টেলিস্কোপে সাইট অ্যাডজাস্ট করলো নিকোলাস। পরবর্তী শট বুলসআইনের মাত্র এক ইঞ্চি উপরে লাগলো।
একজন খাঁটি শিকারী যতো দ্রুত এবং পরিষ্কারভাবে শিকার মারতে মারবেন ততো নিপুণ তার দক্ষতা।
বন্দুকই হোক বা রাইফেল–কেমন করে স্রষ্টার সৃষ্টি আপনারা মারতে পারেন? রোয়েন বলে।
ওটা আপনাকে বুঝিয়ে বলা শক্ত, আবারো, গুলী করে নিকোলাস। এবারে, টার্গেটে লেগেছে।
এ হলো পুরুষের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। আর, শিকার কেন উচিত নয়? ঈশ্বর তো ওগুলো আমাদেরকে দান করেছেন। আপনি তো বিশ্বাসী। উদ্ধৃতি শোনান আমাকে–অ্যাক্টস টেন ভার্সেস টুয়েলভ অ্যান্ড থারটিন।
দুঃখিত, মাথা নাড়লো রোয়েন। আপনি শোনান।
শুনুন–…জগতের সমস্ত চতুষ্পদী প্রাণী, বন্য প্রাণী, হামা-দিয়ে চলা জীব, আকাশের যতো খেচর, অনুরোধ রক্ষা করছে নিকোলাস, তোমার প্রতি নির্দেশ, পিটার; জাগো এবং মারো। খাবার গ্রহণ করো।
আপনার উকিল হওয়া উচিত ছিল। কৃত্রিম হতাশায় গুঙিয়ে মতো উঠলো রোয়েন।
অথবা পুরোহিত! এগিয়ে গিয়ে টার্গেট নিয়ে আসে নিকোলাস। আদর করে হাত বোলায় রাইফেলে।
আধ ঘণ্টা পর কেসে ভরা রাইফেল নিয়ে ক্যাম্পে ফিরছে ওরা, কাছাকাছি এসে। দাঁড়িয়ে পড়লো নিকোলাস। মেহমান! বলে চোখে বাইনোকুলার তুললাম। বাহ্, নোটিশে তাহলে কাজ হয়েছে! ওখানে পেগাসাসের একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে রয়েছে, রোয়েন। চলুন দেখা যাক কী ঘটছে।
ক্যাম্পের আরো কাছাকাছি এসে ওরা দেখলো দশ কি বারোজন ইউনিফর্ম পরা সৈনিক লাল-সবুজ পেগাসাস ট্রাকের পাশে জড়ো হয়েছে, সবাই ভারী অস্ত্রে সজ্জিত। ডাইনিং তাঁবুর ফ্ল্যাপ তোলা, ভেতরে ক্যাম্প চেয়ার পেতে বসে রয়েছে জ্যাক হেলম, একজন ইথিওপিয়ান আর্মি অফিসার ও বোরিস। গভীর আলোচনায় মগ্ন।
নিকোলাস ভেতরে ঢুকতেই চশমা পরা ইথিওপিয়ান আর্মি অফিসারের সঙ্গে পরিচয় করিতে দিল বোরিস। ইনি কর্নেল টুমা নগু, সাউদার্ন গোজাম এলাকার মিলিটারি কমান্ডার।
কেমন আছেন? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস।
কর্নেল কঠিন সুরে বলল, আপনার পাসপোর্ট আর ফায়ার আর্মসের লাইসেন্স দেখান। তার চেহারা থমথম করছে। পাশে বসা জ্যাক হেলমের চোখে নগ্ন উল্লাস, নিভে যাওয়া চুরুট চিবাচ্ছে।
নিজের তাঁবু থেকে কাগজপত্র নিয়ে এলো নিকোলাস। টেবিলের উপর সেগুলো মেলে ধরে বলল, আমি জানি, ব্রিটিশ ফরেন সেক্রেটারির দেওয়া আমার পরিচয় পত্রটাও দেখতে চাইবেন আপনি। আর এটা হলো আদ্দিসআবাবা থেকে দেওয়া ব্রিটিশ অ্যামব্যাসাডরের প্রশংসাপত্র। আর এ যে, এটা দেখছেন, লন্ডনে ইথিওপিয়ার অ্যামব্যাসাডর ভদ্রলোক দিয়েছেন। আরেকটা, এটাই শেষ দিয়েছেন আপনাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, জেনারেল সাইয়ি আব্রাহা।
অলঙ্কৃত অফিশিয়াল লেটারহেড আর সরকারি সীল ছাপ্পড়ের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকলে কর্নেল নগু। সোনালি ফ্রেমের চশমার ভেতর তার চোখ দুটোয় প্রায় বিহ্বল দৃষ্টি। স্যার! লাফ দিয়ে চেয়ার ছাড়লো সে, কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে স্যালুট করলো। আপনি আগে বলেন নি কেন? জেনারেল আব্রাহার বন্ধু আপনি? জানতাম না, আমি জানতাম না! কেউ আমাকে বলে নি। বিরক্ত করার জন্য সত্যি আমি দুঃখিত, স্যার!
আবার স্যালুট করলো সে, বিব্রত বোধ করায় আনাড়ি ও আড়ষ্ট লাগছে তাকে। আমি শুধু আপনাকে বলতে এসেছিলাম যে পেগাসাস কোম্পানি এলাকায় ড্রিলিং ও ব্লাস্টিং অপারেশন চালাচ্ছে। বিপদ ঘটতে পারে। প্লিজ সাবধান থাকবেন। তাছাড়া, এলাকায় অসংখ্য ডাকাত আর শুফতা আছে, সেদিক থেকেও সাবধান থাকতে হবে আপনাকে। উত্তেজনায় হাঁপিয়ে গেছে সে, দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুঝতেই পারছেন, পেগাসাস কোম্পানিয় এমপ্লয়ীদের জন্য এসকর্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি এখানে আমরা। যে কোনো রকম বিপদে আমাকে শুধু একটা খবর দিলেই হবে, আপনার সাহায্যে হাজির হয়ে যাব আমরা।
ধন্যবাদ, কর্নেল।
আপনাকে আর বিরক্ত করব না, স্যার। তৃতীয়বার স্যালুট করে পেগাসাস ট্রাকের দিকে পিছু হটছে কর্নেল, টেক্সান ফোরম্যানকে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে। জ্যাক হেলম্ এ পর্যন্ত একটা শব্দও উচ্চারণ করে নি, কোনোরকম বিদায় সম্ভাষণ জানিয়েই চলে যাচ্ছে সে। ট্রাক চলতে শুরু করার পর ক্যাব জানালো থেকে চতুর্থ ও শেষ স্যালুটটা করলো কর্নেল নগু।
স্যালুটের উত্তরে অলসভঙ্গিতে একবার হাত নাড়লো নিকোলাস, রোয়েনকে বলল, সব মিলিয়ে বোঝা গেল, মি. পেগাসাস চান না এদিকে আমরা থাকি। সন্দেহ করছি শিগগির আবার তিনি সার্ভিস দিতে আসবেন।
ডাইনিং টেবিলের কাছে ফিরে এসে বোরিসকে নিকোলাস বলল, এখন শুধু আপনার খচ্চরগুলো এলেই হয়।
গ্রামে লোক পাঠিয়েছি। এসে পড়বে।
*
খচ্চরগুলো পৌঁছল পরদিন সকালে। ছয়টা শক্ত-সমর্থ জানোয়ার, প্রতিটির সঙ্গে খাকি শর্টস আর সাদা হাফশার্ট পরা একজন করে চালক। সকাল দশটার মধ্যে ওগুলোর পিঠে মালপত্র চাপিয়ে খাদে নামার প্রস্তুতি নিয়ে ফেললো ওরা। পথের শেষ মাথায় থামলো বোরিস, গলা লম্বা করে ঢালের দিকে তাকালো। তার মতো লোককেও অন্তত এ একবার খাদের সীমাহীন পতন ও দূরতিগম্য বিভীষিকা সন্ত্রস্ত ও নার্ভাস করে তুললাম।
আপনারা ভিন্ন এক জগতের ভিন্ন এক সময়ের ভেতর ঢুকতে যাচ্ছেন, প্রায় দার্শনিক ভঙ্গিতে বলল সে। ওরা বলে, ট্রেইলটা দু হাজার বছরের পুরানো, যিশুর বয়েসি। ডেবরা মারিয়াম গির্জার কালো পুরোহিত গল্প শোনায়, যিশু ক্রুশবিদ্ধ হবার পর ইসরায়েল থেকে পালাবার সময় ভার্জিন মেরী এ পথ ধরেই গিয়েছিলেন। মাথা নাড়লো সে। তবে কথা হলো, এখানকার লোকেরা সত্যি-মিথ্যে সবই বিশ্বাস করে। ট্রেইলে পা ফেললো সে।
