আপনার ট্র্যাকারদের কী খবর? কোনো চিহ্ন মিললো? নিকোলাস শুধায়।
পায় নি আবার! কুড়ু, বুশবাক, বাফেলো- কি নেই এখানে? এমনকি, ডিক ডিক পর্যন্ত পেয়েছে ওরা, কিন্তু আফসোস, ডোরাকাটা নয়!
মুখ খুলতে যাচ্ছিল রোয়েন, চোখ ইশারায় নিষেধ করলো নিকোলাস, নিচু গলায় আরবিতে বলল, জানলে কাল ওরা আমাদের সঙ্গে যেতে চাইবে।
মিস্টার নিকোলাস, স্যার, মা জননী কি আমাকে ভদ্রতা বলে কিছু শেখান নি? সবাই না বুঝলে, সে ভাষায় কথা বলতে নেই। নিন, খানিকটা ভদকা খান।
আমার ভাগটুকুও আপনি খেয়ে ফেলুন, বলল নিকোলাস।
ডিনারের সময় প্রায় কোনো কথাই বলছে না টিসে। করুণ আর বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তাকে। রোয়েন লক্ষ্য করলো, স্বামীর দিকে ভুলেও সে তাকাচ্ছে না। ডিনার শেষ হতে নিকোলাস আর রোয়েন উঠে পড়লো, আগুনের ধারে স্ত্রীকে বসিয়ে রাখলো বোরিস।
নিজেদের কুঁড়ের দিকে যাবার সময় নিকোলাস বলল, যেভাবে গিলছে বোরিস, আজ রাতেও না বউকে ধরে পেটায়।
আজ সারাদিন টিসের উপর অত্যাচার করেছে লোকটা, বলল রোয়েন। আমাকে টিসে বললেন, আদ্দিসআবাবায় ফিরেই স্বামীকে ছেড়ে দেবেন।
এরকম একটা জানোয়ারের সঙ্গে বিয়ে হলো কী করে? দেখতে তো খুবই সুন্দর, ভালো একজনকে বেছে নিতে পারলেন না?
সব মেয়ে সমান নয়, জবাব দিল রোয়েন। কিছু মেয়ে জানোয়ার দেখলে আকৃষ্ট হয়। বিপদের মধ্যে রোমাঞ্চ থাকে, সেটাই বোধহয় কারণ। সে যাই হোক, টিসে জানতে চাইছেন কাল আমাদের সঙ্গে বেরুতে পারবেন কিনা। স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন বেচারি।
অন্তত ওঁকে রেহাই দেওয়ার জন্য সঙ্গে নেওয়া দরকার, রাজি হলো নিকোলাস।
পরদিন ভোর হওয়ার আগেই রওনা হলো ওরা। রিগবি হাতে নিকোলাস সামনে থাকলো, পেছনে মেয়ে দু জন কথা বলতে বলতে আসছে। ডোরাকাটা ডিক-ডিক সম্পর্কে জানানো হলো টিসেকে, ওদের প্ল্যানটাও ব্যাখ্যা করা হলো। আগের দিন তামের যে পথ ধরে নিয়ে গিয়েছিল, সেই পথটাই অনুসরণ করছে ওরা।
সূর্য বেশ অনেকটা উপরে উঠে আসার পর ফাটলটার ঠোঁটে, কাটা-ঝোঁপের নিচে পৌঁছলো ওরা। ওত পেতে বসে থাকা ছাড়া আজ কোনো কাজ নেই ওদের। খানিক পর রোয়েন জিজ্ঞেস করলো, বেচারি ডিক-ডিককে যদি গুলি করতে পারেন, ওপার থেকে সেটাকে আনবেন কীভাবে?
ক্যাম্প ছাড়ার আগেই ব্যবস্থা করেছি, বলল নিকোলাস। হেড ট্র্যাকারের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার। গুলির শব্দ হলে রশি নিয়ে হাজির হবে সে, ওপারে পৌঁছতে সাহায্য করবে আমাকে।
ওদের নিচে ফাটলটার দিকে তাকালো টিসে।
এর উপর দিয়ে ওপারে যেতে কোনোদিনই রাজি হব না আমি।
টিসে আর রোয়েন নিকোলাসের কাছাকাছি শুয়ে পড়লো। নিচু গলায় গল্প করছে হাতে রিগবি নিয়ে অপেক্ষা করছে নিকোলাস, কাটা গাছে হেলান দিয়ে। দুপুর পেরিয়ে গেল। ডিক-ডিকের দেখা নেই।
গরমে সিদ্ধ হচ্ছে মেয়েরা আগেই মুখ বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের। ঝিমুনি এসে যাচ্ছে।
আরো প্রায় আধঘণ্টা পর কী একটা শব্দে তন্দ্রা ছুটে গেল নিকোলাসের। ওর পেছনের কাটাঝোঁপ থেকে আওয়াজটা এসেছে বলে মনে হলো। খুবই অস্পষ্ট, তবে পরিচিত। এমন একটা শব্দ, এক নিমেষে পুরোপুরি স্রোত নেমে এলো শিরদাঁড়া বেয়ে। একে-ফরটিসেভেনের সেফটি ক্যাচ সামনে টেলে ফায়ার পজিশনে আনা হয়েছে।
এক ঝটকায় কোল থেকে রাইফেল তুলে নিয়ে দু বার গড়ান দিল নিকোলাস, শরীর মুচড়ে পাশে শুয়ে থাকা মেয়ে দুটোকে আড়াল দেওয়ার চেষ্টা একই সঙ্গে রিগবিটা কাঁধে তুলে ফেলেছে, তাক করেছে পেছনের ঝোঁপ।
মাথা তুলবেন না, হিসহিস করলো নিকোলাস। নিচে রাখুন মাথা! ট্রিগারে আঙুল,পাল্টা গুলি করার জন্য প্রস্তত। টার্গেট দেখতে পেয়েই ব্যারেল ঘোরালো সেদিকে।
বিশ কদম দূরে এক লোক গুঁড়ি মেরে বসে আছে, হাতের অ্যাসল্ট রাইফেল সরাসরি নিকোলাসের মুখে তাক করা। চকচকে কালো লোকটা, ভেঁড়া-ফাঁড়া ক্যামোফ্লেজ ফেটিগ পরে আছে, মাথার নরম ক্যাপটাও তাই। ওয়েবিং বেল্টে একটা বুশনসাইফ, গ্রেনেড, পানির বোতল ও গেরিলাযোদ্ধার অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস রয়েছে। প্রফেশনাল শুফতা, চিন্তা করছে নিকোলাস, ঝুঁকি নেওয়া যায় না। একই সঙ্গে উপলব্ধি করলো, ইচ্ছে থাকলে এতোক্ষণে মেরে ফেলতে পারতো ওকে।
রিগবি তাক করলো নিকোলাস অ্যাসল্ট রাইফেল মাজলের এক ইঞ্চি উপরে, ওটার পেছনে গেরিলার রক্তলাল ডান চোখে।
অচল বা চালমাত অবস্থা; চোখ সরু করে জানান দিল লোকটা। তারপর আরবিতে নির্দেশ দিল, সলিম, মেয়ে দুটোকে কাভার দাও লোকটা নড়লে গুলি করবে ওদের।
খসখস আওয়াজ শুনে একপাশে তাকালো নিকোলাস। ঝোঁপের আড়াল থেকে আরেকজন গেরিলা বেরিয়ে এলো। একই ড্রেস, তবে কোমরের কাছে ধরে আছে রাশিয়ান আরপিডি লাইট মেশিন গান। সাবধানে এগিয়ে এসে পয়েন্ট-ব্লাঙ্ক রেঞ্জ থেকে মেয়েদের উপর মেশিন গান তাক করলো সে।
ওদের চারপাশের ঝোঁপ থেকে আরো আওয়াজ আসছে। দু জন নয়, গেরিলাদের গোটা একটা গ্রুপ, বুঝতে পারলো নিকোলাস। জানে, মাত্র একটা গুলি করার সুযোগ পাবে ও। ফলাফল যা-ই হোক, রোয়েন আর টিসে ততক্ষণে লাশে পরিণত হবে।
মাজলটা ধীরে ধীরে নিচু করলো নিকোলাস। তারপর মাটিতে রাইফেল নামিয়ে মাথার উপর হাত তুললো। ওরা যা বলে শুনুন।
