসরি দেখার সুযোগ না পায়।
মিছিলের শেষ দিকে যোগ দিলেন জালি হোরা। আজ তিনি নীল পাথর লাগানো মুকুটটা পরেন নি। পরেছেন ইপিফানি ক্রাউন। চকচকে ধাতু-খণ্ড আর বহুমূল্য পাথর দিয়ে সাজানো। মুকুটটা এতো ভারী, প্রধান পুরোহিতের প্রাচীন ঘাড় ওটার ভারে নুয়ে পড়েছে। দু জন তরুণ ভক্ত তার কনুই ধরে গাইড করছে। অনিশ্চিত পা ফেC সিঁড়ি বেয়ে নামছেন তিনি। এ সিঁড়িপথই নীল নদীর দিকে নেমে গেছে।
মিছিল এগুচ্ছে, সেই সঙ্গে সিঁড়ির মাথায় বসে থাকা লোকজন সোজা হলো নিচে নামার জন্য। চাতাল খালি হয়ে আসছে দেখে রোয়েনকে স্তম্ভের উপর থেকে নামিয়ে মিছিলে যোগ দিল নিকোলাস, জায়গাটা একেবারে ফাঁকা হয়ে যাবার আগেই গির্জার ভেতর ঢুকে পড়তে হবে ওদেরকে। জনস্রোত সামনে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, তারই মধ্যে একপাশে সরে আসছে ওরা, উদ্দেশ্য গির্জার প্রবেশমুখে পৌঁছনো। সামনে বোরিস আর টিসেকে দেখতে পেল ওরা, তবে তারা ওদেরকে দেখতে পায় নি।
গির্জার আউটার চেম্বারে ঢোকার গেটে এসে মাথা নিচু করলো নিকোলাস, ভেতরে ঢুকে আবছা অন্ধকারে কাউকে দেখতে পেল না। ভেতরের গেটগুলোয় কোনো প্রহরী নেই দেখে সাইড ওয়াল ঘেঁষে এগুলো ও, এক হাতে রোয়েনের কব্জি ধরে আছে, অপর হাতে ব্যাগটা। সামনেই ঝুলছে মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত লম্বা পর্দা। ভারী পর্দা তুলে ভেতরে গা ঢাকা দিল ওরা।
