ওরা এমন কি কিড়ি বা মিডল চেম্বারেও ঢুকতে দেবেন না, জানালো টিসে। ওই চেম্বারের সামনে মাকডাস–হোলি অব হোলিস।
উঁকি দিয়ে প্রহরী যাজকদের পেছনে তাকালো ওরা, মিডল চেম্বারের ভেতর দিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ পবিত্র স্থানটার দরজাই শুধু দেখা গেল।
মাকডাসে শুধু ভারপ্রাপ্ত পুরোহিতরা ঢুকতে পারেন কারণ, ওখানে ট্যাবট আছে, আর আছে সেইন্টের সমাধিতে ঢোকার দরজা।
মন খারাপ করে, গুহা থেকে বেরিয়ে চাতাল ধরে নেমে এলো ওরা।
*
তারা ভরা আকাশের নিচে বসে রাতের খাবার খেলো দলটা। বাতাসে এখনো দম আটকানো গরম। নাগালের ঠিক বাইরে মেঘের মতো ঝুলে আছে ঝক ঝক মশা। কাপড়ের বাইরে চামড়ায় রিপেলন্ট মেখেছে ওরা, তা না হলে রক্ষা ছিল না।
এবার বলুন, বিশিষ্ট ভদ্রলোক। যেখানে আসতে চেয়েছিলেন সেখানে আপনাকে আমি পৌঁছে দিয়েছি। অত দূর থেকে যে প্রাণীর সন্ধানে এলেন, বলুন সেটা কোথায় খুঁজবেন।
ভোরে ট্র্যাকারদের ভাটির দিকে পাঠাবেন, জবাব দিল নিকোলাস। সব ডিক-ডিকের পায়ের ছাপ একই রকম বলে আমার ধারণা। ছাপ চোখে পড়লে কাছাকাছি লুকিয়ে থাকতে হবে। ডিক-ডিক নিজেদের এলাকা ছেড়ে কোথাও যায় না। অপেক্ষা করলে দেখতে পাবে। আর দেখতে পেলে আমাকে খবর দেবে।
মায়ের কাছে মাসির গপ্পো–আমাকে শেখায়, কী করতে হবে! একটা গ্লাসে ভদকা ঢেলে নেয় বোরিস।
ঠিক আছে, ট্র্যাকারদের পাঠালাম। কিন্তু আপনি কী করবেন? মেয়েদের নিয়ে ক্যাম্পে থাকবেন? তির্যক দৃষ্টি হেনে হাসলো বোরিস। মেয়েরা আপনার সেবা-যত্ন করলে আমার কোনো আপত্তি নেই।
চেহারায় অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়ালো টিসে, রান্নাবান্নার তদারক করার কথা বলে কিচেনের দিকে চলে গেল। বোরিসের ইঙ্গিতটা গায়ে মাখল না নিকোলাস। বলল, ডানডেরার পাশে ঝোঁপের ভেতর কাজ করব আমরা। ওদিকে ডিক-ডিক থাকতে পারে। আপনার লোকদের নদীর ওদিকে যেতে নিষেধ করে দেবেন। আমি চাই না শিকারের সময় কেউ ডিসটার্ব করুক।
পরদিন ভোরের আলো ভালো করে ফোঁটার আগেই ক্যাম্প ত্যাগ করলো ওরা, সঙ্গে রাইফেল ও হালকা খাবার নিয়েছে। ডানডেরার পাশে এসে ঝোঁপের ভেতর দিয়ে হাঁটছে নিকোলাস, পেছনে রোয়েন। কয়েক পা এগিয়ে একবার করে থামলো, কান পেতে শুনছে। ডালে ডালে প্রচুর পাখি; ঝোঁপের ভেতর খুদে প্রাণীদের সংখ্যাও কম নয়। ইথিওপিয়ানরা শিকারে খুব একটা অভ্যস্ত নয়, বলল নিকোলাস। আর খাদের ভেতর সন্ন্যাসীরাও বোধহয় অভ্যস্ত নয়, বলল নিকোলাস। তারাও বোধহয় ওয়াইল্ডলাইফকে বিরক্ত করে না। হাত তুলে হরিণের পায়ের ছাপ দেখালো। এগুলো বুশবাকের ছাপ। ট্রফি হিসেবে সাংঘাতিক লোভনীয়।
আপনি কি সত্যি সত্যি ডোরাকাটা ডিক-ডিক পাবেন বলে আশা করেন?
আরে না। নিকোলাস হাসে। মনে হয়, বুড়ো দাদা ডিক-ডিকের গপ্পোটা বানিয়ে বলেছিল। আমরা, হারপার পরিবার মাঝে মধ্যে সত্যের অপলাপ করি বৈকি।
উঁচু গাছের ডালে একটা সানবার্ডকে বসে থাকতে দেখলো ওরা, পালকগুলো পান্না বসানো টায়রার মতো ঝলমল করছে। ঘাড় ফিরিয়ে পেছনটা দেখে নিল নিকোলাস, তারপর পড়ে থাকা একটা গাছের গুঁড়িতে বসে রোয়েনকেও বসতে ইঙ্গিত করলো। ডিক-ডিক খোঁজার অজুহাতে সবার চোখের আড়ালে এভাবেই পালিয়ে আসতে হবে। এখন বলুন, আসলে ঠিক কী খুঁজব আমরা।
একটা সমাধির অবশিষ্ট, কিংবা কোনো গোরস্থানের ধ্বংসাবশেষ, যেখানে ফারাও মামোসের সমাধি তৈরি করার সময় শ্রমিকরা বসবাস করত।
ইট বা পাথরের যে কোনো কাজ, সায় দিল নিকোলাস। বিশেষ করে স্তম্ভ বা মনুমেন্ট।
টাইটার স্টোন টেস্টামেন্ট। মাথা ঝাঁকালো রোয়েন। গায়ে হায়ারোগ্লিফিকস খোদাই করা থাকবে। হয়তো রোদ-বৃষ্টিতে ম্লান হয়ে গেছে, খসে পড়েছে, কিংবা ঢাকা পড়েছে ঝোঁপের ভেতর আমি জানি না।
এখানে আমরা বসে আছি কেন? চলুন মাছ ধরি।
বেলা এগারোটার দিকে নদী তীরে একটা ডিক-ডিকের ছাপ দেখলো নিকোলাস। বড় একটা গাছের বেরিয়ে থাকা শিকড়ের তলায় লুকাল ওরা, নড়াচড়া না করে চুপচাপ বসে থাকলো। কিছুক্ষণ পর খুদে প্রাণীগুলোর একটাকে দুএক মুহূর্তের জন্য দেখতে পেল। ওদের সামনে দিয়ে চলে গেল সেটা, গাছের গুঁড়ির মতো গুঁড়টা নাড়ছে, মানবশিশুর টলমল করা পায়ের মতো খুব ফেলছে জমিনে, নিচু একটা ডাল থেকে পাতা ছিঁড়ল, ব্যস্তভাবে চিবাল। তবে গায়ের ইউনিফর্মটা ধূসর, কোনো রকম দাগ নেই।
ওটা অদৃশ্য হতে উঠে দাঁড়ালো নিকোলাস। বিস্ময়কর কিছু নয়, বিড়বিড় করলো। চলুন অন্যদিকে যাই।
দুপুরের খানিক পর এমন একটা জায়গায় পৌঁছল ওরা, পাহাড় প্রাচীরের রঙ যেখানে গোলাপি-লালচে মাংসের মতো। এরকম একজোড়া প্রাচীরের মাঝখান দিয়ে গহ্বরের ভেতর বেরিয়ে এসেছে নদী। জায়গাটা যতদূর সম্ভব পরীক্ষা করলো ওরা, তারপর বাধা পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। পাথর এখানে সোজা নেমে এসেছে পানিতে, পানির কিনারায় এমন একটা গর্ত নেই যেখানে পা রাখা যায়।
ভাটির দিকে ফিরে এলো ওরা, আদ্যিকালের একটা ঝুলন্ত ব্রিজ ধরে নদী পেরুল। শুকনো লতানো গাছ আর শণ দিয়ে ব্রিজটা সম্ভবত সন্ন্যাসীরাই বানিয়েছেন। এপারে এসেও আরেকবার গহ্বরের ভেতর দিয়ে এগোবার চেষ্টা করলো ওরা। লালচে-গোলাপি পাঁচিল পথরোধ করে দাঁড়িয়েছে, সেটাকে এড়িয়ে এগুতে চেষ্টা করায় দেখা গেল স্রোত এতো জোরালো যে নিকোলাসকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হলো ওকে।
