যেন কোনো দৈত্যের মুখ থেকে নর্দমা বেরিয়েছে, ফিসফিস করলো রোয়েন, তাকিয়ে আছে খিলান, ফাটল আর অদ্ভুত দর্শন পাথরের দিকে। ভাবছি টাইটা আর প্রিন্স মেমননের নেতৃত্বে প্রাচীন মিশরীয়রা এখানে যদি এসে থাকে, কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তাদের। প্রকৃতির এ অদ্ভুত খেয়াল নিশ্চয়ই তাদেরকে খুব নাড়া দিয়েছিল।
নীরবে রোয়েনের মুখ পরীক্ষা করে নিকোলাস। পবিত্র দৃষ্টিতে, বড়ো বড়ো গাঢ় চোখে তাকিয়ে মেয়েটা। হঠাৎ করেই কুয়েনটন পার্কে রাখা একটা পোর্টেটের কথা মনে পড়ে যায় নিকোলাসের। ভ্যালি অব দ্য কিংস থেকে উদ্ধার করা একজন রামেসিস আমলের রাজকুমারীর অবয়ব সেটা।
তাদের রক্ত আপনার শিরাতেও বইছে, বলল নিকোলাস। অবশ্যই তারাও আপনার মতো মুগ্ধ হয়েছিল।
নিকোলাসের হাত ধরল রোয়েন। আপনি আমাকে ভরসা দিন, নিকোলাস। বলুন এখানে আমার উপস্থিতি স্বপ্নের ভেতর ঘটছে না। বলুন আমরা যা খুঁজতে এসেছি তা অবশ্যই পাব। আমাকে নিশ্চয়তা দিন, হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে ডুরেঈদের আত্মাকে শান্তি দিতে পারব আমরা।
নিকোলাসের দিকে মুখ তুলে রেখেছে রোয়েন, উদ্ভাসিত মুখে চকচক করছে শিশির কণার মতো ঘাম। ওকে আলিঙ্গন করার প্রবল একটা ঝোঁক চাপল, ইচ্ছে হলো ভেজা ও ফাঁক হয়ে থাকা ঠোঁট জোড়ায় চুমো খায়। তার বদলে ঘুরে দাঁড়ালো নিকোলাস, ট্রেইল ধরে নেমে যাচ্ছে।
নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই নিকোলাসের, রোয়েনের দিকে তাকাতে সাহস পাচ্ছে না। খানিক পর পেছনে শব্দ হলো, পিছু নিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে রোয়েন। নিঃশব্দে নিচে নামছে ওরা, অন্যমনস্ক থাকায় ওদের সামনে হঠাৎ উন্মোচিত প্রাকৃতিক বিস্ময়ের জন্য প্রস্তুত ছিল না নিকোলাস।
ওরা দাঁড়িয়ে আছে উপখাদের অনেক উপরে, একটা কার্নিসে। ওদের নিচে লাল পাথর ভর্তি বিশাল এক কড়াই, পাঁচশো ফুট গভীর। কিংবদন্তীর অ্যাবের মূল্য প্রবাহ সবুজ খরস্রোত, লাফ দিয়ে পড়ছে ছায়াময় অতল গহ্বরে। সেটা এতো গভীর যে সূর্যের আলো নাগালো পায় না। ওদের পাশ থেকে ডানডেরা নদীর বিক্ষিপ্ত পানিও একই ভঙ্গিতে লাফ দিয়েছে, পানির পতনটা বকের সাদা পালকের মতো লাগছে দেখতে, খাদের ভেতরকার বাতাসে মোচড় খাচ্ছে ও ফুলছে। অতল গহ্বরে মিলিত হচ্ছে দুই প্রবাহ; বিপুল জলরাশি টগবগ করে ফুটছে, বিশাল ঢেউগুলো চুরমার হয়ে ফেনা তৈরি করছে, অবশেষে নিষ্ক্রমণের পথ খুঁজে পেয়ে সেদিকে ছুটে চলেছে অনিয়ন্ত্রিত প্রচণ্ড শক্তিতে।
বোট নিয়ে আপনি ওখানে গিয়েছিলেন? নিকোলাসের দিকে হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রোয়েন।
কম বয়েসে কত রকম বোকামি করে মানুষ, ক্ষীণ বিষণ্ণ হাসি নিকোলাসের ঠোঁটে, পুরানো স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়ায় হাতের রোম দাঁড়িয়ে গেল।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। এক সময় মৃদু গলায় রোয়েন বলল, উজানের দিকে আসার সময় টাইটা আর মেমনন কী ধরনের বাধার সামনে পড়েছিল, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। নিজের চারদিকে তাকালো ও। তারপর খাদের নিচের অংশটা দেখালো, পশ্চিম দিকটা। ওদের পক্ষে অবশ্যই উপখাদ ধরে আসা সম্ভব ছিল না। পাহাড়-প্রাচীরের চূড়াগুলো যে রেখা তৈরি করেছে, নিশ্চয়ই সেই রেখা ধরে আসে তারা সরাসরি এখান পর্যন্ত, যেখানে এ মুহূর্তে আমরা দাঁড়িয়ে রয়েছি। চিন্তাটা ওর গলায় উত্তেজনার ভাব এনে দিল।
জোর করে কিছুই বলা যায় না। তারা হয়তো নদীর ওপারে পৌঁছেছিল।
নিকোলাস ঠাট্টা করে বললেও রোয়েনের চেহারা ঝুলে পড়লো। এটা তো ভাবি নি। হ্যাঁ, তা সম্ভব বৈকি। নিকোলাস, এপারে যদি কোনো সূত্র না পাই ওপারে আমরা পৌঁছব কীভাবে?
যখনকার সমস্যা তখন দেখা যাবে।
আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো ওরা। যে কাজ নিয়ে এখানে আসা হয়েছে তার ব্যাপকতা ও বিশালত্ব কল্পনা করছে দু জনেই, উপলব্ধি করছে অনিশ্চয়তার মাত্রা। খানিক পর রোয়েনই আবার নিস্তব্ধতা ভাঙল, নিকোলাস, মঠটা কোথায়? আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
সরাসরি আমাদের পায়ের নিচে যে, দেখবেন কীভাবে।
ওখানে আমরা ক্যাম্প ফেলব?
সন্দেহ আছে। চলুন দেখি বোরিসকে ধরি, দেখি সে কী ভাবছে।
খাড়াইয়ের কিনারা ধরে ট্রেইল অনুসরণ করলো ওরা, খচ্চরগুলোকে ধরে ফেললো যেখানে দু ভাগ হয়ে ট্রাক। একটা পথ নদীর উল্টোদিক ধরে জঙ্গল ঢাকা নিচু জমিনে নেমে গেছে, অপরটা আগের মতোই কিনারার পাথরে ঝুলে আছে। ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল বোরিস, হাত তুলে নিচু জমিনে নেমে যাওয়া ট্র্যাকটা দেখালো সে। ওদিকে জঙ্গলের ভেতর ভালো একটা ক্যাম্পসাইট আছে। শেষবার শিকার করতে এসে ওখানে ছিলাম আমরা।
জঙ্গলে ঢুকে ফাঁকা একটা জায়গা পাওয়া গেল। কয়েকটা বুনো ডুমুর গাছ। থাকায় ছায়ার অভাব নেই। এক কোণের ছোট্ট একটা ঝরনা রয়েছে নির্মল পানি। বোঝা হালকা করার জন্য তাঁবুগুলো খাদে বয়ে আনে নি বোরিস। খচ্চরের পিঠ থেকে মালপত্র নামানো শেষ হতেই নিজের লোকদের তিনটা ছোট কুঁড়েঘর বানাবার হুকুম দিল সে। ঝরনার কাছ থেকে যথেষ্ট দূরে একটা ল্যাট্রিনও তৈরি করা হবে।
এ সব কাজ যখন চলছে, রোয়েন আর টিসেকে ডেকে নিল নিকোলাস, তিনজন রওনা হয়ে গেল মঠ দেখার জন্য। দুই ট্রাকের মুখে এসে দাঁড়ালো ওরা, তারপর টিসের নেতৃত্বে পাহাড়-প্রাচীরের কিনারা ঘেঁষা ট্রেইল ধরে এগুলো। খানিক পরই চওড়া এক প্রস্থ পাথুরে সিঁড়ি পাওয়া গেল, পাহাড়-প্রাচীরের মুখ বেয়ে নিচে নেমে গেছে।
