হাত দিয়ে রোয়েনই দেখালো, ওই যে, ওই যে, দেখতে পাচ্ছি।
ডিক-ডিক সরাসরি ওদের নিচে পড়ে রয়েছে। করুণ চোখে তাকিয়ে থাকলো নিকোলাস। তবে এক সেকেন্ড পরই ওর চেহারায় জেদ ফুটে উঠলো। মারতে যখন পেরেছি, তুলে আনতেও পারব। চলুন, আপাতত আমরা ক্যাম্পে ফিরে যাই।
*
বিকেলে আবার ফিরে এলো ওরা, সঙ্গে বোরিস, দু জন ট্র্যাকার ও দু জন স্কিনার। সঙ্গে করে ওরা নাইলনের চারটে কয়েল নিয়ে এলো। প্রথমইে খাদের কিনারা থেকে উঁকি দিয়ে ডিক-ডিককে দেখে নিল নিকোলাস, ভয় হচ্ছিল স্রোতের সঙ্গে ভেসে গেল কিনা। তারপর কয়েলের রশি ফাঁকা জায়গাটায় লম্বা করে ফেলে সাজাবার কাজে সাহায্য করলো ট্র্যাকারদের। দুটো কয়েলের রশি জোড়া লাগিয়ে গিটটা খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করলো নিকোলাস। খাদের নিচে রশি ফেলা হলো, প্রান্তটা পানির সারফেস ছুঁতে তুলে আনা হলো আবার।
একশো আশি ফুট, মাপ শেষ করে বলল ও। ত্রিশ ফ্যাদম। বোরিসের দিকে তাকালো। রশি বেয়ে এতোটা উপরে ওঠা সম্ভব নয়, আপনারা আমাকে টেনে তুলবেন।
মোটা একটা কাঁটাগাছে বাঁধা হয়েছে রশিটা। পরনে শুধু শার্ট আর খাকি শর্টস। খাদের ঠোঁটে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে হেলান দিল নিকোলাস, রশিটা কাঁধের উপর দিয়ে ঝুলে আছে, লেহের অংশটুকু ফিরিয়ে আনা হয়েছে দু পায়ের মাঝখানে। পেছন ফিরে গহ্বরে লাফ দিল, পতন নিয়ন্ত্রণ করছে কাঁধের উপর দিয়ে রশি ছেড়ে, ব্রেক করার প্রয়োজন হলে উরুতে পেঁচিয়ে নিচ্ছে। পেন্ডুলামের মতো দোল খাচ্ছে নিকোলাস, দু পায়ের সাহায্যে পাথুরে পাঁচিল থেকে দূরে রাখছে। নিজেকে। দ্রুত নেমে এলো নিচে, পা দুটো ডুবে গেল তীব্র স্রোতে, রশির মাথার লাটিমের মতো ঘুরছে শরীরটা। যে পাথরটার উপর পড়ে আছে ডিক-ডিক, সেটার কাছ থেকে কয়েক ফুট দূরে রয়েছে ও কাজেই পানিতে নামতে বাধ্য হলো। রশির শেষ প্রান্ত দাঁত দিয়ে ধরে থাকলো, দূরত্বটুকু পেরিয়ে এলো সতরে।
খুদে পাথুরে দ্বীপটায় উঠে এসে খানিক দম নিল নিকোলাস। তারপর ডিক ডিকের চার পা এক করে বাঁধলো। পিছিয়ে এসে মুখ তুলে তাকালো উপরে। গহ্বরের মাথা থেকে উঁকি দিয়ে ওকে দেখছে বোরিস। টানুন! চিৎকার করলো নিকোলাস, রশিটা তিনবার ঝাঁকালো। টান টান হলো নাইলন, ঝাঁকি খেয়ে দ্বীপটা থেকে শূন্যে উঠে পড়লো ডিক-ডিক, গহ্বরের পাঁচিল ঘেঁষে দ্রুত উঠে যাচ্ছে ওপরে। তিন ভাগের দুই ভাগ উঠে গেছে, এ সময় কোথাও আটকাল রশিটা, তবে একটু পর নিজেই মুক্ত হলো, সাপের মতো এঁকেবেঁকে খাদের কিনারায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
বেশ খানিক পর নিচে নেমে এলো রশিটা, বুদ্ধি করে বড় তরমুজ আকৃতির একটা পাথর বেঁধে দিয়েছে বোরিস। খাদের কিনারা থেকে নিচে তাকিয়ে রশির নামাটা দেখছে সে, ইঙ্গিতে নির্দেশ দিচ্ছে নিজের লোকজনকে। রশিটা ধরে একটা লুপ তৈরি করলো নিকোলাস, বগলের তলায় ঢুকিয়ে নিল সেটা, মুখ তুলে ইঙ্গিত দিল বোরিসকে। টান টান হলো রশি, পাথরের উপর থেকে শূন্যে উঠে পড়লো ওর পা। ঝাঁকি খেতে খেতে উঠে যাচ্ছে উপরে। খাদের কিনারা থেকে পঞ্চাশ ফুট নিচে পৌচেছে, হঠাৎ স্থির হয়ে গেল রশি। পাথরের গায়ে অসহায়ভাবে ঝুলছে ও। কি ঘটেছে? বোরিসকে জিজ্ঞেস করলো।
শালার রশি কোথাও আটকে গেছে, পাল্টা চিকা রকরলো বোরিস। কোথায় আটকেছে, আপনি দেখতে পাচ্ছেন?
নিকোলাসের দৃষ্টি রশি অনুসরণ করলো। সরু ও লম্বা একটা ঠাটলে ঢুকেছে রশিটা, সম্ভবত ডিক-ডিককে তোলার সময়ও এটাতেই আটকে ছিল। তবে ডিক ডিকের তুলনায় নিকোলাসের ওজন বহুগুণ বেশি, ফলে ফানেলের ভেতর রশিটা অনেক বেশি সেঁধিয়ে গেছে। শূন্যে ঝুলে রয়েছে ও, প্রায় একশো ফুট নিচে নদী আর পাথরের দ্বীপ।
দোল খান, ঝাঁকি দিন, উপর থেকে চিৎকার করলো বোরিস।
সে চেষ্টাই করছে নিকোলাস। গহ্বরের গায়ে পায়ের ধাক্কা দিয়ে রশিটাকে যতটা সম্ভব নাড়াচাড়া করছে, পাক খেয়ে মোচড়াচ্ছে। এক সময় ঘাম ছুটে গেল, বগলের তলায় রশির ঘষা লাগায় জ্বালা করছে চামড়া। লাভ হচ্ছে না, বোরিসকে জানালো।টেনেই তুলতে হবে। জোর লাগান, যতটা পারা যায়।
কয়েক সেকেন্ড পর ঠাটলটার উপরের রশি লোহার মতো শক্ত ও টান টান হলো, পাঁচজন লোক যত জোরে পারা যায় টানছে। ফাটলের নিচের রশি এক চুল নড়ছে না। বজ্র আটুনি একেই বলে, বের করে আনা সম্ভব নয়। নিচে তাকিয়ে চিন্তা করছে নিকোলাস। একটা মানুষের পতনের গতি ঘণ্টায় একশো পঞ্চাশ মাইল। এ গতিতে পানিতে নামা আর নিরেট কংক্রিটে নামা একই কথা।
আবার উপরে তাকালো নিকোলাস। লোকগুলো এখনো সর্বশক্তি দিয়ে রশি টানছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ফাটলার ধারালো কিনারা রশির একটা রোয়া কেটে দিল, রশির গা থেকে লম্বা সবুজ পোকার মতো আলগা হয়ে আসছে। আঁতকে উঠে চিৎকার দিল নিকোলাস, থামুন, টানবেন না! কিন্তু বোরিসকে দেখা যাচ্ছে না, ট্র্যাকারদের সঙ্গে হাত লাগিয়ে নিজেও রশি টানছে সে।
দ্বিতীয় রোয়াও ছিঁড়ে গেল। এখন মাত্র একটা রোয়ায় ঝুলছে নিকোলাস। ওটাও যে কোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যাবে, বুঝতে পারলো ও। রুশ কুত্তা, কি বলছি শুনতে পাচ্ছিস-থাম, শালা! টানবি না! থাম! কিন্তু ওর গলা বোরিসের কানে পৌঁছায় নি। শ্যাম্পেনের ছিপি খোলার মতো পপ করে একটা শব্দ হলো, রশির তৃতীয় ও শেষ ব্লোয়াটা ছিঁড়ে গেল।
