পেগাসাস এক্সপ্লোরেশন
বেস ক্যাম্প–ওয়ান কিলোমিটার
প্রাইভেট রোড
অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ।
লাল ঘোড়া পেছনের পায়ে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে আছে, ডানা দুটো দু দিকে মেলা।
ঝট করে মনে পড়ে গেল রোয়েনের! একই ট্রাক! প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেও, মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল। আতঙ্কের একটা ধাক্কা খেয়েছে বুকে। এ ট্রাকটাই ইয়র্কে ওর মায়ের ল্যান্ড রোভারকে ব্রিজ থেকে ঠেলে নিচে ফেলে দিয়েছিল। অসম্ভব, একই কোম্পানির ট্রাক ইথিওপিয়ার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় চলে আসাটা কাকতালীয় কোনো ঘটনা হতে পারে না!
আরো কয়েক মাইল এগিয়ে খাদের খাড়া কিনারায় এসে থামলো ওরা।
আজ এ পর্যন্তই, বোরিস ঘোষণা করে। আগামীকাল পায়ে হেঁটে খাদে নামবো আমরা। ক্যাম্প ফেলল।
নিচে নেমে নিকোলাসের হাত ধরে টান দিল রোয়েন। কথা আছে, ফিসফিস করলো ও। নদীর ধারে চলে এলো দু জন।
পা ঝুলিয়ে একটা পাথরের উপর পাশাপাশি বসলো ওরা। পাশের ফুলে ওঠা নদী আভাস দিচ্ছে ওদের সামনে কী অপেক্ষা করছে। ঠাণ্ডা পাহাড়ি জলরাশি অসংখ্য পাথরের মাঝখান দিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে চলেছে। ওদের নিচে পাহাড়-প্রাচীর পাথরের খাড়া দেয়াল, প্রায় এক হাজার ফুট গভীর। ওরা এতো উপরে রয়েছে যে সন্ধ্যের আলোয়-ছায়া আর জলপ্রপাত থেকে ছড়িয়ে পড়া জলকণার ভেতর নিচের অন্ধকারো রহস্যময় লাগছে। নিচে তাকাতেই মাথাটা ঘুরে উঠলো রোয়েনের, নিজের অজান্তেই নিকোলাসকে আঁকড়ে ধরল। ধরার পর বুঝতে পারলো কী করছে, তাড়াতাড়ি আবার ছেড়ে দিল।
কিনারা থেকে হঠাৎ লাফ দিয়েছে ডানডেরা নদীর ঘোলাটে পানি। আশ্চর্যের ব্যাপার, পড়ার পথে চকচক করছে সূর্যালোকে। রঙধনুর সাত রঙ অবয়বে। নিচের কালচে পাথরে আছড়ে পড়ছে সশব্দে–অতল খাদে উড়ছে সাদাটে মেঘ।
নিকোলাস, আপনার মনে আছে, ইয়র্কে একটা ট্রাক মামির ল্যান্ড রোভারকে ব্রিজ থেকে ফেলে দিয়েছিল?
কেন মনে থাকবে না! রোয়েনের দিকে তাকালো নিকোলাস। আপনাকে আপসেট লাগছে। কী ব্যাপার?
ট্রাকটার গায়ে কোম্পানির নাম আর লোগো ছিল। নামটা আমি পড়তে পারি নি, তবে লোগোটা লক্ষ করেছিলাম। আজ বিকেলে ঠিক ওই একই ধরনের একটা ট্রাককে আমরা পাশ কাটিয়ে এসেছি। লোগা লাল আর সবুজের একটা ঘোড়া। কোম্পানির নাম পেগাসাস এক্সপ্লোরেশন।
আপনার ভুল হয় নি?
না!
একই কোম্পানির ট্রাক ইয়র্কশায়ার আর গোজামে? মেনে নেওয়া যায়?
কোম্পানি পুলিশের কাছে রিপোর্ট করে যে তাদের ট্রাক চুরি গেছে। এটা হয়তো তাদের সাজানো ব্যাপার, চুরি যাবার ঘটনা ঘটেনি, মিছিমিছি রিপোর্ট করেছে।
অসম্ভব নয়।
ডুরেঈদকে খুন করার পরও আমার উপর দু বার হামলা করেছে ওরা, বলল রোয়েন। বোঝাই যায়, বড় ধরনের আয়োজন করার ক্ষমতা রাখে তারা। মিশর আর ইংল্যান্ডে যারা আয়োজন করতে পারে, তাদের পক্ষে ইথিওপিয়ায়ও সেটা করা সম্ভব। সবচেয়ে বড়ো কথা, সপ্তম স্ক্রোল তাদের দখল রয়েছে, সেসব দেখে তারা জেনেছে অ্যাবে নদীই তাদের গন্তব্য।
হঠাৎ পাথর থেকে নেমে পড়লো নিকোলাস। আসুন।
কোথায়? রোয়েন হতভম্ব।
পেগাসাস বেস ক্যাম্পে। চলুন সাইট ফোরম্যানের সঙ্গে কথা বলি।
ওদেরকে টয়োটায় উঠতে দেখে বাধা দেওয়ার জন্য ছুটে এলো বোরিস।
আমার অনুমতি না নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?
চারদিকটা দেখতে, বলে ক্লাচ ছেড়ে দিল নিকোলাস। এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসব।
কী বলে… না! আমার ট্রাক! ধরার জন্য ছুটছে বোরিস, কিন্তু টয়োটার গতি বেড়ে যাওয়ায় পিছিয়ে পড়লো সে।
বিল করবেন। রিয়ার-ভিউ মিরবে তাকিয়ে হাসলো নিকোলাস।
সাইনপোস্ট দেখে বাঁক ঘুরলো ওরা, সাইড ট্র্যাক ধরে একটা রিজ পেরুল। চূড়ায় উঠে ব্রেক করলো ও, সামনের দৃশ্যটার উপর চোখ বুলাচ্ছে।
দশ একরের মতো জায়গা পরিষ্কার ও সমতল করা হয়েছে। জায়গাটা কাঁটাতারের উঁচু বেড়া দিয়ে ঘেরা। ভেতরে ঢোকার একটা মাত্র গেট। সবুজ ও লাল রঙ করা তিনটে প্রকাণ্ড ডিজেল ট্রাক বেড়ার ভেতর পার্ক করা রয়েছে। ছোট আরো কয়েকটা গাড়ি দেখা যাচ্ছে, আর রয়েছে একটা লম্বা মোবাইল ড্রিলিং রিগ। উঠানের আরেক অংশ দখল করে রেখেছে প্রসপ্রেক্টিং ইকুইপমেন্ট। একদিকে স্তূপ করা হয়েছে ড্রিলিং রড আর ইস্পাতের কোর বক্স, স্পেয়ার পাটস ভর্তি কাঠের বাক্স, ডিজেল ভর্তি চুয়াল্লিশ গ্যালনের কয়েকটা ড্রাম। এতো সব জিনিস, অথচ তারপরও উঠানে প্রচুর জায়গা পড়ে আছে, এর কারণ প্রতিটি জিনিস সামরিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। গেটের ঠিক ভেতরে দশবারোটা ঘর, করোগেটেড শিট দিয়ে তৈরি। বড় একটা আউটফিট, বলল নিকোলাস। নিজেদের কাজ বোঝে ওরা। চলুন দেখা যাক চার্জে কে আছে।
গেটে দু জন গার্ড, ইথিওপিয়ান আর্মির ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম পরা। অচেনা ল্যান্ড ক্রুজার দেখে বিস্মিত হয়েছে তারা। নিকোলাস হর্ন বাজাতে একজন এগিয়ে এলো, সন্দেহে কুঁচকে আছে ভুরু, হাতে বাগিয়ে ধরা এ কে ফরটিসেভেন রাইফেল।
এখানকার ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে চাই, আরবিতে বলল নিকোলাস, বলার সরে কর্কশ কর্তৃত্ব থাকলো, সেন্ট্রিদের অনিশ্চিয়তা ও অস্বস্তির মধ্যে ফেলাটাই উদ্দেশ্য।
অপেক্ষা করতে বলে সঙ্গীর কাছে ফিরে পরামর্শ করলো সেন্ট্রি, তারপর টু ওয়ে রেডিওর হ্যান্ডসেট তুলে মাইক্রোফোনে কথা বলল। কথা বলার পর পাঁচ মিনিট পেরিয়েছে, কাছাকাছি একটা ঘরের দরজা খুলে একজন শ্বেতাঙ্গ বেরিয়ে এলো।
