সোজা হলো গেরিলা লীডার, নিজের লোকদের সঙ্গে দ্রুত কথা বলছে। ওর রাইফেল আর প্যাক নিয়ে নাও।
আমরা ব্রিটিশ নাগরিক, বলল নিকোলাস সাধারণ ট্যুরিস্ট। যোদ্ধা বা সরকারি লোক নেই।
কথা নয়, একদম চুপ! কঠিন সুরে খেঁকিয়ে উঠলো লিডার। আরবি ভাষা শুনে চমকে গেছে। আড়াল থেকে গেরিলারা বেরিয়ে আসছে। সব মিলিয়ে পাঁচজনকে দেখতে পাচ্ছে নিকোলাস, তবে অনেকেই হয়তো সামনে বেরোয় নি নড়াচড়ার ধরনই বলে দেয় প্রফেশনাল, গুলি পথে বাধা হচ্ছে না, সুযোগ দিচ্ছে না পালানোর ঝটপট সার্চ করা হলো ওদেরকে, তারপর ধমক দিয়ে পথে এনে তোলা হলো।
কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? জানতে চাইলো নিকোলাস।
কোন প্রশ্ন নয়! ওর শোল্ডার রেডের মাঝখানে একে-ফরটিসেভেনের বাঁট দিয়ে আঘাত করলো একজন গেরিলা। পড়েই যাচ্ছিল, কোনোরকমে তাল সামলালো।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যে হাঁটতে বাধ্য করা হচ্ছে ওদেরকে। সূর্যের অবস্থান লক্ষ করছে নিকোলাস, সুযোগ পেলেই দেখে নিচ্ছে পাহাড়-প্রাচীরের চূড়াগুলো। পশ্চিম দিকে যাচ্ছে ওরা, নীলনদের কোর্স ধরে সুদান সীমান্তের দিকে। শেষ বিকেলের দিকে আন্দাজ করলো দশ মাইল পেরিয়েছে। ইতোমধ্যে উপত্যকার একটা পাশে পৌঁছেছে ওরা, ডালটা ঘন জঙ্গলে ঢাকা। আরো মাইলখানেক এগোবারপর গেরিলাদের ক্যাম্পটা দেখা গেল। কয়েকটা মাত্র একচালা, সেন্ট্রিরা লাইট মেশিন গান নিয়ে সর্তক হয়ে আছে।
ক্যাম্পের মাঝখানের একটা একচালার সামনে দাঁড় করানো হলো ওদেরকে। ভেতরে নিচু ক্যাম্প টেবিলের উপর ঝুঁকে ম্যাপ দেখছে তিনজন অফিসারদের মধ্যে কমান্ডারকে আলাদাভাবে চেনা গেল। গেরিলা গ্রুপের লীডার তার কাছে গিয়ে উত্তেজিত ভঙ্গিতে কিছু বলল, ইঙ্গিতে বন্দিদের দেখালো।
সোজা হলো কমান্ডার, বেরিয়ে এলো রোদে। লোকটা বেশি লম্বা নয়, তবে চেহারায় এতো বেশি গাম্ভীর্য ও কর্তৃত্ব যে সেটা প্রথমে চোখে পড়ে না। কাঁধ দুটো চওড়া, কাঠামোটা চৌকো ও নিরেট। মুখে কোঁকড়ানো কালো দাড়ি, অল্প দুয়েকটা শাদা। চেহারায় মার্জিত একটা ভাব স্পষ্ট, সুদর্শনও বলতে হবে। চোখ দুটো চঞ্চল ও বুদ্ধিদীপ্ত, দৃষ্টি নিক্ষেপে ক্ষিপ্রতা লক্ষ্য করার মতো। আমার লোক বলছে তুমি নাকি আরবি জানো, নিকোলাসকে বলল সে।
তোমার চেয়ে ভালো জানি, মেক নিমুর, জবাব দিল নিকোলাস। তা, এ তোমার শেষ পরিণতি? একদল ডাকাতের সর্দার? কিডন্যাপারদের লীডার?
এক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে নিকোলাসের দিকে তাকিয়ে থাকলো মেক নিমুর। নিকোলাস? ওহ্ গড! তোমাকে আমি চিনতে পারি নি? তোমাকে? হাসছে সে। দুই হাত মেলে দিল, ভঁজে আটকে বুকে টেনে নিল নিকোলাসকে। নিকোলাস! নিকোলাস! দু গালে দু বার চুমো খেলো, তারপর বাহু সমান দূরে ঠেলে দিয়ে মেয়ে দূটোর দিকে তাকালো। এ ব্যাটা আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল, ব্যাখ্যা দেয়ার সুরে বলল ওদেরকে। দু জনেই ওরা হাঁ করে তাকিয়ে আছে। এদিকে গেরিলা দল ততক্ষণে হাওয়া।
লজ্জা দিচ্ছ, মেক।
নিকোলাসকে আবার চুমো খেলো মেক নিমুর। তাও একবার নয়, দু বার।
না একবারই, প্রতিবাদ করলো নিকোলাস। দ্বিতীয়বার ভুলে। ওদের গুলিতে তোমাকে মরতে দেওয়া উচিত ছিল আমার।
গলা ছেড়ে হেসে উঠলো গেরিলা কমান্ডার মেক। প্রায় পনেরো বছর আগের কথা, তাই না? তুমি কী এখনো ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে আছো? এতোদিনে নিশ্চয়ই জেনারেল হয়ে গেছ!
থাকলে হতাম, কিন্তু থাকি নি।
মেয়ে দুটোর মধ্যে কে জানে কেন টিসেকে মনে ধরেছে মেকের, অন্তত ঘন ঘন তার দিকেই তাকাচ্ছে সে। তোমাকে আমি চিনি। কয়েক বছর আগে আদ্দিসে দেখেছি। তখন কিশোরী ছিলে। তোমার বাবা অল্টো জিমেন, অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। মেনজিসটু তাকে খুন করে।
আমিও আপনাকে চিনি, বলল টিসে। আমাদের অনেকেরই বিশ্বাস, মেনজিসটুর বদলে আপনারই ইথিওপিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়া উচিত ছিল। সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে মাথা নোয়ালো সে।
সোজা হয়ে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াও। কারো সামনে মাথা নিচু করো না। নিকোলাসের দিকে তাকালো কমান্ডার মেক। আমার লোকেরা একটু বেশ উৎসাহী, খারাপ ব্যবহার করায় দুঃখিত। তবে আমরা খবর পেয়েছি যে মঠে কিছু লোকজন। এসেছে, প্রশ্ন করছে নানা রকম। এসো, নিকোলাস, ভেতরে এসো।
ক্যাম্প ফায়ার থেকে কেটলিতে কফি বানিয়ে আনা হলো, মগে ভরে ধরিয়ে দেওয়া হলো হাতে। পুরানো দিনের কথা স্মরণ করলো নিকোলাস ও মেক। ফকল্যান্ড যুদ্ধের আগে মেনজিস্টুর বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে ওরা দু জন।
কিন্তু যুদ্ধ তো শেষ, মেক, নিকোলাস বলে, হারজিত হয়ে গেছে। এখন কেন বনে-জঙ্গলে দলবল নিয়ে ঘুরে ফিরছো? কেন আদ্দিসে গিয়ে আরাম-আয়েশে নিজেকে ভাসিয়ে দিচ্ছ না, অন্যদের মতো?
এখনো আদ্দিসে মেনজিন্টুর মতো শত্রু আছে আমার। শত্রুমুক্ত ইথিওপিয়া না হলে কেমন করে লড়াই ছেড়ে দিই? মেক নিমুর জানায়।
এরপর ইথিওপিয়ার রাজনীতি নিয়ে গভীর আলাপে মগ্ন হয়ে যায় নিকোলাস ও মেক। কী নিয়ে কথা বলছে তারা, আলোচ্য চরিত্রই বা কারা কিছুই বুঝতে পারলো না রোয়েন। তবে, বিভিন্ন বিষয়ে নিকোলাসের প্রজ্ঞা দেখে অবাক হলো সে। এমন কী মেক নিমুর পর্যন্ত নিকোলাসের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ চাইছে!
তার মানে, এখন ইথিওপিয়ার সীমান্তের বাইরে, সেই সুদান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে তোমার যুদ্ধ? নিকোলাস শুধালো নিমুরকে।
