চুপিচুপি কখন এসেছে, কেউ দেখে নি তামেরকে। একটা কুঁড়ের পাশে গুঁড়ি মেরে বসে আছে। রোয়েন তার দিকে তাকাতেই আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেল মুখ, বোকার সলজ্জ হাসি হাসছে।
আপনার সঙ্গে বিকেলে আমি বের হচ্ছি না, বোরিসের কান বাঁচিয়ে নিকোলাসকে বলল রোয়েন। আশঙ্কা করছি টিসে উপর আবার আজ অত্যাচার হবে। আপনি তামেরকে নিয়ে যান।
রওনা হওয়ার সময় রোয়েনের খোঁজে চারদিকে তাকালো তামের, কিন্তু রোয়েন তার কুঁড়ে থেকে বেরুল না। অগত্যা, অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিকোলাসের পিছু নিল সে। তুমি আমাকে নদীর ওপারে নিয়ে যাবে, বলল নিকোলাস। যেখানে পবিত্র প্রাণীটা থাকে।
উত্তেজনার নতুন খোরাক পেয়ে নিকোলাসের সামনে চলে এলো তামের, ফুর্তিতে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে।
ঝুলন্ত ব্রিজ পেরিয়ে এসে আঁকাবাঁকা সরু পথ ধরে এক ঘণ্টা এগুলো ওরা। ক্ষয়ের কারণে এবড়ো থেবড়ো হয়ে থাকা পাথরেরমাঝখানে হারিয়ে গেছে পথটা, চেনাই মুশকিল। কোনো দিকে খেয়াল নেই, লাফিয়ে একের পর এক কাঁটাঝোঁপের ভেতর ঢুকে পড়ছে তামের। এ পাথুরে জমিন আর কাঁটাঝোঁপের ভেতর দিয়ে আরো প্রায় দুঘণ্টা এগুলো ওরা। এ পথে রোয়েনকে কেন আনতে চায় নি তামের, হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে নিকোলাস। নগ্ন হাত দুটো কাঁটায় চিরে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে, ট্রাউজারের পায়া ছিঁড়ে গেছে অন্তত দশ জায়গায়। তবে পথটা চিনে রাখছে ও, পরে খুঁজে নিতে পারবে।
অবশেষে আরেকটা রিজের মাথায় চড়ে থামলো তামের, হাত তুলে ওপারটা দেখালো। ওদের নিচে ফাঁক বা গহ্বরের পাঁচিল দেখতে পেল নিকোলাস। সেই ফাঁকা জায়গাটাও চোখে পড়লো, ডোরাকাটা খুদে ডিক-ডিক যেখানে বেরিয়ে আসে। ডানডেরা নদীর ওপারে কাঁটাগাছটাও চিনতে পারল, ওটার আড়ালে বসে থাকার সময় মেকের গেরিলারা বন্দি করেছিল ওদের।
তামেরকে বোতল থেকে পানি খেতে দিল নিকোলাস, তারপর নিজে খেলো। ঢাল বেয়ে নামার আগে রিগবি রাইফেলটা চেক করলো, লেন্স থেকে ধুলো মুছলো। চেম্বারে এক রাউন্ড গুলি ভরে সেট করলো সেফটিক্যাচ। আমার পেছনে থাকবে, নির্দেশ দিল ছেলেটাকে।
ঢাল বেয়ে নামছে নিকোলাস, কয়েক কদম পরপর সামনের ও দু পাশের কাঁটা ঝোঁপ পরীক্ষা করার জন্য থামছে। এভাবে ঝরনারটার মাথায় পৌঁছে গেল ওরা। এদিকের জমিন নরম ও ভেজা ভেজা। পশু-পাখিরা এখানে পানি খেয়েছে। কুডু আর বুশবাক-এর পায়ের ছাপ চিনতে পারলো নিকোলাস। তবে ওগুলোর মাঝখানে খুদে হৃৎপিণ্ড আকৃতির ছাপও আছে।
ঝোঁপ লক্ষ্য করে নিঃশব্দ পায়ে এগুলো নিকোলাস। ভেতরে ঢুকতেই বিষ্ঠার একটা তূপ দেখতে পেল, ডিক-ডিক তার নিজস্ব এলাকার সীমানা চিহ্নিতকরণের জন্য বাউন্ডারি পোস্ট হিসেবে ব্যবহার করে। খুদে বুলেট আকৃতির বিষ্ঠা, ডিক-ডিক এদিকে এলেই স্যুপটা আকারে আরেকটু বড় হয়।
শিকারের খোঁজে মগ্ন হয়ে পড়লো নিকোলাস, মনোযোগের মাত্রা দেখলে মনে হবে মানুষখেকো সিংহের পিছু নিয়েছে। প্রতিবার কয়েক ইঞ্চি এগুচ্ছে, পা ফেলার আগে দেখে নিচ্ছে সামনে শুকনো পাতা বা ডাল আছে কিনা, চোখের চঞ্চল দৃষ্টি দ্রুত বেগে আশপাশের ঝোঁপের ভেতর ঘোরাফেরা করছে।
একটা কান সামান্য একটু নাড়তে ধরা পড়ে গেল ডিক-ডিক। শরীরের অর্ধেকে ছায়া পড়েছে, গায়ের লালচে রঙ পেছনের শুকনো ডালের সঙ্গে মিশে এক হয়ে আছে, এমন স্থির যেনো মেহগনি খোদাই করে বানানো একটা মূর্তি। ওই একবার শুধু কান নড়ে ওঠায় ধরা পড়লো অস্তিত্ব। তারপর অবশ্য নাকটাও একটু কোঁচকাল, যেনো অস্বস্তিবোধ করছে। সম্ভবত বিপদ সম্পর্কে সচেতন, তবে জানে না। কোনোদিক থেকে আসবে।
ধীরে ধীরে রাইফেলটা কাঁধে তুললো নিকোলাস। লেসের ভেতর দিয়ে দুই শিং-এর মাঝখানের প্রতিটি রোম দেখতে পাচ্ছে। গলা আর মাথার মাঝখানে ক্রস হেয়ার সেট করলো, চামড়াটার ক্ষতি করতে চায় না।
ওই তো, ওই তো! নিকোলাসের কনুইয়ের কাছ থেকে তার স্বরে চিৎকার জুড়ে দিল তামের! সেন্ট জন ব্যাপ্টিস্টকে অভিনন্দন, পবিত্র প্রাণী দেখা দিয়েছে!
বাদামী ধোঁয়ার মতো চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল ডিক-ডিক, লেন্স থেকে চোখ সরাবার পর নিকোলাস শুধু ঝোঁপের দু একটা ডাল সামান্য নড়তে দেখলো। কাঁধ থেকে রাইফেলটা ধীরে ধীরে নামিয়ে তামেরের দিকে তাকালো ও। এটা কি করলে তুমি?
ধমক খেয়ে মাথা নিচু করলো তামের।
এরপর একাই এগুলো নিকোলাস, কিন্তু ঘণ্টাখানেক পর হাল ছেড়ে দিয়ে ফিরে এলো। ক্যাম্পে পৌঁছতে সন্ধ্যে হয়ে গেল ওদের। ক্যাম্পফায়ারের কাছে থামতেই ছুটে এলো রোয়েন। কী ঘটল? ডিক-ডিককে দেখা গেছে?
আপনার ভক্তকে জিজ্ঞেস করুন। ওই ভাগিয়ে দিয়েছে।
তামেরের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে আদর শুরু করলো রোয়েন।
তোমাকে নিয়ে সত্যি আমি গর্বিত, তামের। শুনে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করলো ছেলেটা, কুকুরছানার মতো লাফাতে লাফাতে মঠের পথ ধরল।
নিকোলাসের জন্য কফি নিয়ে এলো রোয়েন, আগুনের সামনে ওর পাশে বসলো। বার দুয়েক তাকিয়েই কিছু একটা সন্দেহ হলো নিকোলাসের, জিজ্ঞেস করলো, কিছু একটা হয়েছে। কী?
আগুনের ওদিকে বসে রয়েছে বোরিস, চট করে তাকে একবারের দেখে নিল রোয়েন, তারপর নিকোলাসের আরো কাছে সরে এসে গলা খাদে নামাল, মেকের সঙ্গে দেখা করার জন্য টিসেকে নিয়ে মঠে গিয়েছিলাম। টিসে অনুরোধ করাতেই যেতে হয়েছিল। কী বলছি বুঝতে পারছেন তো? টিসে একা গেলে বোরিস সন্দেহ করবে, তাই।
