পাহাড়-প্রাচীরকে জড়িয়ে আছে ওটা, নেমে গেছে এমন তির্যক ভঙ্গিতে, আর পাথরের ধাপগুলো পরস্পরের কাছ থেকে এতো দূরে, যে প্রতিটি পদক্ষেপে হাঁটু ও পেটের শিরা, পেশী ও চামড়ায় প্রবল চাপ পড়ে, ঝাঁকি খায় শিরদাঁড়া। ট্রেইলের পতন আরো বেশি খাড়া ও কর্কশ যেখানে, পাথর ধরে ঝুলে পড়তে হলো ওদেরকে, কিংবা ক্রল করে এগুতে হলো।
দেখে মনে হলো অসম্ভব ব্যাপার, ভারী বোঝা নিয়ে খচ্চরগুলো ওদেরকে অনুসরণ করতে পারবে না। ওগুলো যে কিরকম সাহসী, না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। পাথরের এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে লাফ দিল, পড়ার পর সামনেই দুই পা ভাঁজ হয়ে গেল, পেশী শক্ত করে তৈরি হলো পরবর্তী ধাপে লাফ দেওয়ার জন্য। ট্রেইলটা এতো সরু যে পেটমোটা বোঝা একদিকের পাথরের পাচিলে ঘষা খাচ্ছে, অপরদিকের সীমাহীন অধোগতি ফাঁক লোভীর মতো হাঁ করে আছে।
ট্রেইল যখন বেঁকে গেছে, খচ্চরগুলো লাফ দিয়ে বাক নিতে পারছে না বা একবারের চেষ্টায় এগুতে পারছে না। পিছিয়ে এসে ট্রেইলটা স্পর্শ দিয়ে অনুভব করতে হচ্ছে, পাঁচিলে গা ঘসে থেমে থেমে প্রতি বার একটু একটু করে এগুচ্ছে, ঘন ঘন দেখে নিচ্ছে খাদের কিনারা, আতঙ্কে ঘুরে গিয়ে বেরিয়ে আসছে চোখের সাদা অংশ। কর্কশ হুঙ্কার ছেড়ে, ওগুলোর গায়ে চাবুক মারছে চালকরা।
কোথাও কোথাও ট্রেইলটা পাহাড়ের ভেতর ঢুকে পড়েছে। কয়েকবার ভেতরে ঢোকা অসম্ভব মনে হলো, সরু প্রবেশমুখের দু পাশে সূচের মতো ধারালো হয়ে আছে পাথর। কোথাও আবার মুখটা এততাই সরু যে বোঝাসহ খচ্চর ভেতরে ঢুকতে পারবে না। অগত্যা পিঠ থেকে সব নামাতে হলো, খানিক দূর এগিয়ে তুলতে হবে আবার।
দেখুন! অবাক বিস্ময়ে চিৎকার দিল রোয়েন, হাত তুলে ফাঁকা দিকটা দেখালো। যাদের গভীরতা থেকে বিশাল ডানা মেলে উঠে এলো কালো একটা শকুন, ভেসে গেল প্রায় ওদের দুই হাত দূর দিয়ে, লালচে নগ্ন মাথা ঘুরিয়ে কালো চোখে তাকালো ওদের দিকে।
পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে জড়িয়ে থাকা ট্র্যাক ধরে সারাদিন এগুলো ওরা, বিকেল শেষ হয়ে আসছে অথচ এখনো অর্ধেক দূরত্বও পেরোয় নি। আরো একবার পুরোপুরি উল্টোদিকে ঘুরে গেল ট্রেইল, সামনে থেকে ভেসে এলো জলপ্রপাতের গর্জন। প্রকাণ্ড একটা ঝুল-পাথরের দিকে এগুচ্ছে ওরা, আওয়াজটা সেই সঙ্গে বাড়ছে। কোণ ঘুরে ওটাকে পেরিয়ে আসতেই বিপুল জলরাশির পতন পুরোপুরি দৃষ্টিসীমার ভেতর চলে এলো।
প্রবল বর্ষণে ঝড়ের মতো গতি পেয়ে গেছে বাতাস, মনে হলো ওদেরকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে, পাহাড়-প্রাচীরের গর্তের কিনারা আঁকড়ে ধরে কোনো রকমে ঝুলে থাকতে হলো। ওদের চারদিকে রাশি রাশি জলকণা বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, ভিজিয়ে দিচ্ছে উঁচু করা মুখ, কিন্তু ইথিওপিয়ান গাইড থামার সুযোগ না দিয়ে সোজা এগিয়ে নিয়ে চলল। এক সময় মনে হলো বর্ষণের তোড়ে উপত্যকায় ভেসে যাবে ওরা, এখনো কয়েকশো ফুট নিচে সেটা।
তারপর, যেনো মন্ত্রবলে, ভাগ হয়ে গেল বিপুল জলরাশি, স্বচ্ছ নিবিড় পতনশীল পর্দার পেছনে পা ফেলে ঢুকে পড়লো শ্যাওলা ঢাকা ও ভেজা চকচকে পাথরের গভীর ফোকরে হাজার বছর ধরে পানির তোড়ে পাহাড়-প্রাচীর ক্ষয়ে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে। গাঢ় ছায়াময় এ জায়গায় আলো আসছে শুধু জলপ্রপাত ভেদ করে, তার রঙ সবুজাভ, ফলে গা ছমছমে রহস্যময় একটা আবহ তৈরি হয়েছে, ওরা যেনো সাগরের তলায় একটা গুহার ভেতর রয়েছে।
আজ রাতে এখানে আমরা ঘুমাব, জানালো বোরিস, ওদের বিস্ময় উপভোগ করছে সে। গুহার পেছনে জ্বালানি কাঠের বান্ডিলগুলো ইঙ্গিতে দেখালো, পাশেই পাথরের তৈরি ফায়ারপ্লেস, উপরের দেয়াল ধোয়া লেগে কালো হয়ে আছে। খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে মঠ সন্ন্যাসীদের জন্য খাবার নিয়ে যায় গ্রামবাসীরা, এ জায়গা তারা কয়েকশো বছর ধরে ব্যবহার করছে।
গুহার আরো ভেতরে চলে আসায় জলপ্রপাতের শব্দ ক্রমশ ভোঁতা হয়ে এলো, পায়ের নিচে এখন শুকনো পাথর। চাকররা আগুন জ্বালার পর রোমান্টিক যদি না-ও হয়, আরামদায়ক আশ্রয় হয়ে উঠলো জায়গাটা। এক কোণে স্লিপিং ব্যাগের ভাঁজ খুলল নিকোলাস, স্বভাতই ওর পাশে রোয়েনও। দু জনেই খুব ক্লান্ত, স্লিপিং ব্যাগের ভেতর লম্বা হয়ে পেশীতে ঢিল দেওয়ার চেষ্টা করলো, গুহার ছাদে লাল-গোলাপি প্রতিফলন দেখছে।
ভাবুন একবার! ফিসফিস করলো রোয়েন। কাল আমরা স্বয়ং টাইটার পায়ের ছাপে পা ফেলব।
ভার্জিন মেরীর কথা না হয় বাদই দিলাম। হাসলো নিকোলাস।
আপনি অসহ্যরকম বিশ্বনিন্দুক, দীর্ঘশ্বাস ফেললো রোয়েন। আমার আরো ধারণা, আপনার নাক ডাকে।
আজ রাতেই সেই ফয়সালা হয়ে যাবে! কিন্তু পথের ক্লান্তিজনিত কারণে আগেই ঘুমিয়ে পড়লো রোয়েন, নাক-ডাকার শব্দ শোনা হলো না। ওর শ্বাস-প্রশ্বাস হালকা, প্রবাহমান পানির শব্দ ছাপিয়ে সামান্যই শোনা যায়। কতোকাল আগে একজন রূপসী নারীকে পাশে নিয়ে শুয়েছিল নিকোলাস! রোয়েন ঘুমিয়ে গেছে। নিঃসন্দেহ হওয়ার পর ঝুঁকে পরে ওর গাল ছুঁলো সে।
শুভরাত্রী, ছোট্ট সোনা, ফিসফিস স্বরে বলল নিক। খুব ধকল গেল আজ। নিজের ছোট্ট মেযেটাকে এমন বলেই ঘুম পাড়াতো ও।
*
ভোর হওয়ার আগেই নড়াচড়া শুরু করলো খচ্চর চালকরা। পায়ের সামনেটা দেখা যায়, এরকম আলো ফুটতেই আবার ওরা রওয়ানা হলো। পাহাড়-প্রাচীরের উপরের অংশে সকালের প্রথম রোদ লাগলো যখন, তখনও ওরা উপত্যকার মেঝে থেকে এতো উঁচুতে রয়েছে যে নিচের গোটা এলাকার উপর চোখ বুলানো সম্ভব হলো।
