মেয়ে দু জনকে নিয়ে নিচে নামলো নিকোলাস। গাড়ি থেকে নেমে অপেক্ষা করছে ড্রাইভার। তার পরনে রঙচটা বুশ সুট। লম্বা সে, রোগা না হলেও গায়ে চর্বি নেই, হাঁটার সময় সামান্য ঝাঁকি খায় শরীর।
নিকোলাস আন্দাজ করলো চল্লিশের কাছাকাছি বয়েস হবে। কটা রঙের চুল ছোট করে ছাঁটা, চোখ নিপ্রভ ও নীলচে। মুখে একটা গভীর ক্ষতচিহ্ন আছে, নাক ছুঁয়ে দেওয়ায় সেটা বিকৃত দেখাচ্ছে।
টিসে প্রথমে তার সঙ্গে রোয়েনের পরিচয় করিয়ে দিল।
রোয়েন করমর্দন না করায় ভুরু কুঁচকে বাউ করলো লোকটা। এরপর টিসে নিকোলাসের পরিচয় দিল। ইনি আমার স্বামী, অল্টো বোরিস। বোরিস, ইনি অল্টো নিকোলাস।
আমার ইংলিশ ভালো নয়, বলল বোরিস।ফ্রেঞ্চ খানিকটা ভালো।
কোনো অসুবিধে নেই, ফ্রেঞ্চ ভাষায় জবাব দিল নিকোলাস। আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম। হাত বাড়ালো ও।
হ্যান্ডশেকের অজুহাতে নিকোলাসের হাতটা মুচড়ে দিতে চেষ্টা করলো বোরিস। সতর্ক ছিল নিকোলাস, এ ধরনের আধ-বুড়ো শয়তানদের চেনা আছে, মুঠোয় এতোটা জোর ছিল যে সুবিধে করতে পারলো না বোরিস। নিকোলাসের ঠোঁটে অলস হাসি। প্রথমে ঢিল দিতে হলো বোরিসকে, ক্ষীণ হলেও শ্রদ্ধার ভাব ফুটল নীলচে চোখে।
আপনি তাহলে ডিক-ডিকের খোঁজে এসেছেন? প্রশ্ন তো নয়, প্রায় খেঁকিয়ে উঠলো লোকটা। অথচ লোকের আমার কাছে আসে বড় হাতি শিকার করার জন্য।
হয় পর্বত নায়ালা।
বড় হাতিকে ভয় পাই, হাসলো নিকোলাস।
ডিক-ডিক আমার জন্য মানিয়ে যায়।
খাদে আগে কখনো নেমেছেন?
স্যার নিকোলাস ১৯৭৬ সালে নদী এক্সপিডিশনের জন্য ওখানে নেমেছিলেন। জবাব দিল রোয়েন, দু জনের মাঝখানে নীরব উত্তেজনা অনুভব করতে পারছে ও।
স্ত্রীর দিকে ফিরল বোরিস। আমার অর্ডার মতো সমস্ত রসদ আনা হয়েছে?
হ্যাঁ, কেমন যেনো ভয়ে ভয়ে জবাব দিল টিসে। প্লেনে আছে সব।
টয়োটার সামনের সিটে বসলো পুরুষরা, অসংখ্য প্যাকেট আর রসদ নিয়ে মেয়েরা বসলো পেছনে। ঘুরে ফিরে সব কিছু তাহলে দেখার ইচ্ছে নেই আপনাদের? নিকোলাসকে জিজ্ঞেস করলো বোরিস, গলার আওয়াজ হুমকির মতো শোনালো।
মানে?
লেকের আউটলেট, পাওয়ার স্টেশন, খাদের উপর পর্তুগাল ব্রিজ, নীল নদের উৎসমুখ দেখার জিনিস অনেকই আছে। দেখতে চাইলে সন্ধ্যের আগে ক্যাম্পে ফেরা সম্ভব নয়।
ধন্যবাদ, বলল নিকোলাস। তবে এ সব আগেই দেখা আছে আমার।
সারি সারি পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে পশ্চিম দিকে চলে গেছে রাস্তাটা। এলাকাটার নাম গোজাম, রাস্তার ধারে প্রচুর লোকজন দেখা গেল। সবাই খুব লম্বা, ছাগল বা ভেড়া চরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পুরুষ ও নারী সবাই প্যান্ট পরা, তবে মেয়েদের ব্লাউজের উপর উলেন শাল আছে। ইথিওপিয়ার সব এলাকার মতো গোজামের লোকজনও দেখতে খুব সুন্দর। মেয়েরা কালো হলে কী হবে, রূপ যৌবন যেনো উথলে পড়ছে। পুরুষরা বেশিরভাগই সশস্ত্র। একে ফরটিসেভেন অ্যাসল্ট রাইফেল তো আছেই, আরো আছে দু ধারি তলোয়ার।
গ্রামের কুঁড়েগুলো গোল দেয়ালের তুকুল-ইউক্যালিপটাস অথবা সাইসল। গাছের নিচে।
চোক রেঞ্জের চূড়ায় লালচে-বেগুনি মেঘের তুমুল আলোড়ন শুরু হলো। চাদির তৈরি সিকির মতো বৃষ্টির ফোঁটাগুলো, কিছুক্ষণ ঝরেই থেমে গেল। তাতেই কাদায় থকথকে হয়ে উঠলো রাস্তা।
খানিক পর শুরু হলো পাথুরে খানা-খন্দ। এমনকি ফোর-হুইল ড্রাইভ টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজারের পক্ষেও এ সব বাধা পেরিয়ে এগোনো সম্ভব নয়। ঘুরপথ ধরতে হলো, মাঝে মধ্যে গাড়ি এগুচ্ছে হাঁটা গতিতে, তা সত্ত্বেও অনবরত ঝকি খাচ্ছে। আরোহীরা।
কালাদের জানোয়ার বললেই হয়, বোরিসের গলায় ঘৃণা। রাস্তা মেরামত করার কথা চিন্তাও করে না। কেউ কিছু বলছে না, তবে রিয়ার ভিউ মিররে চোখ রেখে মেয়ে দুটোকে দেখলো নিকোলাস। দুজনেই নির্লিপ্ত।
সামনে আরো খারাপ রাস্তা পড়লো। ভারী যানবাহন চলাচল করায় চাকার ঘর্ষণে দীর্ঘ নালা তৈরি হয়েছে।
মিলিটারি ট্রাফিক? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস।
কিছু কিছু, জবাব দিল বোরিস। এদিকে শুফতাদের তৎপরতা খুব বেশি। শুফতা হলো ডাকাত সরদার আর দলত্যাগী সমর নায়ক। প্রসপেক্টিং কোম্পানির ট্রাকও আসা-যাওয়া করে। বড় একটা মাইনিং কোম্পানি গোজামে কনসেশন পেয়েছে, ড্রিলিং করার জন্য পৌঁছে গেছে তারা।
আমরা কিন্তু এখনো কোনো সিভিলিয়ান ভেহিকল দেখি নি, বলল রোয়েন। এমন কী পাবলিক বাসও না।
ব্যাখ্যা দিল টিসে, এক সময় ইথিওপিয়াকে আফ্রিকার রুটির ঝুড়ি বলা হত, কিন্তু মেনজিসটু ক্ষমতায় এসে ইকোনমির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। খাদ্য এখানে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মোটর কিনবে এমন সঙ্গতি হাতে গোনা মাত্র কয়েকজনের আছে। ছেলেমেয়েদের কী খাওয়াবে, এ চিন্তাতেই পাগল হয়ে আছে সবাই।
আদ্দিস ইউনিভার্সিটি থেকে ইকোনমিক্সে ডিগ্রি নিয়েছে টিসে, কর্কশ হাসির সঙ্গে বলল বোরিস। সব কিছু জানে সে, একটু বেশিই জানে! স্ত্রীর প্রতি এটা তার ধমকও বলা যায়, বিদ্রূপও বলা যায়। টিসে আর কোনো কথা বলল না।
বিকেলের দিকে ম্লান সূর্য উঠলো। ফাঁকা একটা এলাকার মাঝখানে গাড়ি থামাল বোরিস। আঙুল মটকাবার বিরতি। পানি ছাড়ার সময়।
মেয়ে দু জন ট্রাক থেকে নেমে বোল্ডারের আড়ালে চলে গেল। ফিরে এলো কাপড় পাল্টে। ঢোলা প্যান্টের উপর ব্লাউজ পরেছে, ব্লাউজের উপর উলের চাদর। এগুলো টিসে আমাকে ধার দিয়েছেন, নিকোলাসকে বলল রোয়েন।
