*
সন্ধ্যার অন্ধকারে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ক্যাম্পে পৌঁছল ওরা। দু জন স্কিনার, কিফ আর সালিন, খেতে বসেছে। ওদের খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম নিল নিকোলাস, তারপর গোসল সেরে কাপড়চোপড় পাল্টাল, ক্যানভাস রোল থেকে ছুরি বের করে চলে এলো স্কিনিং শেডে। ইতোমধ্যে ওখানে একটা গ্যাস লণ্ঠন জ্বালা হয়েছে। স্কিনাররা দাঁড়িয়ে থাকলো, নিকোলাস নিজেই ডিক ডিকের ছাল ছাড়াচ্ছে।
ভাবছি বাঁচলেন কীভাবে! দরজায় উদয় হলো বোরিস। নিকোলাস জবাব দিল না, একমনে কাজ করছে। এ আপনার ডোরাকাটা ডিক-ডিক? হঁদুর বললেই হয়! তবু নিকোলাস তাকাচ্ছে না। ইঁদুর শিকার শেষ হলো, এবার আমরা তাহলে আদ্দিস আবাবায় ফিরে যেতে পারি, কী বলেন? জানতে চাইলো সে।
নিকোলাস তাকে মনে করিয়ে দিল, এটা ওর সাফারি, আর চুক্তি করা হয়েছে তিন সপ্তাহের জন্য। ঘোঁৎ করে একটা আওয়াজ ছেড়ে দরজার সামনে থেকে সরে গেল বোরিস।
কাজটা প্রায় শেষ করে এনেছে নিকোলাস, দরজায় আরেকজনকে দেখা গেল। পরে আছে. পুরোহিতদের ঢোলা আলখেল্লা, মাথায় পাগড়ি, কথা বলা আগে তাকে . নিকোলাস চিনতে পারলো না। মঠে ওরা বলাবলি করছে, তুমি নাকি মনের গেছ, দোস্ত। যদিও বিশ্বাস করি নি, তবু নিশ্চিত হতে এলাম, বলে হাসলো কমান্ডার মেক।
মুখ তুলে হাসলো নিকোলাস। ভেতরে এসো।
ভেতরে ঢুকে নিকোলাসের পাশে বেঞ্চের উপর বসে পড়লো মেক। বোরিস সিলভকে কতদিন থেকে চেনো তুমি?
প্লেন থেকে নামার পর, জবাব দিল নিকোলাস। এক বন্ধু ওর নাম সুপারিশ করে।
তোমার বন্ধু ভুল করেছে, বলল মেক। তোমাকে আমার সাবধান করা উচিত, দোস্ত। কেন সাবধান করা উচিত ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করলো সে। বছর দশেক আগে মেনজিসটুর গুণ্ডাপাণ্ডারা তাকে বন্দি করে আদ্দিসের কাছাকাছি কার্ল মার্ক্স কারাগারে রেখেছিল। ওখানে ইন্টারোগেটরদের একজন ছিল বোরিস। তখন কেজিবি-তে ছিল সে। কথা আদায় করার জন্য বন্দি বা বন্দিনীর পায়ুপথে প্রেশার হোস ঢুকিয়ে ট্যাপ ছেড়ে দিত। বন্দিরা ফুলতে থাকত, যতক্ষণ না তাদের নাড়িভূড়ি বিস্ফোরিত হয়। মেক পালিয়ে আসায় সে-যাত্ৰা বোরিসের হাত থেকে বেঁচে যায়। মেনজিসটু ক্ষমতা হারাবার পর কেজিবি থেকে অবসর নেয় বোরিস, সাফারি গাইড হিসেবে কাজ শুরু করে।
প্রসঙ্গ বদলে মেক জানালো, দিনকাল খুব অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিনা নোটিশে এ এলাকা ছাড়তে হতে পারে তাকে। আদ্দিসে এক ভদ্রলোক আছেন, নাম কর্নেল মরিয়ম কাদের, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন, তাঁকে নিকোলাস মেসেজ দিলে মেক পেয়ে যাবে। কোডনেম সোয়লো বললে মেককে চিনবেন তিনি।
বিদায়ের সময় আগের প্রসঙ্গে আবার ফিরে এলো মেক। তোমাকে জানিয়ে রাখি, বোরিসকে আমার খুন করতে হতে পারে।
বেশ কিছুসময় কেউ কোনো কথা বলল না। এরপর মেক নিমুর বলে, জীবন খুব অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে আজকাল, নিকোলাস। কখন যে কোথায় চলে যেতে হয়। কাজেই, আগে ভাগে বিদায় বলে নিচ্ছি। আদ্দিসে একজন লোক আছে আমার কখনো কিছু দরকার হলে তার কাছে খবর পাঠিও। কর্নেল মরিয়াম কাদের তার নাম প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে আছেন। আমার জানের দোস্ত। আমার কোড হলো সোয়ালো। ওটা উচ্চারণ করলে ও তোমাকে চিনে নেবে।
এরপর আলিঙ্গন করে বিদায় নিল মেক নিমুর।
*
পরদিন সকালে ব্যথায় আড়ষ্ট শরীর নিয়ে স্কিনিং শেডে চলে এলো নিকোলাস। ছাড়ানো চামড়াটা পরীক্ষা করলো, নতুন করে লবণ মাখালো, তারপর কিফ আর সালিনকে নির্দেশ দিল ডিক-ডিকের খুলি পিঁপড়ের ঢিবিতে পুঁতে ফেলতে হবে, পিঁপড়েগুলো যাতে অবশিষ্ট মাংস খেয়ে ওটাকে পরিচ্ছন্ন করে তোলে।
ওখান থেকে ডাইনিং কুঁড়েতে চলে এলো নিকোলাস, ব্রেকফাস্ট সেরে রোয়েনকে নিয়ে বের হল মাছ ধরতে। ঝুলন্ত ব্রিজের কাছাকাছি ছিপ ফেললো ওরা। ব্রিজের উপর ফেকাসে লাল পাথরের খিলানটার দিকে হাত তুলে রোয়েনকে বলল, আপনাকে আসলে বোরিসের সামনে থেকে সরিয়ে আনার জন্য মাছ ধরতে। চেয়েছি। কাল ওদিকে কী দেখে এসেছি শুনুন।
নিকোলাসের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলো রোয়েন। ও থামতে জানতে চাইলো, ফোকরগুলো কী হতে পারে বলে আপনার ধারণা?
কি হতে পারে বুঝতে পারছি না। তবে বহু বছরের পুরানো ওগুলো।
রাজমিস্ত্রীদের জন্য মাচা বা ভারা তৈরি করতে হলে এ ধরনের ফোকর দরকার হতে পারে, বলল রোয়েন।
আপনার বুদ্ধির তারিফ করতে হয়! ব্যঙ্গ নয়, নিকোলাসের চোখে প্রশংসা।
দু একটা আইডিয়া আপনিও দিন।
ধর্মীয় কোনো প্রতীক? কোনো সংকেত? রোয়েনের চেহারায় সন্দেহ দেখতে পেয়ে আবার বলল নিকোলাস, মানলাম, গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না।
একটা ঘাস ছিঁড়ে ডগাটা দাঁত দিয়ে কামড়ালো রোয়েন। ধরুন ফোকরগুলো কাটা হয় মাচা তৈরির জন্য। নদীর পাশে, পাহাড়ের গায়ে, মাচা কেন দরকার হবে?
মাছ ধরার জন্য।
কিন্তু এ নদীতে মাছ খুব বেশি নেই, বলল রোয়েন। আর কিছু দেখেছেন?
দু সারি কুলুঙ্গির মাঝখানে গোল একটা আকৃতি। পাথর খোদাই করে তৈরি।
শিরদাঁড়া খাড়া করলো রোয়েন। লিপি, নাকি নকশা?
মাথা নাড়লো নিকোলাস। আলো কম, অত উঁচুতে পরিষ্কার কিছু দেখা যায় না, বলল ও। কাল তিমকাত উৎসব, মাগডাস-এ ঢোকার একমাত্র সুযোগ। এ কাজটা শেষ করার পর খাদে নেমে আরেকবার দেখতে হবে এগুলো।
