জ্যাক হেলম্ ভালো একটা বাহন পেয়েছে, বলল নিকোলাস। যখন খুশি আমাদের উপর নজর রাখতে পারবে।
কপ্টারটা উপখাদের কুঁজ পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল, সম্ভবত মঠের দিকে যাচ্ছে।
বসের নির্দেশে ওরা সম্ভবত আমাদের ক্যাম্প খুঁজছে, আন্দাজ করলো নিকোলাস। চলুন, ফিরি। না, সবুর! ইঞ্জিনের আওয়াজ আবার বাড়তে শুরু করেছে। ঝোঁপ-ঝাড়ের ফাঁকে আবার কপ্টারটাকে দেখা গেল, ওদের মাথার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। নদীটাকে অনুসরণ করছে ওরা, বলল নিকোলাস। কিছু খুঁজছে। বলে মনে হয়।
আমাদের?
এ সময় ওদেরকে চমকে দিয়ে ঝোঁপের আড়াল থেকে বেরিয়ে ছুটলো তামের। বাঁচাও! তার স্বরে চিৎকার করছে। কে কোথায় আছ বাঁচাও আমাকে! শয়তান তাড়া করেছে! যিশু তোমার পায়ে পড়ি, আমাকে বাঁচাও! ফাঁকা জায়গায় বেরিয়েও থামছে না, ছুটছে এখনো।
পাইলট তাকে দেখে ফেলেছে, কপ্টার ঘুরে গেছে ওদের দিকে। খুব নিচু দিয়ে এলো ওটা, গহ্বরের ঠোঁটের কাছে স্থির হলো শূন্যে। ফরওয়ার্ড কেবিনের উইন্ডস্ক্রীনের ভেতর দুটো মাথা দেখতে পাচ্ছে ওরা। আরো নিচে নামছে পাইলট। নদীর উপর ঝুলে থাকলো। ঝোঁপের ভেতর কুঁকড়ে আছে ওরা, নিকোলাসকে দু হাতে আঁকড়ে ধরেছে রোয়েন। কানে ভারী রেডিও এয়ারফোন আর গাঢ় চশমা থাকলেও জ্যাক হেলকে চিনতে পারলো ওরা। পাইলট কালো। দু জনেই গলা লম্বা করে নিচে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। ধরা পড়ে যাওয়ায় এখন আর লুকিয়ে থাকার কোনো মানে হয় না। হাত-পা ছড়িয়ে পেছনের গাছে হেলান দিল নিকোলাস, হ্যাঁটা মাথার পেছনে ঠেলে দিয়ে হাত নাড়লো হেলমের উদ্দেশে।
ফোরম্যান সাড়া দিল না। নিকোলাসের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে দিয়াশলাই জ্বাললো, ঠোঁটে ঝোলা আধ পোড়া চুরুটে ধরালো আগুনটা। কাঠিটা ফেলে দিয়ে এক মুখ ধোয়া ছাড়লো নিকোলাসকে দিকে, তারপর কী যেনো বলল পাইলটকে। উপরে উঠলো কপ্টার, বাঁক ঘুরে উত্তর দিকে চলে গেল।
শুধু আমাদেরকে নয়, আমাদের ক্যাম্পটাও দেখে গেল ওরা, বলল রোয়েন।
চলুন, ফিরি, বলল নিকোলাস। কাল আবার আসা যাবে।
ওদেরকে আমার ভয়ই লাগছে, বলল রোয়েন, তবে নিকোলাস চুপ করে আছে দেখে প্রসঙ্গ বদলে জানতে চাইলো, তামেরের আবার খিঁচুনি শুরু হয় নি তো?
পথের ধারেই পাওয়া গেল তাকে। কাঁপছে সে এখনো, কাঁদছে, তবে খিচুনি ওঠে নি। রোয়েন গায়ে-মাথায় হাত বুলাতে শান্ত হলো সে। ওদের পেছন পেছন অনেক দূর এলো, তারপর কখন এক সময় অদৃশ্য হয়ে গেল মঠের দিকে।
*
সন্ধ্যের আগে আরেকবার মঠ দেখতে এলো ওরা। পাথুরে ক্যাথেড্রালের প্রবেশমুখে থামলো, তারপর আউটার চেম্বারে ঢুকে তরুণ উপাসকদের ভিড়ে মিশে গেল।
খোলা দরজা দিয়ে মিডল চেম্বারের ভেতর তাকিয়ে ফিসফিস করলো রোয়েন, তামেরের কথা থেকে বোঝা যায়, ডিউটিতে থাকা পুরোহিত কখন ঘুমিয়ে পড়বে তার অপেক্ষায় থাকে শিক্ষানবিস তরুণরা।
কিন্তু ভেতরের সম্পর্কে আমাদের তো তেমন করে কিছু জানা নেই, নিকোলাস বলে।
দেখা গেল পুরোহিতরা বিনা বাধায় ভেতরে আসা-যাওয়া করছেন, কারো অনুমতির জন্য কোথাও থামছেন না। তবে দরজায় পাহারায় দাঁড়ানো পুরোহিতদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের সময় নাম ধরে সম্বোধন করছেন সবাই। পরস্পরকে সবাই তারা চেনেন। নিকোলাস বলল, সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ নিয়ে ভেতরে ঢুকলাম, তারপর ধরা পড়ে গেলাম। পবিত্র এলাকায় অনুপ্রবেশের সাজাটা যেনো কী?
নীলনদের বুভুক্ষু কুমীরের খোরাক বানানো হয় না তো? হেসে উঠলো রোয়েন। তবে আমাকে না নিয়ে ওখানে আপনি ঢুকছেন না।
এ নিয়ে এখুনি তর্ক করতে রাজি নয় নিকোলাস। খোলা দরজা দিয়ে যতটুকু পারা যায় দেখে নিতে চাইছে ও। আউটার চেম্বারের চেয়ে মিডল চেম্বারটা আকারে ছোট বলে মনে হলো। ভেতরে ছায়ার ভেতর দেয়ালচিত্র দেখা যাচ্ছে। মুখোমুখি দেয়ালে আরেকটা দরজা। তামেরের বর্ণনা অনুসারে ওটা মাকডাসে ঢোকার পথ। পাঁকটা বন্ধ করা হয়েছে গ্রিলের গেট বসিয়ে। গেটের ফ্রেমটা গাঢ় রঙের কাঠ দিয়ে তৈরি, তবে বারগুলো লোহার।
দরজার দু পাশে পাথুরের সিলিং থেকে মেঝে পর্যন্ত এমব্রয়ডারি করা পর্দা ঝুলছে, তাতে সেইন্ট ফুমেনটিয়াসের জীবন কাহিনী থেকে নেওয়া দৃশ্য ফুটে উঠেছে। একটা দৃশ্যে নতমস্তকে সমবেত শিষ্যদের ধর্মীয় বাণী শোনাচ্ছেন তিনি, এক হাতে বাইবেল, অপর হাতটা আশীর্বাদ করার ভঙ্গিতে উপরে তোলা। আরেকটা পর্দায় ফুটে উঠেছে একজন সম্রাটকে ব্যাপ্টিজমে দীক্ষিত করার দৃশ্য। জালি হোরার মতোই মাথায় উঁচু আর সোনালি মুকুট পরে আছেন সম্রাট, সেন্টের মাথার চারপাশে একটা বলয়। সম্রাটের মুখ কালো, তবে সেইন্টের মুখ সাদা।
ইতিহাস কি এখানে বিশুদ্ধ? বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্নটা করলো নিকোলাস।
কী ভেবে হাসছেন আপনি? জানতে চাইলো রোয়েন। ভেতরে ঢোকার কোনো উপায় পেয়ে গেছেন?
না, ভাবছি ডিনারের কথা। চলুন, ফিরি।
ডিনারে বসে দেখা গেল বোরিস ঢক ঢক করে শুধু মদই খাচ্ছে। সারাদিন কে কী করলো বা দেখলো আলোচনা হচ্ছে। দুপুরে তারই শিকার করা কবুতরের রোস্ট খাচ্ছে সবাই মজা করে।
তো, ইংরেজ সাহেব, কেমন শিকার করলেন আজ? ভয়ঙ্কর ডিক ডিক আবার আপনাকে আক্রমণ করে বসে নি? অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলল বোরিস।
