দর্শকরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলো, তাদের উল্লাসধ্বনিতে কান পাতা দায়। আড়ষ্ট ভঙ্গিতে ওর সামনে নিচু হলেন মোহন্ত, হাঁটুর উপর ভর দিয়ে ঝুঁকলেন, আলিঙ্গন করলেন ওকে। তারপর আলিঙ্গন ঢিলে না করেই রোয়েনের পাশে নিজের জন্য জায়গা করে নিলেন তিনি। খেয়াল নেই, মাথার মুকুট পাশে গড়াচ্ছে।
মনে হচ্ছে আপনি ওঁর হৃদয় জয় করেছেন, শুকনো গলায় বলল নিকোলাস। আমার ভয় করছে, দৌড়ে না পালিয়ে যে কোনো মুহূর্তে উনি আপনার কোলে চড়ে বসতে পারেন।
দ্রুত প্রতিক্রিয়া হলো রোয়েনের। খপ করে কাটিকালার একটা বোতল তুলে নিয়ে মোহন্তের ঠোঁটে ঠেকালো। পান করুন! চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন জালি হোরা, তবে ওর হাত থেকে পান করার জন্য ওকে তাঁর ছেড়ে দিতে হলো। বোতল থেকে সরাসরি খানিকটা কাটিকালা পান করে ইঙ্গিত করলেন জালি হোরা, অর্থাৎ তিনি রোয়েনের হাত থেকে রুটি মাংস খেতে চাইছেন।
রোয়েন ইতস্তত করছে দেখে নিকোলাস বলল, বুড়োকে খুশি রাখতে পারলে ভবিষ্যতে কিছু সুবিধে পাওয়া যেতে পারে।
রুটি আর মাংস হাতে নিয়ে তাঁকে খাওয়াতে যাবে রোয়েন, হঠাৎ এমন চমকে উঠল যে হাতের রুটির-মাংস জালি হোরার কোলের উপর পড়ে গেল। থরথর করে কাঁপছে রোয়েন, যেনো প্রচণ্ড জ্বরে ভুগছে। চোখ দুটো বিস্ফারিত; তাকিয়ে আছে পাশে পড়ে থাকা মুকুটটার দিকে।
কী হলো? দ্রুত জানতে চাইলো নিকোলাস, তবে গলাটা চড়তে দেয় নি। হাত বাড়িয়ে রোয়েনের বাহু ধরে ফেললো। উপস্থিত কেউই ওর চমকে ওঠা লক্ষ্য করে নি। অপর হাতে বোতল ছেড়ে দিয়ে রোয়েনও নিকোলাসের বাহু খামচে ধরল, ওর আঙুলের শক্তি অনুভব করে বিস্মিত হলো নিকোলাস। শার্ট ভেদ করে ওর নখ চামড়া ছিঁড়ে ফেলছে। মুকুটটা দেখুন! ফিসফিস করলো রোয়েন, হাঁপাতে শুরু করেছে। পাথরটা। নীল পাথরটা!
কাচ ও স্ফটিকের পাথরগুলো সস্তাদরের, তবে ওগুলোর সঙ্গে মুকুটে অল্পদামী কিছু পাথরও আছে। একটা পাথর নীল, আকারে সিলভার ডলারের মতো, আসলে নীল সিরামিকের তৈরি সীল, পুরোপুরি গোল, তাপ দিয়ে কঠিন করা হয়েছে। চাকতির মাঝখানে একটা মিশরীয় রথ খোদাই করা ঘোড়া টানা রথ, সামরিক শকট। রথের উপর খোদাই করা হয়েছে ডানা ভাঙা বাজপাখি। চাকতির বৃত্তাকার কিনারা জুড়ে হায়ারোগ্লিফিক্স-এ লেখা হয়েছে দুটো বাক্য, পড়তে মাত্র কয়েক মুহূর্ত লাগলো নিকোলাসের,
আমি দশ হাজার রথের নেতৃত্ব দিই।
আমি টাইটা, রাজকীয় আস্তাবলের পরিচালক।
এখান থেকে এ মুহূর্তে বেরিয়ে যেতে পারলে বাঁচে রোয়েন। খাবার, তেজ আর ঘামের গন্ধে বমি পাচ্ছে ওর। ইতোমধ্যেই অনেক সন্ন্যাসী ঢলে পরেছে নিজ নিজ স্থানে।
কিন্তু এখনো মোহন্তের মূল আকর্ষণ ওর ওপর। অ্যামহারিক ভাষায় অনর্গল বলে যাচ্ছে, রোয়েনের খোলা হাতে চাপড় দিচ্ছে থেকে থেকে। এখন আর তার বক্তব্য অনুবাদ করে শোনাচ্ছে না টিসে। সাহায্যের আশায় নিকোলাসের উদ্দেশ্যে তাকালো রোয়েন; কিন্তু সেও মনে হচ্ছে ধ্যানমগ্ন। সম্ভবত, মুকুটটার কথাই ভাবছে।
চোখ ইশারায় বার্তা বিনিময় হলো, কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করা চলবে না। ব্যাপারটা নিয়ে এখুনি আলোচনা করা দরকার, কিন্তু এখান থেকে পালাবে কীভাবে? এ সময় ওদেরকে সাহায্য করলো বোরিস, হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লো মাতালটা, সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়েও পড়লো। টলতে টলতে এগিয়ে এলো টিসে, সে-ও মাতাল হতে চলেছে, নিকোলাসকে জিজ্ঞেস করলো, অল্টো নিকোলাস, এখন আমি কী করব?
কথা না বলে দাঁড়ালো নিকোলাস, এগিয়ে এসে বোরিসকে কাঁধে তুলে নিল। পালাবার এ সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ! বলল ও, যদিও পুরোহিত বা সন্ন্যাসীদের মধ্যে সাড়া দেয়ার মতো কাউকে পাওয়া গেল না। চাতালে বেরিয়ে এলো নিকোলাস, ওর পিছু নিয়ে মেয়ে দু জনও। কোথাও না থেমে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে ওরা।
আমার ধারণা ছিল না অল্টো নিকোলাসের শরীরে এতো শক্তি! হাঁপাচ্ছে টিসে, কারণ ধাপগুলো খুব উঁচু আর সিঁড়িটাও খুব লম্বা।
আমারও তো ধারণা ছিল না, বলল রোয়েন, নিজেও বলতে পারবে না কথার সুরে কী কারণে গর্ব প্রকাশ পেল। ছেলেমানুষি কোরো না, নিজেকে চোখ রাঙাল, তোমার কেউ হয় না ও!
কুঁড়েঘরে ঢুকে বোরিসকে তার বিছানায় ছুঁড়ে দিল নিকোলাস, হাপরের মতো হাঁপাচ্ছে, ঘামছে দরদর করে। তার কাছে টিসেকে রেখে রোয়েনকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলও।
আপনি দেখেছেন…? উত্তেজিত গলায় শুরু করলো রোয়েন, তবে ঠোঁটে আঙুল রেখে ওকে চুপ করিয়ে দিল নিকোলাস। রোয়েনের ঘরে চলে এলো ওরা। দেখেছেন আপনি? আবার জানতে চাইলো রোয়েন। পড়তে পেরেছেন?
আমি দশ হাজার রথের নেতৃত্ব দিই, বলল নিকোলাস।
আমি টাইটা, রাজকীয় আস্তাবলের পরিচালক, বাকিটুকু পূরণ করলো রোয়েন। সে এখানে এসেছিল! ওহ্ নিকোলাস! টাইটা এখানে এসেছিল। এ প্রমাণটাই খুঁজছিলাম আমরা। এখন আমরা জানি অযথা সময় নষ্ট করছি না! নিজের বিছানায় ধপ করে বসে পড়লো। আপনার কী ধারণা, প্রধান পুরোহিত সীলটা পরীক্ষা করতে দেবেন?
মাথা নাড়লো নিকোলাস। মনে হয় না। মুকুটটা মঠের মূল্যবান ধর্মীয় সম্পদ। আপনাকে তার খুব ভালো লাগলেও, দেখতে দেবেন বলে মনে হয় না। তবে, বেশি আগ্রহ দেখানো চলবে না। ওটার তাৎপর্য সম্পর্কে জালি হোরার কোনো ধারণা নেই। তাছাড়া, আমরা চাই না বোরিস কিছু টের পাক।
