বাঁকটার ঠিক নিচেই শ্যাওলা ঢাকা তীরে শুয়ে থাকলো নিকোলাস; কাছাকাছি, তবে দৃষ্টিসীমার বাইরে থেকে ভেসে আসা রোয়েনের পানি ছিটানো আর মৃদু হাসির শব্দ শুনছে। একবার মাথা ঘোরাবার পর উপলব্ধি করলো স্রোত নিশ্চয়ই রোয়েনকে ভাটির দিকে টেনে নিয়ে এসেছে। কারণ, গাছপালার ফাঁকে এক পলকের জন্য নগ্ন পিঠ দেখা গেল, তারপর নিতম্বের ভাঁজ–মাখনের মতো, ভেজা ও চকচকে। অপরাধবোধ জাগায় তাড়াতাড়ি চোখ ফেরালো নিকোলাস।
খানিক পর ভাটির দিকে থেকে তীর ধরে এগিয়ে আসতে দেখা গেল রোয়েনকে, কোমল সুরে গুন গুন করছে, চুলের পানি মুছছে তোয়ালে দিয়ে। আপনার পালা, নিকোলাস। যান আমি পাহারায় থাকি?
আমি এখন বড় হয়েছি। মাথা নাড়লো নিকোলাস, তবে রোয়েন পাশ কাটানোর সময় তার চোখে রক্তিম লজ্জা আর সেই সঙ্গে কৌতুকের ক্ষীণ ঝিলিক দেখতে পেল। হঠাৎ নিকোলাস ভাবল, রোয়েন কি জানে স্রোতের টানে কতটা ভাটির দিকে চলে এসেছিল সে, তার কতটুকু দেখে ফেলেছে ও? চিন্তাটা রোমাঞ্চিত করে তুললাম ওকে।
গোসল করার জন্য উজানে চলে এলো নিকোলাস। কাপড় খোলার সময় উপলব্ধি করলো রোয়েন ওকে কতটা উত্তেজিত করে তুলেছে। একটু যেনো অপরাধবোধের খোঁচা লাগলো–রোসেলিনের পর আর কোনো নারী ওকে জাগিয়ে তুলে নি এমন করে।
ঠাণ্ডা পানি উপকারে আসবে, বিড়বিড় করলো ও, তারপর ডাইভ দিল নদীতে।
*
সন্ধ্যার পরপরই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ক্যাম্পফায়ারের সামনে বসে আছে ওরা হঠাৎ মুখ তুলে কান পাতলো নিকোলাস। কিসের একটা আওয়াজ হচ্ছে না?
ঠিক ধরেছেন, হেসে উঠে বলল টিসে। আপনি গান শুনতে পাচ্ছেন। আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানাতে মঠের পুরোহিতরা আসছেন।
ঠিক তখনই আগুনের লাল শিখা দেখতে পেল ওরা, আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ ধরে উঠে আসছে মশালমিছিল, গাছপালার ভেতর দিয়ে ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে আসায় মিটমিট করছে আলোগুলো। খচ্চর চালক আর চাকর-বাকরেরা ভিড় করে সামনে বাড়লো, ছন্দোবদ্ধ গানের সঙ্গে তালি দিচ্ছে, স্বাগত জানাচ্ছে সম্মানিয় মঠ প্রতিনিধিদের।
ভারি ও গভীর পুরুষকণ্ঠ ক্রমশ চড়ছে, তারপর আবার ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে অস্পষ্ট ফিসফিসানি, তবে বাতাসে মিলিয়ে যাবার আগেই আবার চড়ছে, এভাবে বারবার। গানের কথাগুলো বোঝা গেল না, তবে সম্মিলিত কণ্ঠের প্রলম্বিত সুর হৃদয়কে দোলা দিয়ে যায়, আপনা থেকে ভক্তির একটা ভাব চলে আসে মনে। নিকোলাসের শরীর শিরশির করে উঠলো, হিম রোমাঞ্চ নেমে এলো শিরদাঁড়া বেয়ে।
তারপর দেখা গেল পুরোহিতদের সাদা আলখেল্লা, মশালের আলোয় দেওয়ালি পোকার মতো লাগছে, উঠে আসছে ট্রেইল ধরে। ক্যাম্পের সামনে খোলা জায়গায় সাধুদের দেখামাত্র ক্যাম্প সার্ভেন্টরা জমিনে হাঁটু গাড়ল। সামনের সারিতে রয়েছে অধস্তন তরুণ উপাসকরা, খালি পায়ে, খালি মাথায়। তাদের পিছু নিয়ে এলেন। সন্ন্যাসীরা, পরনে দীর্ঘ আলখেল্লা ও লম্বা পাগড়ি। কয়েক সারিতে এলেন তারা, তবে দু পাশে সরে গিয়ে পেছনটা ফাঁক করে দিলেন। সন্ন্যাসীরা আসলে এ মুহূর্তে মর্যাদাপূর্ণ প্রহরীর ভূমিকা পালন করছেন, তাঁদের ঠিক পেছনেই রয়েছেন নকশাদার আলখেল্লা ও অলঙ্কার পরিহিত যাজক বা পুরোহিতরা।
তাঁদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে ভারী কপটিক ক্রস, বসানো হয়েছে। রূপোয় মোড়া একটা দণ্ডের মাথায়। পুরোহিতদের সারিটাও দু পাশে সরে গেল আবেগমথিত সুরে এখনো তারা গানের মাধ্যমে ঈশ্বরের মহিমা কীর্তন করছেন, সরে গিয়ে চাঁদোয়া ঢাকা.পালকিটাকে সামনে এগোবার পথ করে দিলেন। চারজন তরুণ উপাসক বয়ে নিয়ে এলো সেটা; নামিয়ে রাখলো ক্যাম্পের ঠিক মাঝখানে। মশাল ও ক্যাম্প লণ্ঠনের আলোয় লাল আর হলুদ সিল্ক পর্দা ঝলমল করছে।
মোহন্তকে অভ্যর্থনা জানাতে সামনে এগুতে হবে, ফিসফিস করলো বোরিস। তাঁর নাম জালি হোরা। পালকির কাছাকাছি চলে এসেছ ওরা নাটকীয় ভঙ্গিতে। পর্দা সরিয়ে দীর্ঘকার এক ব্যক্তি মাটিতে পা রাখলেন।
রোয়েন ও টিসে সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে জমিনে হাঁটু গাড়ল, হাতজোড়া করলো বুকে। তবে নিকোলাস ও বোরিস নড়ল না। নিকোলাস বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে মোহন্ত বা প্রধান পুরোহিতের দিকে।
জালি হোরা কঙ্কাল বললেই হয়। তার আলখেল্লা ঢোলা হলেও তেমন লম্বা নয়, হাঁটুর নিচে পা, পাগড়ির মতো সুরু ও কালো, মোচড় খাওয়া পেশি ফুলে আছে, হাড়ের উপর ফুটে আছে আকা-বাঁকা শিরা। আলখেল্লাটা সবুজ ও সোনালি, তার উপর সোনার তৈরি সুতো দিয়ে নকশা করা হয়েছে, চকচক করছে আগুনের আভায়। মাথায় লম্বা হ্যাঁ, চূড়াটা সমতল, গায়ে এমব্রয়ডারি করা নক্ষত্র ও ক্রস চিহ্ন।
মোহন্তের মুখ গাছের শুকনো শিকড়ের সমষ্টি বলে মনে হবে, অসংখ্য ভাঁজ আর বালরেখা কলের ছাপ ফেলেছে। কুঞ্চিত ও ফাটা ঠোঁটের ভেতর এখনো কয়েকটা দাঁত অবশিষ্ট আছে, প্রত্যেকটি ভাঙাচোরা ও হলুদ। রূপালি-সাদা দাড়ি, চোয়ালে যেনো সাগর তীরের ফেনা জমে আছে। একটা চোখ পিকাল অপথ্যালমিয়ায় আক্রান্ত, অস্বচ্ছ নীল, সম্ভবত কিছুই দেখতে পান না; তবে অপর চোখ শিকারী চিতার মতোই তীক্ষ্ণ ও চকচকে।
চড়া, কাঁপা কাঁপা গলায় কথা বললেন তিনি। আশীর্বাদ দিই; বাছাদের মঙ্গল হোক! কনুই দিয়ে নিকোলাসকে পুঁতো মারল বোরিস, দু জনেই ওরা সামান্য মাথা নত করলো। প্রধান পুরোহিত সুর করে গান করছেন বা মন্ত্র আওড়াচ্ছেন, তিনি থামলেই কোরাস ধরছে সমবেত পুরোহিতরা।
