ভালো একটা গল্প শোনার আশায় চুপ হয়ে গেল সবাই, এমন কি মোহস্তের হাতের গ্লাসও মাঝপথে থেমে গেছে। ওটা তিনি দ্বিতীয় বোতল থেকে ভরেছেন।
জন দ্য ব্যাপ্টিস্ট খাদ্যের অভাবে মরুভূমিতে মারা যাচ্ছেন, শুরু করলো নিকোলাস। ত্রিশটা দিন ও ত্রিশটা রাত পেরিয়ে গেছে, এককণা খাবারও জোটেনি তাঁর। সেইন্টের নাম শুনে বুকে ক্রসচিহ্ন আঁকল কয়েকজন পুরোহিত। শেষে প্রভু তার ভৃত্যের প্রতি সদয় হলেন, ছোট একটা হরিণ আটকে দিলেন অ্যাকেইশা গাছের ডালে ও কাটায়। তারপর সেইন্টকে তিনি বললেন, তোমার জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করেছি, কাজেই তুমি মরবে না। এ মাংস নিয়ে খাও তুমি। জন দ্য ব্যাপ্টিস্ট যখন ছোট্ট প্রাণীটিকে স্পর্শ করলেন, ওটার পিঠে তার আঙুলের ছাপ পড়ে গেল চিরকালের জন্য।
সবাই চুপ। এতোই প্রভাবিত হয়েছে যে চোখের পাতা ফেলতেও ভুলে গেছে।
ফটোটা আরেকবার প্রধান পুরোহিতকে দেখালো নিকোলাস। দেখুন, সেইন্টের আঙুলের ছাপ আছে।
ফটোটা সশ্রদ্ধভঙ্গিতে হাতে নিলেন জালি হোরা, ভালো চোখটার সামনে তুললেন। বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর বিস্মিত গলায় বললেন, কথাটা সত্যি! সেইন্টের আঙুলের ছাপ পরিষ্কারই চেনা যায় ফটোটা তিনি পুরোহিতদের দেখার জন্য নিলেন। প্রত্যেকে দেখলেন, এবং প্রধান পুরোহিতের মন্তব্য পুনরাবৃত্তি করলেন।
আপনারা কেউ এ প্রাণীটিকে দেখেছেন কখনো? উত্তরে এক এক করে সবাই মাথা নাড়লেন। পুরোহিতদের দেখা শেষ, এখন সেটা তরুণ উপাসকরা দেখছে।
হঠাৎ তাদের একজন তড়াক করে সোজা হলো, ফটো হাতে লাফাচ্ছে আর উত্তেজনায় চিৎকার করছে। আমি দেখেছি, দেখেছি আমি! যিশুর ফিরে, পবিত্র এ প্রাণীরূপে দেখা দিয়েছে আমাকে! খুবই কম বয়েস তার, কিশোরই বলতে হবে।
বাকি সবাই নিন্দা করছে তার, কেউ বিশ্বাস করতে রাজি নয়।
মাথামোটা ছেলে, মাঝে মধ্যে শয়তান ভর করে, অভিমান সুরে বললেন জালি হোরা, দুঃখে কাতর দেখালো তাকে। ওর কথায় গুরুত্ব দেবেন না। বেচারা তামের!
ইতোমধ্যে তামেরের হাত থেকে ফটোটা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। উপাসকদের হাতে হাতে ঘুরছে সেটা, আর ফিরে পাবার জন্য ছুটাছুটি করছে সে। সবাই তার সঙ্গে কৌতুক করছে। কিন্তু তামের সাংঘাতিক উত্তেজিত, তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠেছে। বাধা দেওয়ার জন্য এগুলো নিকোলাস, দুর্বলচিত্তের এক কিশোরকে নিয়ে এ খেলাটা নিষ্ঠুর মনে হলো ওর। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে কিশোরের মনে কি ঘটল কে জানে, সটান পড়ে গেল সে জমিনের উপর, যেনো কেউ তার মাথায় মুগুরের বাড়ি মেরেছে। পিড়ানো ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে গেল, হাত-পা মোচড় ও ঝাঁকি খাচ্ছে, চোখের মণি উল্টে গিয়ে অদৃশ্য হলো খুলির ভেতর, শুধু সাদা অংশটুকু দেখা যাচ্ছে, ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে নামছে সাদা ফেনা।
তার কাছাকাছি নিকোলাস পৌঁছবার আগেই চারজন উপাসক চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে গেল তাকে। রাতের অন্ধকারে তাদের হাসির শব্দ মিলিয়ে গেল। বাকি সবার আচরণ দেখে মনে হলো অস্বাভাবিক কিছু ঘটে নি। জালি হোরা ইঙ্গিতে একজন তরুণকে আবার গ্লাসটা ভরে দিতে বললেন।
বেশ দেরী করে বিদায় নিলেন জালি হোরা, কয়েকজনের সহায়তায়। অর্ধ সমাপ্ত ব্রান্ডির বোতলটা এক হাতে আঁকড়ে ধরে রাখলেন।
আপনার ওপর সে খুশি হয়েছে, ইংরেজ, বোরিস বলল। জন দ্য ব্যাপ্টিস্ট এর গল্পটাতো বটেই, আপনার ডলার তার আরো বেশি পছন্দ!
৩. পরদিন সকালে আবার
পরদিন সকালে আবার যখন রওনা হলো ওরা, ট্রেইলটা বেশ কিছুদূর নদীর পাড় ঘেঁষে থাকলো। মাইলখানেক পর স্রোতের গতি খুব বেড়ে গেল, তারপর উঁচু ও লাল পাহাড়-প্রাচীরের মধ্যবর্তী সরু ফাঁকের ভেতর ঢুকে পড়লো, সেখান থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ছে অর্থাৎ এখানে আরেকটা জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়েছে।
বহুল ব্যবহৃত ট্রেইল ছেড়ে জলপ্রপাতের কিনারায় এসে দাঁড়ালো নিকোলাস। দুশো ফুট গভীরে পাথরের একটা ফাটলে তাকালো ও, আক্রোশে সংকুচিত ভয়াল প্রবাহকে কোনো রকমে গলে বেরিয়ে যেতে দেয়ার মতো চওড়া। ফাঁকটার ওপারে একটা পাথর ছুঁড়ে দিতে পারে নিকোলাস। নিচের ওই গহ্বরে কোনো পথ বা পা ফেলার জায়গা নেই। ফিরে এসে ক্যারাভ্যানের সঙ্গে যোগ দিল ও, ঘুরপথ ধরে নদীর কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ওরা, ঢুকে পড়েছে আরেকটা গভীর জঙ্গলে ঢাকা উপত্যকায়।
এটা বোধহয় এক সময় ডানডেরা নদীর কোর্স ছিল, ফাটলটার ভেতর নতুন পথ তৈরির আগে। পথের দু পাশে উঁচু জমিনের দিকে হাত তুললাম রোয়েন, তারপর ইঙ্গিতে ট্রেইলের উপর ছড়িয়ে থাকা মসৃণ বোল্ডারগুলো দেখালো।
নদীর গতি পথ বারবার বদলে যাওয়ায় গোটা এলাকায় ক্ষয় আর কাটাছেঁড়ার প্রচুর নমুনা দেখতে পাবেন। নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারেন, লাইমস্টোনের পাঁচিলগুলোয় গুহা আর ঝরনা গিজগিজ করছে।
ট্রেইল এখন দ্রুত নীল নদের দিকে নামছে, শেষ কয়েক মাইলে প্রায় পনেরোশো ফুট নিচে চলে এসেছে ওরা। উপত্যকার সাইডগুলো গাছপালায় ঢাকা, বহু জায়গায় দেখা গেল লাইমস্টোনের গা থেকে খুদে ঝরনার পানি অলসভঙ্গিতে পুরানো নদীর তলায় পড়ছে।
নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে গরমও বাড়ছে। আজ শার্ট পরেছে রোয়েন, ঘামে ওর শোল্ডার ব্লেডের মাঝখানটা ভিজে গেছে।
এ জায়গায় দেখা গেল ঘন জঙ্গলে মোড়া পাহাড়ের অনেক উঁচু থেকে স্বচ্ছ পানি নেমে আসছে, স্রোতটা চওড়া হয়ে রীতিমত ছোট একটা নদী হয়ে উঠেছে। তারপর উপত্যকার একটা কোণ ঘুরলো ওরা দেখতে পেল ওদের সঙ্গে এখানে স্রোতটাও মিলিত হয়েছে ডানডেরা নদীর মূল প্রবাহে। খাদের পেছন দিকে তাকিয়ে পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে একটা অকৃত্রিম সরু খিলান দেখতে পেল ওরা, ফাটলের ভেতর দিয়ে ওই খিলান হয়ে বেরিয়ে এসেছে নদী। ফাটল ও খিলানের চারধারে পাথরের রঙ অদ্ভুত লালচে-গোলাপি, পালিশ করা মসৃণ, ভজের উপর ভাঁজ খেয়ে আছে, ফলে রঙ ও আকৃতিতে মানুষের জোড়া ঠোঁটের মতো দেখতে হয়েছে।
