কাজের জন্য এগুলোই ভালো, মন্তব্য করলো নিকোলাস।
ট্রাক যখন আরেকটা পাথুরে উপত্যকায় নেমে যাচ্ছে, দিগন্তে নেমে আসছে সূর্যও। পাশেই একটা নদী, পাড় হয়ে গেছে। নদীর উপর একটা চার্চ, নল খাগড়া আর পাতায় ছাওয়া ছাদের উপর কাঠের কপটিক ক্রস বসানো হয়েছে, দেয়ালগুলো সাদা। গ্রামটা দাঁড়িয়ে আছে চার্চকে ঘিরে।
ডেবরা মারিয়াম, বলল বোরিস। ভার্জিন মেরীর পাহাড়। আর নদীর নাম ডানডেরা। বড় একটা ট্রাকে আমার লোকজনকে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছি। ক্যাম্প রেডি করে অপেক্ষা করছে তারা। আজ রাতে এখানেই আমরা ঘুমাব, কাল ভাটি ধরে এগোব, যতক্ষণ না খাদের কিনারায় পৌঁছাই।
গ্রামের ঠিক সামনে ক্যাম্প ফেলা হয়েছে। দ্বিতীয় তাবুটা আপনাদের, নিকোলাসকে জানালো বোরিস।
ওটা রোয়েনের জন্য, বলল নিকোলাস। আমার নিজের একটা আলাদা তাঁবু দরকার।
ডিক-ডিক শিকার করতে এসে আলাদা তাঁবু? বোরিসের চোখে নগ্ন বিস্ময়। আপনি আমাকে তাজ্জব করলেন, স্যার! চেঁচামেচি করে লোকজনকে ডাকলো সে, আরেকটা তাঁবু টাঙাবার নির্দেশ দিল। দ্বিতীয়টার পাশেই টাঙানো হলো সেটা। রাতে আপনার সাহস বাড়তে পারে। চাই না বেশি দূর হাঁটতে হোক আপনাকে।
বু গাম গাছের নিচু ডালে একটা ড্রাম ঝোলানো হয়েছে, ড্রামের নিচে শুকনো পাতার তৈরি অসংখ্য ফুটোয়লা দেয়াল, উপরে ছাদ নেই–এটাই ওদের বাথরুম বা শাওয়ার। প্রথমে ব্যবহার করলো রোয়েন, বেরিয়ে এলো তাজা চেহারা নিয়ে, মাথায় ভিজে তোয়ালে জড়ানো, মুখে হাসি। আপনার পালা, নিকোলাস! নিকোলাসের তাঁবুকে পাশ কাটিয়ে যাবার সময় সময় হাঁক ছাড়লো। পানি খুব গরম!
নিকোলাসের শাওয়ার সেরে কাপড় বদলাতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। সোজা হেঁটে এসে ডাইনিং তাঁবুতে ঢুকলো, আগেই এখানে জড়ো হয়েছে সবাই। আগুনের চারপাশে ফেলা হয়েছে ক্যাম্পচেয়ারে, একটাতে বসলো নিকোলাস। মেয়ে দুটো বসেছে উল্টো দিকে, কথা বলছে নিচু গলায়। হাতে গ্লাস নিয়ে নিচু টেবিলে পা তুলে দিয়েছে বোরিস। নিকোলাস বসতেই ইঙ্গিতে ভদকার বোতলটা দেখালো। বাস্কেটে বরফ আছে।
কথা না বলে মাথা নাড়লো নিকোলাস। গলাটা অবশ্য শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে, মনে মনে ভাবল বিয়ার পেলে মন্দ হতো না।
গোপন একটা কথা বলি, নিকোলাসকে বলল বোরিস। আজকাল ডোরা কাটা ডিক-ডিক বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। আদৌ কোনো কালে ছিল কিনা তা-ও আমার সন্দেহ আছে। আপনি টাকা আর সময় অপচয় করতে এসেছেন।
অসুবিধে কী, বলল নিকোলাস। ওগুলো তো আমারই।
কোন্ এক বুড়ো ভাম কবে কী মেরেছিল–এসবের কোনো বিশ্বাস আছে? দশ দিন আগে তিনটে হাতির ছাপ দেখেছি, মদ্দা হাতি, বলল বোরিস। একেকটা দাঁত একশো পাউন্ডের কম নয়।
কথা কাটাকাটি চলছে, বোরিসের ভদকার বোতল নীল নদ থেকে বন্যা নেমে যাবার মতো দ্রুত খালি হয়ে যাচ্ছে। টিসে যখন বলল ডিনার রেডি, বোতলটা সঙ্গে নিয়ে চেয়ার ছাড়লো সে। টেবিলের দিকে এগুবার সময় টলতে দেখা গেল তাকে। খেতে বসে টিসেকে কথায় কথায় ধমক দেওয়া ছাড়া আর কোনো অবদান রাখলো না।
ভেড়ার মাংস সিদ্ধ হয় নি কেন? কুকের উপর চোখ রাখো নি কেন? ওরা তো কুত্তার বাচ্চা, তুমি জানো।
আপনার মাংস কি সিদ্ধ হয় নি, স্যার নিকোলাস? স্বামীর দিকে না তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো টিসে। বললে কুককে দিয়ে সিদ্ধ করে আনাই।
একদম নিখুঁত রান্না হয়েছে, আশ্বস্ত করলো নিকোলাস। তুলোর মতো নরম মাংস আমি পছন্দ করি না।
ডিনারের শেষ দিকে দেখা গেল বোরিসের বোতল খালি হয়ে গেছে। টকটকে লাল হয়ে উঠেছে তার চেহারা, মনে হলো ফুলেছেও। টেবিল থেকে উঠে কারো সঙ্গে কথা বলল না, নিজের তাঁবুর দিকে অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
ওর হয়ে ক্ষমা চাইছি আমি। এ শুধু সন্ধ্যের দিকে ঘটে। দিনের বেলা একদম শান্ত ভদ্রলোক। ভদকা ওদের রাশিয়ান ঐতিহ্য। উজ্জ্বল হাসি দিল টিসে, শুধু চোখ দুটোয় বিষাদের ছায়া লেগে থাকলো। নিস্তব্ধতা ভারী হয়ে উঠতে চার্চ পর্যন্ত হেঁটে আসার প্রস্তাব দিল সে। ওরা রাজি হতে একজন চাকরকে ডেকে লণ্ঠন আনালো।
হাতে লণ্ঠন নিয়ে আগে আগে চললো চাকর ছেলেটা। গোলাকার ভবনের সামনে প্রাচীন এক পুরোহিত অভ্যর্থনা জানালেন দলটাকে। অসাধারণ একটা ক্রুশ হাতে ওদের হাসিমুখে স্বাগত জানালেন তিনি।
হাঁটুগেড়ে বসে আশীর্বাদ চাইলো রোয়েন আর টিসে। হাতের ক্রুশ ওদের কপালে চুঁইয়ে অ্যামহারিক ভাষায় কিছু বলল পাদ্রী। এরপর হাতছানি দিয়ে ভেতরে ডেকে নিল ওদের।
মৌলিক রঙে আঁকা অসাধারণ দেয়ালচিত্রে ভরপুর প্রার্থনালয়। লণ্ঠনের আলোয় মণিমুক্তোর মতো জ্বললো। বাইজেন্টাইন প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট চিত্রগুলোতে দেবতার চোখ বিশাল, মাথায় সোনালি মুকুট। বেদীর উপরে ভার্জিন মেরী শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন, নিচে বসে ফেরেশতারা এবং তিন ম্যাজাই। পোলারয়েড ক্যামেরা বের করে ছবি তুললাম নিকোলাস।
ছবি তোলা শেষ হতে, এক জায়গায় বসে প্রার্থনারত টিসে এবং রোয়েনের দিকে দেখলো সে।
এমন বিশ্বাস আমার যদি থাকতো! অনেকবারের মতো নিকোলাস ভাবে। কঠিন সময়ে এর থেকে সহায়তা পাওয়া যায়। রোসেলিন আর মেয়েদের জন্য এমন প্রার্থনা যদি করতে পারতাম কখনো। চার্চে থাকা বেশ কঠিন হয়ে উঠলো তার জন্য। বেরিয়ে এসে রাতের তারাভরা আকাশ দেখতে থাকে নিকোলাস।
