সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রোয়েনের উদ্দেশ্যে নিক বলল, মেয়েটাকে আপনার তাঁবুতে নিয়ে রাখুন। আঙুল দিয়ে কপালের উপরে এসে পড়া ভেজা চুলগুলো সরায়। আর, কোনো সমস্যা না থাকলে একটু ঘুমোই, কেমন?
*
ভোর রাতের দিকে বৃষ্টি শুরু হলো বেশ। ক্যানভাসের তাঁবুতে যেনো বাদ্য বাজালো ঝরঝর জলরাশি। হঠাৎ হঠাৎ নীলচে বৈদ্যুতিক শিখায় কেমন অপার্থিব রকম আলোকিত হয়ে উঠলো চারদিক। অবশ্য, সকালের নাস্তার সময় হতে দেখা গেল, মেঘ কেটে গেছে, উজ্জ্বল রোদে ঝকমক করছে চরাচর। মৃদুমন্দ বাতাসে মাটির সোঁদা গন্ধ।
নাস্তার টেবিলে পরম বন্ধুর মতো নিকোলাসকে অভ্যর্থনা জানালো বোরিস। গুড মর্নিং, স্যার নিকোলাস! কাল রাতে খুব মজা করলাম আমরা, কী বলেন? মনে পড়লে এখনো আমার হাসি পাচ্ছে। সাম গুড জোকস! আর এক দিন ভদকা খেয়ে ওই খেলাটা আমরা আবার খেলবো, কেমন? এ যে, নারী সূর্য, তোমার নতুন বয়ফ্রেন্ডকে নাস্তা খেতে দাও! কাল রাতে ওরকম খেলাধুলোর পর ওঁর খুব খিদে পেয়েছে।
টিসে নির্লিপ্ত ও বিষণ্ণ, চাকরদের নাস্তা পরিবেশন তদারক করছে। একটা চোখ ফুলে প্রায় বন্ধ হয়ে আছে, নিচের ঠোঁট কাটা। নিকোলাসের দিকে সে একবারও তাকাচ্ছে না।
আমরা আগে রওনা হব, কফি খাবার সময় ব্যাখ্যা করলো বোরিস। ক্যাম্প তুলে বড় ট্রাকে চড়ে পিছু নেবে চাকররা। ভাগ্য ভালো হলে আজ রাতে খাদের কিনারায় ক্যাম্প ফেলতে পারব। নামতে শুরু করব কাল।
ট্রাকে ওঠার সময় বোরিসের কান বাঁচিয়ে দু একটা কথা বলল টিসে। ধন্যবাদ, অল্টো নিকোলাস। তবে কাজটা আপনি ভালো করেন নি। আপনি ওকে চেনেন না। আপনাকে এখন থেকে সাবধান থাকতে হবে। ও ভোলে না, ক্ষমাও করে না।
ডেবরা মারিয়াম গ্রাম থেকে একটা শাখা পথ ধরে এগুলো ওরা, ডানডেরা নদীর পাশ দিয়ে এগিয়ে ছ। রাতে বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তার অবস্থা খুবই করুণ, ট্রাক ঠেলার জন্য বারবাৰ কাদায় নামতে হলো নিকোলাসকে। বড় ট্রাকটা এক সময় ধরে ফেললো ওদেরকে। বোরিস সারাক্ষণ গজগজ করছে। আমার কথা শুনলে এ ভোগান্তির মধ্যে প্যতে হতো না। রাস্তা নেই, শিকারো নেই, তবু যাব!
বিকেলে লাঞ্চ খাবার জন্য নদীর ধারে থামলো ওরা। হাত-পা থেকে কাদা ধোয়ার জন্য পানিতে নামলো নিকোলাস, পিছু নিয়ে রোয়েনও নেমে এলো। নদীর পানি হলুদ হয়ে আছে, বৃষ্টি হওয়ায় ভরাট হয়ে গেছে। ডোরা কাটা ডিক-ডিকের গল্প বোরিস বিশ্বাস করেছে বলে মনে হয় না, নিকোলাসকে সাবধান করে দিল রোয়েন।
টিসে বলছেন, আমাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ আছে তার। বুক আর বাহু ধোয়ার সময় নিকোলাসের দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকলো ও। যেখানে রোদের ছোঁয়া পরেনি–ত্বক অত্যন্ত সাদা এবং মসৃণ। বুকের গাঢ় লোমগুলো কোঁকড়া। অসাধারণ শরীর।
লাগেজ হাতড়াতে পারে, বলল নিকোলাস। আপনার লাগেজে কোনো কাগজ-পত্র বা নোট নেই তো?
শুধু স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফ আছে আর নোটবুকে যা আছে তার সবই শর্টহ্যান্ড–বোরিস বুঝবে না।
টিসের সঙ্গে কথা বলার সময় সাবধান।
তিনি খুব সরল। কারো ক্ষতি করবেন না।
বোরিস তাঁর স্বামী, ভুলে যাবেন না। অনুভূতি যা-ই বলুক, দু জনের কাউকেই বিশ্বাস করার দরকার নেই। শার্টটা ধুয়ে নিল নিকোলাস, ভিজেই পরল। চলুন।
ট্রাকের কাছে ফিরে ওরা দেখলো, সাউথ আফ্রিকান হোয়াইট ওয়াইনের বোতল খুলছে বোরিস। নিকোলাসকে একটা টাম্বলার ভরে দিল সে। টিসে ওদেরকে ঠাণ্ডা চিকেন রোস্ট আর হাতে তৈরি ইনজেরা রুটি পরিবেশন করলো। খাওয়া শেষ হতে নিকোলাসের পাশে ঘাসের উপর শুয়ে দাড়িওলা এক শকুনের দূর নীলিমায় ভেসে যাওয়া দেখলো রোয়েন। যাবার সময় হতে রোয়েনের হাত ধরে দাঁড় করালো নিকোলাস। শারীরিক সংস্পর্শ দুর্লভ একটা মুহূর্ত, নিকোলাসের আঙুলগুলো প্রয়োজনের চেয়ে এক কি দু সেকেন্ড দেরি করে ছাড়লো রোয়েন।
রাস্তার অবস্থা ভালো হওয়া তো দূরে কথা, আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। অতি কষ্টে একটা চড়াই পেরিয়ে এসে উতরাই ধরে নামতে শুরু করলো ট্রাক। অর্ধেক দূরত্ব নামার পর চুলের কাঁটার মতো বাঁক পড়লো। বাঁকটা ঘুরতেই দেখা গেল বিশাল একটা ট্রাক, প্রায় ট্রাক জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুনেছে বটে এ পথে প্রচুর ভারী যানবাহন চলাচল করে, তবে এ প্রথম একটাকে দেখলো ওরা। খুব সাবধানে ও কৌশলে ট্রাক আর উঁচু পাড়ের মধ্যবর্তী সরু ফাঁক গলে সামনে বাড়লো বোরিস।
পেছনের সীটে বসেছে রোয়েন, জানালো দিয়ে প্রকাণ্ড ডিজেল ট্রাকটা দেখতে পেল। সবুজের উপর লাল রঙে লেখা হয়েছে কোম্পানির নাম, লোগোটাও একই রঙের। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো ওর। মনে হলো, এ লোগো কিছুদিন আগে দেখেছে। অথচ মনে করতে পারছে না ঠিক কবে বা কোথায়।
বাকি পথ চুপচাপ গম্ভীর হয়ে থাকলো রোয়েন। বারবার শুধু মনে হচ্ছে ডানাওয়ালা ঘোড়ার লোগো আগেও কোথাও দেখেছে। লাল লোগগার উপর কোম্পানির নাম লেখা পেগাসাস এক্সপ্লোরেশন।
দিনের শেষে ট্র্যাকের পাশে একটা সাইনপোস্ট দেখলো ওরা। পোস্টের পায়াগুলো কংক্রিটে গাঁথা, লেখাগুলো প্রফেশনাল কারো হাতের কাজ। বোর্ডের মাথায় একটা তীরচিহ্ন আঁকা, নির্দেশ করছে বুলডোজার দিয়ে সমান করা নতুন একটা রাস্তা, বাঁক ঘুরে ডান দিকে চলে গেছে। তার নিচের লেখাগুলো পড়লো রোয়েন–
