দু সারি গাঢ় দাগ, পাথুরে পাঁচিল ধরে পানির সারফেস থেকে উপর দিকে উঠে গেছে, একেবারে সেই দুশো ফুট উপরের কিনারা পর্যন্ত। ঝোঁপের ডালপালা ছেড়ে দিয়ে সাবধানে ও ধীরগতিতে পানি কেটে এগুলো নিকোলাস, পৌঁছল যেখানে দাগগুলো পানির নাগাল পেয়েছে। কাছে এসে বুঝতে পারল, এগুলো দাগ নয়, পাথর কেটে তৈরি করা প্রতিটি চার বর্গইঞ্চি কুলুঙ্গি বা ফোকর। সারি দুটোর মাঝখানে বারো ফুটের মতো ব্যবধান, তবে প্রতি সারির কুলুঙ্গি অপর সারির কুলুঙ্গির সঙ্গে একই সরল রেখার উপর তৈরি। একটার ভেতর হাত গলালো নিকোলাস, কনুই পর্যন্ত ঢোকানো যায়। ওয়াটার মার্কের নিচের ফোকরগুলো ক্ষয়ে গেছে, ফলে হাতের ছোঁয়ায় মসৃণ লাগলো কিনারাগুলো। তবে পাঁচিলের উপর দিকে, ওয়াটার মার্ক ছাড়িয়ে, আকৃতিগুলো স্পষ্ট, পুরোপুরি চৌকো আর ধারালো।
একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন ভিড় করলো মাথায়। কতদিনের পুরনো ওগুলো? পাথর কাটার জন্য এখানে কাউকে নামতে হয়েছে, কীভাবে নামলো? এতো কষ্ট করে এগুলো তৈরি করার কারণই বা কী? নিচে এখানে কী আছে?
তারপর হঠাৎ নিকোলাসের চোখে আরো একটা জিনিস ধরা পড়লো। পাথরে বৃত্তাকার একটা খাঁজ, দুই সারি কুলুঙ্গির ঠিক মাঝখানে, বর্ষা বা বন্যার পর থেকে যাওয়া জলচিহ্নের অনেকটা ওপরে। নিচে থেকে সম্পূর্ণ গোল দেখাচ্ছে, প্রাকৃতিক নয় এমন আরো একটা আকৃতি।
সাঁতার দিয়ে বার কয়েক জায়গা বদল করলো নিকোলাস, বিভিন্ন কোণ থেকে জিনিসটাকে দেখছে। পাথর খোদাই করে তৈরি বলে মনে হলো, তবে আলো খুব কম থাকায় মানুষের হাতের কাজ কিনা নিশ্চিত হতে পারলো না। ডিজাইনটার মধ্যে ছবি বা সংকেত যদি থাকেও, এখান থেকে দেখার উপায় নেই। কুলুঙ্গিতে পা রেখে খানিকটা ওঠার চেষ্টা করলো নিকোলাস, কিন্তু পারলো না। একটার সঙ্গে আরেকটার দূরত্ব এতো বেশি যে একটয় পা রাখার পর হাত দিয়ে দ্বিতীয়টার নাগাল পাওয়া কঠিন। চেষ্টা করতে গিয়ে প্রতিবার নদীতে পড়ে গেল ও।
নদীর পানি বরফের মতো ঠাণ্ডা, নিকোলাসের দাঁত পরস্পরের সঙ্গে বাড়ি খাচ্ছে। তীব্র স্রোতের টানে সরু নির্গমন পথের দিকে এগুচ্ছে, ওই পথ ধরে জননী নীলনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য সমস্ত ব্যাকুলতা নিয়ে ছুটে চলেছে ডানডেরা।
নদীর তলা এখানে সাংঘাতিক ঢালু, পানির গতি ক্রমশ বাড়ছে। একের পর এক তীব্র আলোড়নের মধ্যে পড়লো নিকোলাস, নদী যেনো এখানে সিঁড়ির ধাপ বেয়ে নিচে নেমেছে। তারপর এক সময় খানিকটা শান্ত হলো পানি, চিৎ সাঁতার দিচ্ছে নিকোলাস। বিশ্রাম নেওয়ার এ সুযোগ ছাড়া যায় না, তাকিয়ে আছে উপরে।
উপরে আলো খুব কম। কারণ, মাথার উপর পাথরের পাঁচিল প্রায় এক হয়ে মিশে আছে। বাতাসে ভ্যাপসা গন্ধ, ডানা ঝাঁপটাচ্ছে অসংখ্য বাদুড়। তবে চারদিকটা ভালো করে দেখার সুযোগ পাওয়া গেল না, সামনে থেকে আবার নদীর গর্জন ভেসে আসছে। ঢাল বেয়ে নিচের দিকে ছুটে চলেছে ডানডেরা, খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নিকোলাসকে। খানিক পর দিশেহারা করে তুললো ওকে, কত দূর বয়ে নিয়ে এলো হিসাব নেই, হিসাব নেই সব মিলিয়ে মোট কয়টা জলপ্রপাত পার হলো।
অকস্মাৎ উজ্জ্বল আলোয় ভেসে গেল চারদিক। অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসায় মনে হলো কেউ যেনো সরাসরি ওর চোখে সার্চলাইট তাক করেছে। রোদ লাগায় চোখ কোঁচকাল নিকোলাস, তারপর পেছন দিকে তাকিয়ে দেখলো ফ্যাকাসে লাল পাথরের খিলানের নিচ দিয়ে ভেসে এসেছে ও। পাহাড়ের এ অংশটুকু ওর চেনা, রোয়েনের সঙ্গে দেখে গেছে। ওর সামনে রয়েছে রশি দিয়ে তৈরি ঝুলন্ত ব্রিজ। ক্লান্ত শরীরটা কোনো রকমে ছোট্ট সৈকতের সাদা বালির দিকে তাকালো। ক্রল করে এগুবে, সে শক্তিও অবশিষ্ট নেই। বমি করলো নিকোলাস, শরীরের অর্ধেকটা এখনো নদীতে।
অন্তত বেঁচে আছি, বলে জ্ঞান হারালো নিক।
*
কাঁধে ধাক্কা খেয়ে ঘুম ভাঙল নিকোলাসের। সুন্দরী মেম সাহেব আপনার নাম ধরে ছুটোছুটি করছেন আর কাঁদছেন! জেগে উঠুন, সাহেব, উঠুন! চোখ মেলে তাকালো নিকোলাস, তামেরকে দেখে বালির উপর উঠে বসলো। একই সঙ্গে কেউ হাসতে ও কাঁদতে পারে, তামেরকে না দেখলে বিশ্বাস করতো না ও। বেঁচে আছে মনে পড়ে যাওয়ায় স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করলো, দ্রুত পরীক্ষা করে দেখে নিল হাড়গোড় সব ঠিক আছে কিনা। সন্তুষ্ট হয়ে চোখ তুললো, দেখলো পাহাড়ের ঠোঁটের কাছে মোটাসোটা আর লাল দেখাচ্ছে সূর্যটাকে। তার মানে সময়টা শেষ বিকেল।
উঁচু পাড় বেয়ে ওঠার পর সরু পথ পাওয়া গেল, ঝুলন্ত ব্রিজ পেরিয়ে নদীর ওপারে পৌঁছল ওরা। ছুটে আসছিল রোয়েন, উল্লাসে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে জড়িয়ে ধরলো নিকোলাসকে। বেঁচে আছেন! আপনি বেঁচে আছেন! হাসছে বটে, তবে চোখে জল।
আমাকে চেনেন না? দশ ফুট লম্বা, বুলেটপ্রুফ। তবে সত্যি কথা বলতে কী, বেঁচে আছি শুধু আপনার এ আলিঙ্গনের লোভে।
তাড়াতাড়ি নিকোলাসকে ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল রোয়েন। অন্য কোনো অর্থ করবেন না আবার!
রোয়েনের কাছ থেকে জানা গেল, ভাটির দিকে নিকোলাসের লাশ খুঁজছে বোরিস আর তার ট্র্যাকারেরা। আর নিকোলাসের ডিক-ডিকটাকে ক্যাম্পে নিয়ে গেছে স্কিনাররা।
ছাল ছাড়াবার সময় ওখানে আমার থাকা দরকার! বলল নিকোলাস, তামেরের কাঁধে হাত রেখে ছুটলো। দেখা যাক সময়মতো পৌঁছতে পারি কি না!
