রোয়েন বোতলটা মুখের সামনে তুলতেই উল্লাসে ফেটে পড়লেন সন্ন্যাসীরা। বোতল নামিয়ে নিকোলাসকে রোয়েন বলল, স্বাদটা তো দারুণ। মদ কোথায়, এতো মধু।
মদ না খাবার প্রতিজ্ঞা ভেঙে ফেললেন? হেসে উঠে জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস।
মাত্র এক ফোঁটা, স্বীকার করলো রোয়েন। তাছাড়া কে বলল আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম খাব না?
অতিথিদের সামনে গরম পানি ভর্তি একটা করে পাত্র রাখা হলো, হাত ধোয়ার জন্য। ভোজন পর্ব শুরু হতে যাচ্ছে। হঠাৎ ড্রামের শব্দ শোনা গেল, তারপর ভেসে এলো নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ। কিড্ডির খোলা দরজা ভরাট করে তুললো বাদ্যযন্ত্রীদের একটা দল। চেম্বারের একদিকের দেয়াল ঘেঁষে আসন গ্রহণ করলো তারা।
অবশেষে প্রাচীন প্রধান পুরোহিত জালি হোরা ধাপের মাথায় উদয় হলেন। রক্তলাল সাটিনের লম্বা আলখেল্লা পরে আছেন, দুই কাঁধে সোনালি সুতো দিয়ে এমব্রয়ডারির কাজ করা। মাথায় পরেছেন প্রকাণ্ড এক মুকুট। সোনার মতো চকচক করলেও নিকোলাস জানে ওটা আসলে পালিশ করা পিতল, আর বহুরঙা পাথরগুলো কাঁচ।
হাতের দণ্ড উঁচু করলেন প্রধান যাজক, সেটার মাথায় রুপোর কাজ করা ক্রস। সমস্ত কোলাহল থেমে গিয়ে বিশাল গুহার ভেতর অটুট নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
দীর্ঘ সময় নিয়ে ঈশ্বরের অনুগ্রহ প্রার্থনা করলেন জালি হোরা। প্রার্থনা শেষ হতে দু জন তরুণ উপাসক ধাপের নিচে নামতে সাহায্য করলো তাঁকে। বয়োবৃদ্ধ পুরোহিতরা হৃৎপিণ্ড আকৃতির একটা বৃত্ত রচনা করে বসেছেন, সেই বৃত্তের মাথায় তিনি তাঁর প্রাচীন জিম্মেরা চৌকিতে বসলেন। এরপর চাতাল থেকে মিছিল নিয়ে ভেতরে ঢুকলো তরুণ উপাসকরা, প্রত্যেকের মাথায় নলখাগড়ার তৈরি ঝুড়ি, আকারে গরুর গাড়ির চাকার মতো। অতিথিদের প্রতিটি বৃত্তের সামনে একটা করে নামিয়ে রাখা হলো।
প্রধান যাজকের সঙ্কেত পেয়ে সব কয়টা ঝুড়ির ঢাকনি একযোগে ভোলা হলো। আনন্দে হৈ-চৈ করে উঠলেন সন্ন্যাসীরা। প্রতিটি ঝুড়িতে একটা করে পিতলের গামলা রয়েছে, হাতে বেলা গোল ময়দার ইনজেরা রুটি, গভীর গামলার কিনারা পর্যন্ত ভরাট হয়ে আছে। আরো একদল উপাসক ঢুকলো, ভারি পিতলের গামলা বয়ে আনতে বারোটা বাজছে তাদের, টলমল করছে পা। মরিচ আর এলাচের গন্ধে ভারী হয়ে উঠলো বাতাস। এ গামলাগুলো থেকে ধোয়া উঠছে, ভেতরে রান্না করা খাসীর মাংস।
পুরোহিত আর সন্ন্যাসীরা রুটি ও মাংসের উপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, দেখে মনে হলো হিংস্র কোনো প্রাণী শত্রু নিধনে মেতে উঠেছে। আহার পর্ব মাত্র শুরু হয়েছে, উপাসকরা পরিবেশন করলো ড্রাম ভর্তি তেজ। খাবে কি, হাঁ করে তাকিয়ে আছে নিকোলাস। পুরোহিত ও সন্ন্যাসীরা মুখ খোলার পর তা আর বন্ধ করছে না, এক হাতে যতটুকু ধরে ভেতরে ভরছে মাংস আর রুটি, না চিবিয়ে ঢক ঢক করে তেজ ঢেলে নামিয়ে দিচ্ছে গলা দিয়ে, এভাবে বিরতিহীন চালিয়ে যাচ্ছে। মাংসের গামলা খালি হয়ে আসায় নিকোলাস ভাবল এবার বোধহয় নোংরা দৃশ্যটা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। কিন্তু না, তরুণ উপাসকরা এরপর নিয়ে এলো আস্ত মুরগির রোস্ট।
নিকোলাস নির্দেশে কিছুই না খেয়ে রোয়েন ভান করছিল প্রচুর খাচ্ছে, হঠাৎ ম্লান গলায় বলল, আমার অসুস্থ লাগছে।
চোখ বন্ধ করে ইংল্যান্ডের কথা ভাবুন, পরামর্শ দিল নিকোলাস। এ উৎসবের আপনিই স্টার। ওরা আপনাকে পালাতে দেবে না।
তারপর শুরু হলো চিৎকার, কাটিকালা! কাটিকালা! পুরোহিত বা সন্ন্যাসী, কেউ থামছেন না। উপাসকরা ছুটে বেরিয়ে গেল চাতালে, খানিক পর ফিরে এলো ডজন ডজন বোতল আর চায়ের কাপ নিয়ে। স্থানীয় লোকজনকে অবজ্ঞা যতোই করুক, খাওয়া-দাওয়া শুরু হওয়ার পর দেখা গেল খাদ্যগ্রহণের প্রতিযোগিতায় পুরোহিত আর সন্ন্যাসীদের সঙ্গে জোর পাল্লা দিচ্ছে বোরিস। শুধু তাই নয়, প্রতিযোগিতায় সে-ই জিতছে বলে মনে হলো। ওরা দেখলো তরুণ উপাসকরা তার পিঠ চাপড়ে উৎসাহ দিচ্ছে। কাটিকালা আসার পর দেখা গেল, চোখের পলক না ফেলে বোতলের পর বোতল খালি করে ফেলছে বোরিস।
তারপর এক সময় প্রধান পুরোহিতের চোখে নিকোলাস আর রোয়েনের ফাঁকিবাজি ধরা পড়ে গেল। তেজ আর কাটিকালা খেয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন তিনি, দাঁড়াবার পর টলছেন, এলোমেলো পা ফেলে এগিয়ে আসছেন সরাসরি রোয়েনের দিকে, হাতে মাংস ভরা বিশাল এক রুটি টকটকে লাল ঝোল ঝরছে তা থেকে।
তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে ভয়ে কুঁকড়ে গেল রোয়েন। উপস্থিত সবাই তাকিয়ে আছে ওর দিকে। নিকোলাসের বাহু খামছে ধরল রোয়েন। না! প্লিজ, না। বাঁচান আমাকে, নিকোলাস। আমি আপনার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকব, প্লিজ…
প্রধান অতিথি হওয়ার মাসুল দিতে হবে না? হাসলো নিকোলাস।
নাটকীয় আবহ তৈরি হলো। হঠাৎ করে ব্যান্ড পার্টির সদস্যরা একযোগে বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শুরু করায়। পবিত্র উপহার হাতে নিয়ে রোয়েনের সামনে হাজির হলেন মোহন্ত। উপস্থিত পুরোহিত আর সন্ন্যাসীরা রুদ্ধদ্বাসে অপেক্ষা করছেন। নিয়তির অমোঘ বিধান কী করে এড়ায় রোয়েন, অগত্যা চোখ বুজে হাঁ করতে হলো ওকে।
উৎসাহদায়ক গর্জন, করতালি ও বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত ঐকতানের মধ্যে প্রাণপণে চিবিয়ে যাচ্ছে রোয়েন। ওর মুখ গোলাপি হয়ে উঠলো, চোখ বেয়ে দর দর করে পানি ঝরছে। এক পর্যায়ে নিকোলাসের মনে হলো পরাজয় মেনে নিয়ে সবটুকু উগরে দেবে ও। তবে না, ধীরে ধীরে, সাহসের সঙ্গে, প্রতিবার একটু একটু করে, গিলে ফেললো মুখের খাবার। তারপর নেতিয়ে পড়লো।
