আমরা যখন এগুতে পারছি না, ধরে নিতে হবে টাইটাও পারে নি।
ঝুলন্ত ব্রিজের কাছে ফিরে এসে একটা ছায়া খুঁজে নিল ওরা, ওখানে বসে লাঞ্চ খেলো। গরমে সেদ্ধ হবার অবস্থা। নদীর পানিতে রুমাল ভিজিয়ে মুখ মুছলো রোয়েন। চিৎ হয়ে শুয়ে লালচে-গোলাপি প্রাচীর দেখছে নিকোলাস, চোখে আঁটা বাইনোকুলার। মসৃণ চকচকে সারফেসে কোনো ফাটল আছে কিনা খুঁজছে। চোখ থেকে বাইনোকুলার না নামিয়েই কথা বলছে ও। রিভার গড পড়ে জানা যায়, মিশরের সাহসী সিংহ অর্থাৎ ট্যানাস আর ফারাও-এর লাশ অদলবদল করার জন্য লোকজনের সাহায্য নিতে হয়েছিল টাইটাকে। বাইনোকুলার সরিয়ে রোয়েনের দিকে তাকালো। ব্যাপারটা আমার কাছে বিস্ময়কর লেগেছে। কারণ ওই যুগে মানুষ এ ধরনের কাজ করতে ভয় পেত। ভাবছি, স্ক্রোলের অনুবাদে কোনো ভুল হয় নি তো? টাইটা কি সত্যি লাশ বদলাবদলি করেছিল?
হেসে উঠে নিকোলাসের দিকে কাত হলো রোয়েন। আপনার প্রিয় লেখক উইলবার স্মিথ এখানে কল্পনাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। গল্পের এ অংশটুকু তিনি একটা মাত্র বাক্যের উপর ভিত্তি করে লিখেছেন। বাক্যটি হলো, আমার কাছে সে ছিল যে কোনো ফারাও-এর চেয়ে মহান নেতা। আবার চিৎ হলো রোয়েন। সেজন্যই বইটার এতো সমালোচনা করি। আমি যতটুকু জানি বা বিশ্বাস করি, ট্যানাস তাঁর নিজের সমাধিতে আছেন, তেমনি ফারাও-ও আছেন নিজের সমাধিতে।
দুত্তোর! হতাশ গলায় নিকোলাস বলে। ওই রোমান্টিক অংশটা সত্যি আমার খুব প্রিয় ছিল। হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে, চলুন, উপত্যকার বাকি অংশেও একটু খুঁজে দেখতে চাই। গতকাল বেশ চমৎকার একটা জায়গা দেখলাম।
শেষ বিকেলের দিকে ক্যাম্পে ফিরল ওরা। কিচেন থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে ওদেরকে অভ্যর্থনা জানালো টিসে। হাঁপাচ্ছে সে। কখন ফিরবেন তার অপেক্ষায় ছিলাম। জালি হোরা তিমকাতে উৎসবে দাওয়াত দিয়েছেন আমাদের। ওইজিরো রোয়েন তাঁর প্রধান অতিথি। গরম পানি রাখা আছে, এখুনি গোসল করে তৈরি হয়ে নিন। তা না হলে মঠে পৌঁছতে দেরি হয়ে যাবে।
*
ভোজের কক্ষে ওদেরকে নিয়ে যাবার জন্য প্রধান পুরোহিত একদল তরুণ উপাসককে পথ প্রদর্শক হিসেবে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তারা এলো গোধূলি পার করে, প্রত্যেকের হাতে একটা করে জ্বলন্ত মশাল। তাদের মধ্যে তামেরও আছে, প্রথমে চিনতে পারলো রোয়েন। তার দিকে তাকিয়ে হাসি দিতে লজ্জায় জড়সড় ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো সে, নদীর ধার থেকে কুড়িয়ে আনা বুনো ফুলের একটা গোছা বাড়িয়ে ধরল রোয়েনের দিকে। প্রস্তুত ছিল না রোয়েন, কিছু না ভেবেই আরবিতে ধন্যবাদ দিল তাকে।
শুকরান!
তাফাদ্দালি!
রোয়েনকে অবাক করে দিয়ে তামেরও পাল্টা ধন্যবাদ জানালো ওই আরবিতেই।
তুমি এতো ভালো আরবি বলো কী করে? রোয়েন জানতে চায়। আমার মা লোহিত সাগরের ওদিক থেকে এসেছে। আরবি আমার মায়ের ভাষা।
মঠের উদ্দেশে ওরা যখন রওনা হলো, ভক্ত কুকুরছানার মতো রোয়েনের পিছু নিল তামের।
পাহাড়-প্রাচীরের মাথা থেকে আরেকবার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো ওরা, বেরিয়ে এলো জ্বলন্ত মশাল ঘেরা চাতালে। গাছপালায় ছাওয়া সরু উদ্যান-পথ লোকজনে ঠাসা, ভিড় সরিয়ে ওদের জন্য পথ তৈরি করলো তরুণ উপাসকরা। তীর্থযাত্রীরা কি ভাবল কে জানে, অ্যামহ্যারিক ভাষায় স্বাগত জানালো ওদেরকে, হাত লম্বা করে ছুঁয়ে দিচ্ছে।
নিচু প্রবেশপথ পেরিয়ে গির্জার বাইরের অংশে পৌঁছল ওরা। আজো মনে হলো মশাল আর ল্যাম্পের অনিশ্চিত আলোয় দেয়ালচিত্রের চরিত্রগুলো নাচছে। মেঝেতে নলখাগড়া দিয়ে তৈরি কার্পেট ফেলা হয়েছে, পায়ের উপর পা তুলে তাতে বসে আছেন সন্ন্যাসীরা, মনে হলো সবাই তারা এখানে উপস্থিত। গলা চড়িয়ে তারাও ওদেরকে অভ্যর্থনা জানালেন। বসা সন্ন্যাসীদের প্রত্যেকের পাশে একটা করে বোতল, তাতে মধু মিশিয়ে তৈরি করা স্থানীয় মদ তেজ। হাসিখুশি সন্ন্যাসীদের চকচকে চেহারা দেখে বোঝা যায়, এরই মধ্যে ভালো সার্ভিস দিয়েছে বোতলগুলো।
নিকোলাসের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করলো টিসে, আমি চেখে দেখবো, তারপর আপনি খাবেন। স্থান বিশেষে এ মদের রঙ, স্বাদ ও শক্তি বদলে যায়। বড় গামলা বা পিপে থেকে পরিবেশন করা হচ্ছে, একেকটার ধরন একেকরকম। নিজের বোতল থেকে সরাসরি পান করলো সে। এটা ভালোই। বেশি না খেলে আপনার কোনো অসুবিধে হবে না।
ওদের চারপাশে বসা সন্ন্যাসীরা পান করা জন্য সাধাসাধি করছে, বাধ্য হয়েই নিজের বোতলটা ধরতে হলো নিকোলাসকে। হালকা ও মিষ্টি একটা স্বাদ পেল ও, মধুর পরিমাণ খুব বেশি বলেই হয়তো মদ বলে মনে হলো না। ভালোই তো!
কিন্তু সাবধান, বলল টিসে। তেজের পর নিশ্চয়ই ওরা আপনাকে কাটিকালা সাধবে। কাটিকালা চোলাই করা কড়া মদ, খেলে নিজেকে সামলাতে পারবেন না, ওটা আপনার ঘাড় থেকে মুণ্ডুটা আলাদা করে ফেলবে।
সন্ন্যাসীরা এবার রোয়েনের যত্ন-আত্তির দিকে নজর দিয়েছেন। ও যে কপটিক খ্রিস্টান, এটা তাদেরকে প্রভাবিত করেছে। সন্দেহ নেই, ওর রূপ-যৌবনও পবিত্র ও
সংযমী চিরকুমারদের চিত্তচাঞ্চল্য ঘটিয়েছে কিছুটা।
রোয়েনের কানে কানে নিকোলাস বলল, বোতলটা ঠোঁটে তুলে ভান করুন খাচ্ছেন। তা না হলে ওঁরা আপনাকে শান্তিতে থাকতে দেবেন না।
