আশীর্বাদ পর্ব শেষ হতে এক একে চারদিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাতাসে ক্রসচিহ্ন আঁকলেন মোহন্ত, এ সময় চারজন কিশোর চারটে রূপোর ধূপদানি ঘোরাতে শুরু করলো দ্রুতবেগে, সবগুলো থেকে ধূপ-ধুনার ধোঁয়া বের হচ্ছে।
এরপর মেয়ে দু জন মোহন্তের সামনে এসে হাঁটু গাড়ল। ওদের দিকে ঝুঁকলেন তিনি, রূপোর ক্রস দিয়ে হালকা ভাবে প্রত্যেকের গাল স্পর্শ করলেন সুর করে আওড়ালেন বিশেষ আশীর্বাদ।
ফিসফিস করলো বোরিস, লোকে বলে এঁর বয়েস একশো দশ বা তারও বেশি।
সাদা আলখেল্লা পরা দু জন তরুণ উপাসক আফ্রিকান কালো আবলুস কাঠের তৈরি একটা টুল বয়ে নিয়ে এলো, ডিজাইনটা এতো সুন্দর যে লোভী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো নিকোলাস। ধারণা করলো, সম্ভবত কয়েক শতাব্দী ধরে মঠপ্রধানরা ওটা ব্যবহার করছেন। উপাসক দু জন জালি হোরার কনুই ধরল, ধীরে ধীরে যত্নের সঙ্গে বসিয়ে দিল তাঁকে টুলের উপর। এরপর পুরোহিতবৃন্দ ও সাধু সন্ন্যাসীরা ঘিরে বসলো তাকে, তাদের কালো মুখ তার দিকে উঁচু হয়ে আছে।
তাঁর পায়ের কাছে বসে আছে টিসে, স্বামীর কথা ইথিওপিয়ার অফিশিয়াল ভাষা অ্যামহারিক-এ অনুবাদ করছে। আপনাকে আবার অভ্যর্থনা জানাবার সুযোগ পেয়ে নিজেকে আমি ধন্য মনে করছি, হোলি ফাদার।
বৃদ্ধ প্রধান পুরোহিত মাথা ঝাঁকালেন। বোরিস আবার বলল, আমি বিশিষ্ট এক ভদ্রলোককে সেন্ট ফুমেনটিয়াস ভিজিট করাবার জন্য নিয়ে এসেছি। উনি আপনাকে, সন্তুষ্ট করবেন।
এ কি! প্রতিবাদ করলো নিকোলাস, কিন্তু দেখা গেল সাধু-সন্ন্যাসী আর পুরোহিতবৃন্দ প্রত্যাশায় চকচকে চোখ নিয়ে ওর দিকে ঝুঁকে পড়েছে। অগত্যা বাধ্য হয়ে ফিসফিস করে প্রশ্ন করতে হলো, এখন কী করতে হবে আমাকে?
বুঝতে পারছেন না, এতোটা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে কেন এসেছেন উনি? শয়তানি হাসি ফুটল বোরিসের ঠোঁটে, সে-ও ফিসফিস করছে উপহার চান! টাকা!
মারিয়া থেরেসা ডলার? জানতে চাইলো নিকোলাস, ইথিওপিয়ার এ মুদ্রা কয়েক শতাব্দী ধরে চলছে।
তা না হলেও ক্ষতি নেই। সময় বদলেছে, জালি হোরাকে এখন মার্কিন ডলার বা ব্রিটিশ পাউন্ড দিয়েও সন্তুষ্ট করা যায়।
কত?
আপনি বিশিষ্ট ভদ্রলোক। তাঁর উপত্যকায় শিকার করবেন। কমপক্ষে পাঁচশো ডলার।
ব্যাগ আছে খচ্চরের পিঠে, উঠে গিয়ে সেখান থেকে টাকা নিয়ে আসতে হলো নিকোলাসকে। ইতোমধ্যে হাত পেতেছেন পুরোহিতপ্রধান, তাতে নোটগুলো ধরিয়ে দিল ও।
হাসলেন মোহন্ত, ভাঙা ও হলুদ দাঁত বেরিয়ে পড়লো। তারপর তিনি কথা বললেন। অনুবাদ করলো টিসে, সেন্ট ফুমেনটিয়াস ও তিমকাত উৎসবে স্বাগতম। অ্যাবের তীরে আপনার শিকার অভিযান সফর হোক।
সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য খসে পড়লো। নড়েচড়ে বসলো সবাই, হাসাহাসি শুরু করলো। মোহন্ত বোরিসের দিকে তাকালেন, দৃষ্টিতে প্রত্যাশা। তাঁর কথা ভাষান্তর করলো টিসে, প্রধান পুরোহিত বলছেন, এতোটা পথ আসতে তাঁর গলা শুকিয়ে গেছে।
বুড়ো শয়তান ব্র্যান্ডি খেতে চাইছেন! হাসছে বোরিস হাঁক ছেড়ে ক্যাম্পবাটলারকে ডাকলো। একটু পরই ব্র্যান্ডির একটা বোতল মোহন্তের সামনে ক্যাম্প টেবিলে রাখা হলো, তার পাশেই থাকলো বোরিসের ভদকা। পরস্পরের স্বাস্থ্যপান করলো তারা। ব্র্যান্ডিতে কিছু মেশালেন না মোহন্ত, ঢোক গেলার পর সুস্থ চোখটা থেকে পানি বেরিয়ে এলো। বোতলটা অর্ধেক খালি করার পর খসখসে গলায় একটা প্রশ্ন করলেন, রোয়েনের দিকে তাকিয়ে।
টিসে বলল, ওইজিরো রোয়েন, উনি আপনাকে জিজ্ঞেস করছেন, ও আমার কন্যা, কে তুমি, কোত্থেকে এলে? মানবজাতির ত্রাণকর্তা যিশুর পথে কে তোমাকে নিয়ে এলো?
আমি একজন মিশরীয়, প্রাচীন ধর্মে বিশ্বাসী, জবাব দিল রোয়েন।
মাথা ঝাঁকাল মোহন্ত, পুরোহিতরাও সবাই প্রশংসাসূচক হাসি দিল। খ্রিস্টধর্মে সবাই আমরা ভাই-বোন, মিশরীয় ও ইথিওপিয়ানরা, মোহন্ত ওকে বললেন। এমন কি কপটিক শব্দটাও গ্রিক ভাষায় মিশরী। ষোলোশো বছরেরও বেশি দিন ধরে কায়রোর প্রধান গির্জার পুরোহিত ইথিওপিয়ার বিশপকে নিয়োগ দান করেছেন। ১৯৬০ ষালে সম্রাট হাইলে সেলাসি নিয়মটা বাতিল করেন। তবু আমরা সবাই যিশুর সত্যিকার পথ অনুসরণ করব। আপনাকে স্বাগতম, প্রিয় কন্যা।
ব্র্যান্ডির বোতল দ্রুত খালি হয়ে গেল। ইঙ্গিতে সেটা বোরিসকে দেখালেন মোহন্ত। বোরিস ইংরেজিতে বলল, শালার ব্যাটা এতো জায়গা পাচ্ছে কোথায় যে শুধু ঢেলেই চলেছে?
তার এ কথাও অনুবাদ করতে যাচ্ছিল টিসে, হঠাৎ খেয়াল হতে মাথাটা নিচু করে নিল সে। তারপর নিকোলাসের দিকে মুখ তুলে বলল, মোহন্ত জানতে চাইছেন, উপত্যকায় কি শিকার করতে চাইছেন আপনি?
নিজেকে শক্ত করলো নিকোলাস, তারপর জবাব দিল সাবধানে। অবিশ্বাসে দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। নিস্তব্ধতা ভাঙলেন প্রধান যাজক, খলখল করে হেসে উঠলেন তিনি। দেখাদেখি বাকি সবাইও হাসতে শুরু করলো। ডিক-ডিক? আপনি ডিক-ডিক শিকার করতে এসেছেন? কিন্তু তাহলে মাংস পাবেন কোত্থেকে?
পাহাড় চূড়ায় দাঁড়ানো ডোরাকাটা ডিক-ডিকের একটা ফটো নিয়ে এসে তাঁর সামনে শ্যাম্প টেবিলের উপর রাখলো নিকোলাস। এটা সাধারণ কোনো ডিক-ডিক নয়। এটা একটা পবিত্র ডিক-ডিক। ইঙ্গিতে টিসেকে অনুবাদ করতে বলল ও। গল্পটা বলছি আমি।
