হেসে ফেললো নিকোলাসও। ও সত্যি কথা বলছে কিনা সন্দেহ আছে আমার। আমি যতটুকু বুঝি, ডোরাকাটা ডিক-ডিকের আজ আর কোনো অস্তিত্ব নেই। তামেরের দিকে তাকালো ও। যদি বুঝি যে মিথ্যে বলছ, সত্যি সত্যি তোমাকে গাছে ঝোলানো হবে, মনে থাকে যেন।
আমি মিথ্যে কথা বলছি না, বলে ফোঁপাতে শুরু করলো কিশোর ছেলেটা।
নাক গলাল রোয়েন। কেন শুধু শুধু ভয় দেখাচ্ছেন ওকে! ও আমাদের কোনো ক্ষতি করবে না। তামেরের মাথায় আদর করে হাত বুলালো।
ঠিক আছে, তোমাকে একটা সুযোগ দেওয়া হলো, বলল নিকোলাস। নিয়ে চলো আমাদের, দেখি কোথায় দেখেছিলে পবিত্র ডিক-ডিক।
আবার রওনা হলো ওরা। তামের হাঁটছে না, বলা চলে রোয়েনের পাশে নাচছে, হাতটাও সে ছাড়তে রাজি না। একশো গজও পেরোয় নি, চেহারা থেকে ভয়-ডর সব উধাও হয়ে গেল, আহ্লাদে আটখানা অবস্থা। চোখে-মুখে লাজুক ভাব নিয়ে খিকখিক করে হাসছে।
এক ঘণ্টা ওদেরকে পথ দেখালো তামের, ডানডেরা নদী থেকে দূরে সরিয়ে আনল। উপত্যকার অনেক উপর, উঁচু জমিতে উঠে আসার পর লাইমস্টোনের রিজ দেখতে পেল ওরা, হুকের মতো কাটা নিয়ে ঘন ঝোঁপগুলো গোটা এলাকাটাকে দুর্গম করে রেখেছে। ঝোঁপগুলো পরস্পরের সঙ্গে জোড়া লাগানো, দেখে মনে হচ্ছে। এগোবার কোনো পথ নেই। তবে আঁকাবাঁকা একটা সরু পথ ঠিকই খুঁজে বের করলো তামের, এতো কম চওড়া যে দুপাশের কাঁটাঝোঁপ এড়াতে ধীর পায়ে সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে। তারপর হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো তামের, রোয়েনের কব্জিতে টান দিয়ে ওকেও নিজের পাশে দাঁড় করালো। হাত দিয়ে নিচের দিকটা দেখালো সে, প্রায় নিজের পায়ের আঙুলগুলো।
নদী! বলল তামের, গলায় উল্লাস। তার পাশে এসে দাঁড়ালো নিকোলাস, অবাক হয়ে শিস দিল মৃদু। বিশাল এক বৃত্ত তৈরি করে তামের ওদেরকে পশ্চিমে নিয়ে এসেছে, তারপর ফিরিয়ে এনেছে ডানডেরা নদীর এমন একটা পয়েন্টে যেখানে প্রবাহটা এখনো বয়ে চলেছে গভীর নালার তলায়।
এ মুহূর্তে সেই গহ্বরের একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা। একবার তাকিয়েই নিকোলাস লক্ষ্য করলো, পাথুরে নালার মাথার দিকটা একশো ফুটের কম চওড়া হলেও, রিম-এর নিচে গহ্বরটা প্রসারিত হয়েছে। বহু নিচের পানির সারফেস থেকে উঠে আসা পাথরের পাঁচিল মাটির তৈরি তেজ বোতলের মতো ক্রমশ ফুলে উঠেছে। আবার ওটা সরু হয়েছে মাথা কাছাকাছি যেখানে ওরা দাঁড়িয়ে। ওখানে দেখেছি, গহ্বরের অপরদিকটা দেখালো তামের। ওখানে কাটাঝোঁপের ভেতর থেকে একটা ঝরনার বেরিয়ে এসেছে। ধনুকের মতো বাঁকা পাথুরে পাঁচিলে ঝুলে আছে সবুজ শ্যাওলার জাল, তা থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি ঝরে পড়ছে দুশো ফুট নিচের নদীতে।
ওপারে যদি দেখে থাকো, আমাদেরকে এপারে আনলে কেন?
চেহারা দেখে মনে হলো কেঁদে ফেলবে তামের। এদিকে আসাটা সহজ। ওপারের জঙ্গলে কোনো পথ নেই। ঝোঁপের কাঁটা লাগবে মেমসাহেবকে।
তামেরের কাঁধে হাত রেখে চাপ দিল রোয়েন। গহ্বরের ঠোঁটে ঝুলে থাকা একটা গাছের ছায়ায় বসে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত হলো। ইতোমধ্যে দুপুর পেরিয়ে গেছে, গরমে ভাজা ভাজা হয়ে যাচ্ছে শরীর। রোয়েনকে নিকোলাস ইংরেজিতে বলল, মুকুটে টাইটার সিরামিক সম্পর্কে তামের কিছু জানলেও জানতে পারে, আপনি ওকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।
প্রথমে অন্য প্রসঙ্গে আলাপ জুড়ল রোয়েন, মাঝে মধ্যে তামেরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর জিজ্ঞেস করলো, ওটা কী, প্রধান পুরোহিতের মুকুটে নীল পাথরটা?
সেইন্টের পাথর ওটা, সেন্টফুমেনটিয়াসের প্রধান পুরোহিত বলেন, যিশুর মতোই পুরানো ওটা।
কোত্থেকে এলো ওটা, জানো তুমি?
মাথা নাড়লো তামের। বোধহয় আকাশ থেকে পড়েছে। তারপর হয়তো সেন্ট ফুমেনটিয়াস মারা যাবার সময় প্রধান পুরোহিতকে দিয়ে যান। কিংবা তার কফিনে ছিল, কবরে ঢোকানোর আগে বের করে নেওয়া হয়।
হ্যাঁ, হয়তো। তামের, তুমি সেন্ট ফুমেনটিয়াসের কবর দেখেছ?
ভয়ে ভয়ে চারদিকে চোখ বুলাল তামের, যেনো কোনো অপরাধ করে ফেলেছে। শুধু অধিকারী পুরোহিতদের মাকডাসে ঢোকার অনুমতি আছে, মাথা নিচু করে বিড়বিড় করলো সে।
তুমি দেখেছ, নরম সুরে অভিযোগ করলো রোয়েন, হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মাথায়। তামেরের সন্ত্রস্ত ভাব লক্ষ্য করে উৎসাহ বোধ করছে ও। আমাকে বলতে পারো, আমি কাউকে বলব না।
মাত্র একবার, স্বীকার করলো তামের। আমার বয়সী কয়েকটা ছেলে টাবট পাথরটা ছোঁয়ার জন্য জোর করে পাঠায় আমাকে। না গেলে ওরা আমাকে মারধর করত। প্রিস্টের সহকারী সব ছেলেকেই পাঠায় ওরা। ঘটনাটার কথা মনে পড়ে
যাওয়ায় তার চেহারা শুকিয়ে গেল। সাংঘাতিক ভয় পেয়েছিলাম। কেউ ছিল না, আমি একা। তখন মাঝরাত, পুরোহিতরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। চারদিক অন্ধকার। মাকডাসে তো সেইন্টের আত্মা ঘুরে বেড়ায়, তাই না? ওরা আমাকে বলে দিয়েছিল, আমি যদি অযোগ্য বা অপবিত্র হই তাহলে সেইন্ট আমার মাথায় বাজ ফেলবেন।
সেইন্টের কবর পর্যন্ত গেলে তুমি? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন। সমাধির ভেতরে ঢুকলে?
মাথা নাড়লো তামের। ঢোকার মুখে বার আছে। সেইন্টের জন্মদিনে শুধু প্রধান পুরোহিত ওখানে ঢুকতে পারেন।
তুমি তাহলে বারের ভেতর দিয়ে তাকালে?
হ্যাঁ, কিন্তু ভেতরটা অন্ধকার। সেইন্টের কফিন অবশ্য দেখা যাচ্ছিল। কাঠের কফিন, গায়ে পেইন্টিং আছে–সেইন্টের মুখ।
