সুদানে তো বিশ বছর ধরেই আগুন জ্বলছে, একমত হয়ে বলে মেক। উত্তরের মুসলমানদের সঙ্গে দক্ষিণের খ্রিস্টানদের লড়াই চলছে ওখানে।
আমি সেটা জানি, মেক। কিন্তু তা হলো সুদানে- তোমার যুদ্ধ নয় ওটা!
অবশ্যই এটা আমার যুদ্ধ। মেক একরোখা স্বরে বলে। আমি সৈনিক এবং খ্রিস্টান।
চোখে সম্মতি নিয়ে সায় দেয় টিসে। গোগ্রাসে মেক নিমুরের কথা গিলছে সে।
অল্টো মেক যিশুর পথের সৈনিক। সাধারণ লোকের অধিকারের জন্য কাজ করছে সে। অভিভুত স্বরে নিকোলাসকে বলল টিসে।
হুম। লড়াই ওর রক্তে। নিকোলাস হাসে।
তো, নিকি, এখানে কী করছো তুমি? যদি সৈনিক না হয়, যদি লড়াই ভালো না-ই বাসো, তবে কী করছো এ জঙ্গলে? মেকের কণ্ঠে কৌতূহল।
এসেছি অ্যাবে গিরিখাদে, নিকোলাসের জবাব। ডিক-ডিক শিকার করব?
কী বললে? ডিক-ডিক? মেকের চোখে অবিশ্বাস। তারপর গলা ছেড়ে হেসে উঠলো। তুমি? ডিক-ডিক শিকার করবে? তুমি? নাহ্, বিশ্বাস করলাম না। তোমার অন্য কোনো মতলব আছে।
প্রশ্ন হলো, প্রয়োজনে তোমার সাহায্য পাব কিনা।
চাইলেই পাবে। দু দু বার জান বাঁচিয়েছ।
একবার, শুধরে দিল নিকোলাস।
এমন কি একবারও যথেষ্ট।
*
কাল সকালে সেন্ট ফুমেনটিয়াস মঠে ওদেরকে পৌঁছে দিবে মেক। তিমকাত উৎসবে যোগ দেওয়ার জন্য গেরিলাদের নিয়ে তারও সেখানে যাবার কথা। প্রধান পুরোহিত জালি হোরা তার বন্ধু। নিকোলাস আন্দাজ করলো, মঠটা আসলে মেকের ডীপ কাভার বেস। সম্ভবত সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে প্রতিপক্ষ বাহিনীর তৎপরতা সম্পর্কে তথ্যও পায় সে।
একটা একচালার অর্ধেকটা চট দিয়ে ঘিরে ছেড়ে দেওয়া হলো নিকোলাস আর রোয়েনকে, বিছানা তৈরি হলো শুকনো ঘাস বিছিয়ে। মশা তাড়াবার জন্য ধূপ জ্বালা হলো। রোয়েন আর নিকোলাস কাছাকাছি শুয়েছে, রোয়েনের শরীর চাদরে ঢাকা। ঘরের দরজা খোলা, বাইরে ক্যাম্পফায়ারের সামনে বসে থাকতে দেখা গেল মেক আর টিসেকে।
সেদিকে তাকিয়ে নিচু গলায় রোয়েন বলল, ইথিওপিয়ার মেয়েরা মনে হচ্ছে। আরবের মতো নয়। আরবের কোনো মেয়ে পরপুরুষের সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত একা বসে থাকবে না। বিশেষ করে সে যদি বিবাহিতা হয়।
যা-ই বলেন, ওদের দুজনকে একসঙ্গে মানিয়েছে বেশ। নিকোলাস নিজের মত দেয়। ওদের জন্য আমার শুভকামনা রইলো!
এরপর রোয়েনের দিকে ফিরে ও জানতে চাইলো, আপনি কেমন, রোয়েন? একজন আড়ম্বরপূর্ণ, লাজুক আরব মেয়ে নাকি প্রগতিশীল পশ্চিমা নারী?
এ ধরনের ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার সময় মনে হয় এখনো আসে নি; অথবা হয়তো অনেক দেরী হয়ে গেছে! বলেই, পাশ ফিরে নিকোলাসের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল রোয়েন।
আহ্! শুভরাত, ওইজিরো রোয়েন।
শুভরাত, অল্টো নিকোলাস, মুখ না ঘুরিয়েই বলল রোয়েন, যেনো ওর ঠোঁটে জেগে ওঠা হাসিটা নিক দেখতে না পায়।
*
পরদিন ভোর হওয়ার আগেই রওনা হয়ে গেল গেরিলারা। মার্চ শুরু হলো পুরোপুরি সামরিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে, মূল দলের সামনে ও দু পাশে থাকলো স্কাউটরা। নিকোলাসকে মেক জানালো, গিরিপথের এদিকে খুব কমই আসে আর্মি, তবু তারা সারাক্ষণ সতর্ক থাকে।
চলার পথে টিসের উচ্ছ্বাস আর আবেগ হলো দেখার মতো। তার মুগ্ধ দৃষ্টি মুহূর্তের জন্যও মেকের উপর থেকে নড়ছে না। রোয়েনের কানে কানে বলল, পারলে একমাত্র উনিই আমাদের দেশটাকে এক করতে পারবেন, হাজার বছরেও যে কাজ কেউ পারে নি। ওকে দেখে আমি যেনো আমার কৈশোর ফিরে পেয়েছি। আনন্দ আর আশা জা ছে বুকে।
মঠের কাছাকাছি পৌঁছতে সারাটা সকাল লেগে গেল। ডানডেরা নদীকে দেখামাত্র গেরিলাদের নিয়ে গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়লো মেক মঠে পাঠানো হলো মাত্র চারজন স্কাউকে। এক ঘণ্টা পর মাথায় বড় আকারের বান্ডিল নিয়ে একদল তরুণ উপাসক এলো মঠ থেকে। মেককে সমীহের সঙ্গে অভ্যর্থনা জানালো তারা, বান্ডিলগুলো রেখে আবার নেমে গেল সরু পথ ধরে গিরিখাদে।
বান্ডিল থেকে বেরুল শিক্ষানবিস সন্ন্যাসীদের উপযোগী ঢোলা আলখেল্লা। গেরিলাদের মধ্যে শুধু যারা খ্রিস্টান, তারা পারবে। দেখা গেল আলখেল্লার ভেতর শুধু সাইডআর্মস ভরলো গেরিলারা। বাকি সব অস্ত্র ও গোলা-বারুদ পাহাড় প্রাচীরের গুহায় রেখে যাওয়া হচ্ছে, পাহারায় থাকবে কয়েকজন সেন্ট্রি।
সন্ন্যাসী সেজে রওনা হয়ে গেল গেরিলারা, মঠ আর মাত্র কয়েক মাইল দূরে। পথ থেকেই বিদায় নিল নিকোলাস, মেয়ে দু জনকে নিয়ে ফিরে এলো ক্যাম্পে।
রাগে ও হতাশায় ফাঁকা জায়গাটায় পায়চারি করছিল বোরিস। তুমি একটা খারাপ মেয়েমানুষ! টিসেকে দেখেই মারমুখো হয়ে ছুটে এলো সে। সারারাত দেহদান করে এলে!
কাল সন্ধ্যায় আমরা পথ হারিয়ে ফেলি, বলল নিকোলাস, গেরিলাদের নিরাপত্তার স্বার্থে বোরিসকে বলার জন্য এ মিথ্যে গল্পটা ওকে শিখিয়ে দিয়েছে মেক। আজ সকালে একদল সন্ন্যাসী আমাদের দেখতে পেয়ে ফিরিয়ে আনে।
হারিয়ে তো যাবেনই, মিস্টার! খেঁকিয়ে উঠলো বোরিস। গাইড হিসেবে আমাকে ভাড়া করেছেন, অথচ আমাকে সঙ্গে নেওয়ার কথা উঠলে আপনার অ্যালার্জি হয়! খারাপ মেয়েমানুষ, তোমার সঙ্গে আমার পরে বোঝাঁপড়া হবে। যাও, কী খাওয়া হবে দেখো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গাছতলায় দুপুরের খাবার পরিবেশন করলো টিসে। ওরা খাচ্ছে, রোয়েনের হাতে টোকা দিয়ে নিকোলাস বলল, আপনার সেই ভক্ত হাজির!
