সাদা আলখেল্লা পরা একদল সন্ন্যাসী ধাপ বেয়ে উঠে আসছিল, অল্প কিছুক্ষণ থেমে তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলো টিসে। তারা ওদেরকে পাশ কাটিয়ে উঠে যেতে সে বলল, তিমকাত উৎসবের আগের রাতটাকে কাটেরা বলা হয়। কাল উৎসব তো, আজ তাই সবাই খুব ব্যস্ত। তিমকাত খুব বড় ধর্মীয় উৎসব।
কিন্তু মিশরের চার্চ ক্যালেন্ডারে তো এ ধরনের কোনো উৎসবের উল্লেখ নেই, বলল রোয়েন।
এটা আসলে ইথিওপিয়ান ইপিফানি, যিশুর ব্যাপ্টিজম উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়, ব্যাখ্যা করলো টিসে। উৎসব চলার সময় নদীতে গিয়ে কিছু ধর্মীয় আচার অনুশীলন করা হবে, সমস্ত পাপ ধুয়ে-মুছে পবিত্রকরণের পর ব্যাপ্টিজমে দীক্ষা দেওয়া হবে তরুণ উপাসকদের, ঠিক যেভাবে ব্যাপ্টিস্টের হাতে দীক্ষা নিয়েছিলেন স্বয়ং যিশু।
খাড়া পাহাড় প্রাচীরের অবয়ব বেয়ে নেমে গেছে সিঁড়ির ধাপ, আবার ওরা সেটা ধরে নামতে শুরু করলো। শত শত বছর ধরে নগ্ন পা ফেলায় প্রতিটি ধাপ মসৃণ ডিশ-এ পরিণত হয়েছে। ওদের কয়েকশো ফুট নিচে নীল নদ হিসহিস আওয়াজ তুলে টগবগ করে ফুটছে, চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিপুল জলকণা।
হঠাৎ করেই চওড়া একটা চাতালে বেরিয়ে এলো ওরা, কঠিন পাথর কেটে মানুষই এটা তৈরি করেছে। মাথার উপর লাল পাথর ঝুলে আছে, তোরণশোভিত উদ্যানের উপর ছাদ হিসেবে কাজ করছে; খিলান আকৃতির পাথরের তোরণগুলো প্রাচীন মিস্ত্রীরা ছাদের অবলম্বন হিসেবে তৈরি করেছিল। ঢাকা ও লম্বা চাতালের ভেতর দিকের দেয়ালে অসংখ্য প্রবেশপথ, সামনের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে। যুগ যুগ ধরে পাহাড় প্রাচীরের গা কেটে অসংখ্য হল, সেল, চেম্বার, চার্চ ইত্যাদি তৈরি করা হয়েছে। নির্জনতা প্রিয় সন্ন্যাসীরা এখানে বসবাস করছেন হাজার বছরেরও বেশি দিন ধরে।
চাতালের দৈর্ঘ্য জুড়ে দলে দলে ভাগ হয়ে বসে আছেন সন্ন্যাসীরা একদিকে কিছু সন্ন্যাসী যাজকের ধর্মশাস্ত্র পাঠ শুনছেন।
এদের মধ্যে বেশিরভাগই নিরক্ষর, দীর্ঘশ্বাস ফেলে টিসে বলে। এমন কী বাইবেল পর্যন্ত পড়িয়ে বুঝিয়ে দিতে হয়!
এই হলো চার্চ অব কনস্ট্যানটিন, বাইজেন্টিয়াম সময়ের, নিকোলাস হাত উঁচু করে দেখায়। বাগানের ভেতর দিয়ে যাবার সময় আরেক দল সন্ন্যাসীকে দেখা গেল, সুর করে ধর্মীয় সঙ্গীত গাইছেন, অ্যামহ্যারিক ভাষায় লেখা। নানা গন্ধে ভারি হয়ে আছে বাতাস। জ্বালানি কাঠ আর ধূপের ধোঁয়া তো আছেই, আরো আছে ঘাম গরম নিঃশ্বাস, শোক, অসুস্থতার গন্ধ। সন্ন্যাসীদের সঙ্গে বসে রয়েছে তীর্থে আসার সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে তারা, অনেককেই অসুস্থ আত্মীয়-স্বজনকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে আসতে হয়েছে। সেইন্টের কাছে অনেক কিছু চাওয়ার আছে তাদের। কেউ তার ভোগান্তির অবসান চায়, কেউ ফিরে পেতে চায় সুস্থতা, আবার কেউ এসেছে পাপের শাস্তি মওকুফ করার আবেদন নিয়ে।
মায়ের কোলে অনেক অন্ধ ছেলেকে দেখা গেল। হাড় থেকে মাংস খসে পড়ছে এমন রোগীর সংখ্যাও কম নয়। তাদের আহাজারি ও গোঙানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে সন্ন্যাসীদের সুর করে গাওয়া প্রার্থনা সঙ্গীত আরো মিশছে প্রকাণ্ড কড়াইয়ের নিচ থেকে ভেসে আসা নীলনদের ফোঁসফোসানি।
এক সময় ওরা সেন্ট ফুমেনটিয়াস ক্যাথেড্রালের প্রবেশমুখে এসে পৌঁছালো। মাছের হাঁ করা মুখের মতো গোল একটা ফাঁক, তবে দরজার চারদিকের গায়ে চওড়া বর্ডারের উপর আঁকা হয়েছে নক্ষত্র, ক্রসচিহ্ন ও সেইন্টদের মাথা।
প্রবেশপথে সবুজ ভেলভেটের আলখেল্লা পরা একজন যাজক পাহারায় দাঁড়িয়ে আছেন। টিসে তাঁর সঙ্গে কথা বলার পর ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিলেন তিনি। চওড়া হলেও, দরজাটা নিচু, ঢোকার সময় মাথা নিচু করতে হলো নিকোলাসকে। ভেতরে ঢোকার পর মাথা উঁচু করে চারদিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল।
বিশাল গুহার ভেতর ছাদ এতো উপরে যে অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। পাথুরে দেয়াল। দেয়ালচিত্রে ঢাকা, ডানাবিশিষ্ট পরী আর দেব-দেবীদের ছবি আঁকা হয়েছে, মোমবাতি আর ল্যাম্পের কাঁপা কাঁপা আলো পড়ায় যেনো মনে হলো নড়াচড়া করছে। ছবিগুলো আংশিক ঢাকা পড়েছে পাঁচিলের উপর কারুকাজ করা লম্বা ব্যানার বা পর্দা ঝুলে থাকায়, কিনারার ঝালর জট পাকিয়ে গেছে, ছিঁড়েও গেছে কোথাও কোথাও। এরকম একটা ব্যানারে সেইন্ট মাইকেলকে দেখা যাচ্ছে, সাদা একটা ঘোড়া ছোটাচ্ছেন তিনি। আরেকটায় দেখা গেল ক্রস-এর পাদদেশে হাঁটু গেড়ে রয়েছেন ভার্জিন, তার উপরে যিশুর স্নান শরীর থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে, পাঁজরে গাঁধা রোমান বর্শা।
গির্জার এটা বাইরের অংশ।.দূর প্রান্তের দেয়ালে মিডল চেম্বারে ঢোকার দরজা। দরজা আসলে একজোড়া খোলাই রয়েছে। পাথরের মেঝে ধরে হেঁটে এলো ওরা তিনজন, হাঁটু গেড়ে প্রার্থনারত তীর্থযাত্রীদের পাশ কাটিয়ে। সবাই তারা হয় গান গাইছে, নয়তো কান্নাকাটি করছে, অনেককেই দেখা গেল যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে। ধূপ-ধুনোর নীলচে ধোঁয়ায় অস্পষ্ট হয়ে আছে জায়গাটা।
তিনটি ধাপ পেরিয়ে ভেতরের দরজাগুলোর সামনে পৌঁছতে হয়, কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন আলখেল্লা পরা দু জন দীর্ঘদেহী যাজক, মাথায় লম্বা হেট, হেঁটের মাথা সমতল। তাঁদের একজন রাগের সঙ্গে কী যেনো বললেন টিসেকে।
