রোয়েনকে কাছে টেনে নিল নিকোলাস, বাকি ক্যারাভানকে থাকতে দিল ওদের সামনে। বসার একটা জায়গা খুঁজে নিচে প্যাচানো স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফ খুলল ও। নিচের দৃশ্য থেকে প্রধান প্রধান চূড়া আর বৈশিষ্ট্যগুলোকে চিহ্নিত করলো ওরা, ফলে মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া গেল কোথায় ওরা রয়েছে। এখান থেকে অ্যাবে নদী আমরা দেখতে পাব না, বলল নিকোলাস। সেটা এখনো উপ-খাদের গভীরে লুকিয়ে আছে। দেখতে পাব সম্ভবত সরাসির ওটার উপরে পৌঁছবার পর।
যেখানে আছি বলে হিসাব করলাম তাতে যদি ভুল না হয়, একজোড়া হাঁসুলিবাঁক ঘোরার পরই নদীটা দেখতে পাবার কথা–সম্ভবত ওই খাড়া পাঁচিলটার ওদিকেই বাক দুটো পাওয়া যাবে।
বোধহয়, সায় দিল নিকোলাস। আর ডানডেরা নদী অ্যাবের সঙ্গে মিলিত হয়েছে ওদিকের ওই পাঁচিলগুলোর নিচে। বুড়ো আঙুলের গিঁট ব্যবহার করলো আনুমানিক দূরত্ব মাপার জন্য। এখান থেকে প্রায় পনেরো মাইল।
দেখে মনে হচ্ছে হাজার বছরের মধ্যে কয়েকবারই গতিপথ বদল করেছে ডানডেরা। আমি অন্তত দুটো নালার আভাস পাচ্ছি, দেখতে প্রাচীন রিভার বেডের মতো। হাত তুলে দেখালো রোয়েন। ওখানে, আর ওদিকে। এখন অবশ্য জঙ্গলে ঢাকা পড়ে গেছে। নিচে আরেকবার চোখ বুলিয়ে দম আটকাল ও। কি বিশাল এলাকা! আর কি জটিল! এ দুর্গম পাথরের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা সমাধির প্রবেশপথ কীভাবে খুঁজে পাব আমরা?
সমাধি? কোন সমাধির কথা বলা হচ্ছে? পেছন থেকে সাগ্রহে জানতে চাইলো বোরিস। ওদের খোঁজে ট্রেইল ধরে পিছিয়ে এসেছে সে। তার পায়ের আওয়াজ ওরা শুনতে পায়নি। কি, চুপ হয়ে গেলেন কেন? কার সমাধি খুঁজছেন আপনারা?
কার আবার, নিরুদ্বিগ্ন নিকোলাসের ঠোঁটে হাসি লেগে থাকলো, সেন্ট ফুমেনটিয়াসের সমাধি।
মঠটা না সেন্টের নামে উৎসর্গিত? ফটোগ্রাফ পেঁচিয়ে রাখার সময় বোরিসের দিকে ফিরে রোয়েনও হাসলো।
হ্যাঁ। হতাশ দেখালো বোরিসকে, যেনো আরো ইন্টারেস্টিং কিছু শুনবে বলে আশা করেছিল। হ্যাঁ, সেন্ট ফুমেনটিয়াস। তবে ওরা আপনাদেরকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না। সন্ন্যাসীরা ছাড়া ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই কারো। ক্যাপ নামিয়ে মাথা চুলকাল সে, তার চুল তারের মতো, সুখের ঘষায় প্রায় ধাতব শব্দ উঠছে। এ সপ্তায় তিমকাত উৎসব হবে। আনন্দ-উত্তেজনার বন্যা বয়ে যাবে ওখানে। বাইরে থেকে দেখে মজা পেতে হবে, ভেতরে ঢুকতে পারবেন না।
চোখ কুঁচকে সূর্যের দিকে তাকালো সে। চলুন যাওয়া যাক। দেখে মনে হচ্ছে কাছে, কিন্তু অ্যাবেতে পৌঁছতে আরো দুদিন লেগে যাবে আমাদের। নিচে আরো কঠিন পথ, এমন কি ডিক-ডিক শিকারীর জন্যও। নিজের কৌতুকে হেসে উঠে ঘুরে দাঁড়ালো সে, ট্রেইল ধরে এগুলো।
পাহাড়-প্রাচীরের যতই নিচে নামছে ওরা ট্রেইল ততই মসৃণ হয়ে উঠছে, ধাপগুলো আগের চেয়ে অগভীর, পরস্পরের সঙ্গে দূরত্বও বাড়ছে। সহজে এগোেননা যাচ্ছে, তাই গতিও বেড়ে গেল। তবে বাতাসের মান ও স্বাদ বদলে গেছে। পাহাড়ী ঠান্ডা বাতাস উধাও হয়েছে, তার বদলে স্থান দখল করেছে শক্তিহীন নিস্তেজ বাতাস, তাতে সীমা না মানা জঙ্গলের স্বাদ ও গন্ধ লেগে আছে।
গরম! বলে উলেন শালটা গা থেকে খুলে ফেললো রোয়েন।
দশ ডিগ্রী বেশি, আন্দাজ করলো নিকোলাস। পুরানো আর্মি জার্সিটা মাথা গলিয়ে খুলে আনল, এলোমেলো হয়ে থাকলো এক রাশ কালো চুল নিচে আরো গরম লাগবে। অ্যাবেতে পৌঁছবার আগে আরো তিন হাজার ফুট নামতে হবে।
এরপর বেশ খানিকদূর ডানডেরা নদী ঘেঁষে এগিয়েছে ট্রেইল। মাঝে মধ্যে দেখা গেল নদীটা থেকে কয়েক শ ফুট উপরে রয়েছে ওরা, আবার খানিক পরই নেমে আসতে হলো কোমর সমান পানিতে, তীব্র স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যাবার ভয়ে খচ্চরের পিঠে চাপানো বোঝা আঁকড়ে ধরে আছে।
তারপর ডানডেরা নদী খাদ এতো গভীর আর খাড়া হয়ে উঠলো যে অনুসরণ করা সম্ভব নয়, পাহাড়-প্রাচীর সটান দাঁড়িয়ে আছে পানির উপর। কাজেই নদী ছেড়ে আঁকাবাঁকা ট্র্যাক ধরল ওরা, ভাঙাচোরা পাহাড় আর লাল পাথুরের ব্লাফের মাঝখান দিয়ে এগিয়েছে।
ভাটির দিকে এক কি দু মাইল এগোবার পর আবার ওরা অন্য এক মেজাজের ডানডোরার সঙ্গে মিলিত হলো, নদী এখানে ঘন ও নিবিড় বনভূমির ভেতর দিয়ে কলকল শব্দে ছুটে চলেছে। লতানো গাছের ডগা পানি ছুঁয়ে আছে, ওদের মাথায় গাছের শ্যাওলা লেগে গেল। ওদেরকে দেখে ডালে ডালে খুব লাফালাফি আর চেঁচামেচি করছে কয়েক ঝক বাঁদর। একবার নিচের ঝোঁপ ভেঙেচুরে ছুটল বড় আকৃতির একটা জানোয়ার। ঝট করে বোরিসের দিকে তাকালো নিকোলাস।
মাথা নাড়লো রুশ গাইড, হাসছে। না, ডিক-ডিক নয়। কুডু।
সারাটা দিন আঁকাবাঁকা ট্রেইল ধরে এগুলো ওরা, শেষ বিকেলে ক্যাম্প ফেললো নদীর খানিকটা উপরে, ফাঁকা একটা জায়গায়। এখানে আগেও অনেকবার ক্যাম্প ফেলা হয়েছে, লক্ষণ দেখে বোঝা গেল। ট্রেইল যেনো এখানে দুই সময়শাসিত পর্যায়ে বিরক্ত–জলপ্রপাতের মাথা থেকে মঠে নামতে ট্যুরিস্টদের পুরো তিন দিন লাগে, সবাই তারা এ একই জায়গায় ক্যাম্প ফেলে।
দুঃখিত, এখানে কোনো শাওয়ার নেই, মক্কেলদের জানালো বোরিস। হাত মুখ ধুতে চাইলে উজানের দিকে প্রথম বাঁক ঘুরলে নিরাপদ একটা পুল আছে।
রোয়েনের চোখে আবেদন, নিকোলাস, ঘামে একদম ভিজে গেছি। এমন কোথাও পাহারা দেবেন, ডাকলে যাতে শুনতে পান?
