বুঝব না কেন।
ওদের দু জনকে নিরিবিলিতে কথা বলার সুযোগ করে দিই, বলল রোয়েন। তবে তার আগে ওদের সঙ্গে তিমকাত উৎসব সম্পর্কে আলাপ হয় আমার। উৎসবের পঞ্চম দিনে প্রধান পুরোহিত টাবট নিয়ে অ্যাবেতে নামেন। মেক আমাকে বললেন, পাহাড়-প্রাচীরের গা বেয়ে পানির কিনারা পর্যন্ত নামার একটা পথ আছে।
হ্যাঁ, জানি আমরা।
যেটা আপনি জানেন না-নদীতে নামার মিছিলে সবাই থাকে। সবাই মানে, সব্বাই। প্রধান পুরোহিত, সব কয় জন পুরোহিত, শিক্ষানবিস উপাসকরা, প্রতিটি সত্যিকার বিশ্বাসী, এমন কি মেক আর তার লোকজনও। শুধু যে নদীতে নামে তাই নয়, রাতটা ওরা ওখানে কাটায়। সারাটা দিন ও রাত মঠ একদম খালি পড়ে থাকে।
হাসি ফুটল নিকোলাসের মুখে। ইন্টারেস্টিং তো!
ভুলবেন না, আমিও আপনার সঙ্গে যাচ্ছি, হিসহিস করে বলল রোয়েন। ভুলেও আমাকে ফেলে যাবার কথা ভাববেন না!
*
সেদিনের রাতের খাবারের পর রোয়েনের তাঁবুতে গেল নিকোলাস। ওখানে ছাড়া আর কোথাও একা কথা বলার উপায় নেই। এবারে, অবশ্য রোয়েনের বিছানায় বসার মতো বোকামি করলো না সে। রোয়েন বসলো একপ্রান্তে, নিকোলাস একটা মোড়ায় ওর দিকে মুখ করে।
যে কোনো রকম পরিকল্পনা করার আগে একটা বিষয়ে বলে নিতে চাই। আপনি জানেন, ধরা পরলে কী ঘটবে?
মানে সন্ন্যাসীরা যদি হাত নাতে ধরে ফেলে? রোয়েন জানতে চায়।
সবচেয়ে কম কিছু করলেও এ উপত্যকা থেকে আমাদের বের করে দেবে ওরা। প্রধান পুরোহিতের দারুণ ক্ষমতা। আর খারাপ কিছু হলে ধরে পেটাবে আর কি। নিকোলাস বলে চলে, তাদের ধর্মে এটা সবচেয়ে পবিত্র স্থান; ব্যাপারটা হালকা করে দেখবেন না। বিপদের পরিমাণ কম নয়। এমনও হতে পারে ছুরি খেলাম, না হয় খাবারে বিষ দিয়ে মারলো।
আমরা টিসেকেও হারাবো। সে তো ধার্মিক মেয়ে, রোয়েন বলে।
আর মেক নিমুর তো খেপে যাবেই। মনে হয় না এর পরে আমাদের বন্ধুত্ব আর টিকে থাকবে।
চুপচাপ বসে রইলো ওরা দু জন। শেষমেষ নিকোলাস নীরবতা ভাঙে।
তো, বুঝলেন তো কি অবস্থা। আপনি একনিষ্ঠ খ্রিস্টান- আপনাদের গির্জাতেই তো আমরা চুরি করে ঢুকছি। এ বিষয়ে কী বলেন?
আমি ভেবেছি এ নিয়ে, রোয়েন স্বীকার করে। তবে এটা ঠিক আমার চার্চ নয়। কপটিক খ্রিস্টানদের।
মানে শুধু বিভেদ।
মিশরীয় কোনো চার্চে এমনকি সবচেয়ে পবিত্র স্থানেও কারোর ঢুকতে বাধা নেই। কাজেই, প্রধান পুরোহিতের নিষেধাজ্ঞা আমি কেয়ার করি না। একজন একনিষ্ঠ খ্রিস্টান হিসেবে গির্জার যে কোথাও যাবার অধিকার আমার আছে বৈকি।
মৃদু শিষ দিয়ে ওঠে নিকোলাস। আপনিই না বলেছিলেন, আমার ল ইয়ার হওয়া উচিত!
দেখুন, এসব নিয়ে তামাশা করবেন না। একটাই কথা- ওখানে আমাকে যেতেই হবে। এমনকি, টিসে, মেক কিংবা পুরোহিত রুষ্ট হোক- কিছু যায় আসে না।
এমনও হতে পারে, আপনার হয়ে আমি করলাম কাজটা। নিকোলাস পরামর্শ দেয়। আমি হলাম গিয়ে পাপী বান্দা। কাজেই আমার পরিত্রাণের কোনো ব্যাপার তো নেই।
না, সজোরে মাথা নাড়ে রোয়েন। কোনো ধরনের খোদাই করা বাণী থাকতে পারে- আমাকে তা দেখতেই হবে! আপনি ভালো হায়ারোগ্লিফিক পারেন না। আপনি অ্যামেচার, আমি প্রফেশন্যাল। আমাকে ওখানে থাকতেই হবে।
ঠিক আছে। তাহলে আপনি যাবেন। আত্মসমর্পণের সুরে বলে নিকোলাস। এবারে পরিকল্পনার পালা। কিছু জিনিস লাগবে আমাদের ফ্ল্যাশলাইট, ছুরি, পোলারয়েড ক্যামেরা, বাড়তি ফিল্ম
আর্ট পেপার, আর নরম পেন্সিল- ছাপ নেওয়ার জন্য, রোয়েন যোগ করে।
ওহ্ হো! ওগুলো তো আনি নি!
দেখলেন তো- আপনি অ্যামেচার!
গভীর রাত পর্যন্ত আলাপ করে চললো ওরা। শেষমেষ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালো নিক।
অনেক রাত হয়েছে। ঘুম আসছে আমার। শুভরাত্রি।
এখনো দু দিন বাকি উৎসবের। এ সময়ে কী করার প্ল্যান আপনার?
আগামীকাল আবারো সেই অ্যান্টিলোপ ডিক-ডিকের পেছনে ছুটছি আমি, নিক বলে।
আমিও আসছি আপনার সাথে, দৃঢ়তা নিয়ে বলে রোয়েন, এ বিষয়ে আর আপত্তির কোনো সুযোগ নেই।
শুধু যদি তামেরকে রেখে আসেন, তবেই, বলে, তবু ছেড়ে বেরিয়ে এলো নিকোলাস।
*
ঘন কাঁটাঝোঁপের গাঢ় ছায়া থেকে খুদে হরিণটা বেরিয়ে আসতেই সকালের নরম রোদ লেগে রোমগুলো মসৃণ সিল্কের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সরু ফাঁকা জায়গাটা ধরে দ্বিধাহীন হেঁটে আসছে।
রাইফেলের ট্রিগারে আঙুল রেখে তৈরি নিকোলাস। রিগবিতে মেটাল জ্যাকেট বুলেট ভরেছে, লাগলে ক্ষতটা চওড়া হবে না, বের হওয়ার সময় বড় গর্ত তৈরি করবে না।
ফাঁকা জায়গাটার পাশের কয়েকটা ঝোঁপের দিকে এগিয়ে এলো ডোরাকাটা ডিক-ডিক। নিচু একটা ঝোঁপের উপরের কুচি পাতা ছিঁড়ছে দাঁত দিয়ে। নিস্তব্ধ সকালে বিকট আওয়াজ করলো রাইফেল। ঝোঁপ থেকে শূন্যে লাফ দিল খুদে হরিণ, মাটিতে পড়ার আগেই ছোটার ভঙ্গিতে দ্রুতগতিতে পা ছুঁড়ছে। সলিড বুলেট এতো জোরে আঘাত করে নি যে ছিটকে পড়ে যাবে ডিক-ডিক। হৃৎপিণ্ডে বুলেট নিয়ে ছুটলো ওটা। মারা গেছে এরই মধ্যে, ছুটছে রিফ্লেক্সের বশে, রক্তস্রোতে অবশিষ্ট অক্সিজেনের জোরে।
সর্বনাশ! না, ওদিকে না! লাফ দিল নিকোলাস। খুদে প্রাণীটি সোজা খাদের কিনারা লক্ষ্য করে ছুটছে। অন্ধের মতো শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়লো, পতনের সময় ডিগবাজি খেলো, অদৃশ্য হয়ে গেল ওদের দৃষ্টিপথ থেকে, নেমে যাচ্ছে প্রায় দুশো ফুট গভীর ডানডেরা নদীর গহ্বরে। ছুটে এসে কিনারায় দাঁড়ালো নিকোলাস, পিছু নিয়ে এলো রোয়েনও।
