নিকোলাসকে টেনে একপাশে সরিয়ে আনল জিওফ্রে। রাজধানীর বাইরে দেশের অবস্থা সম্পর্কে ভীতিকর একটা ধারণা দিল সে।
হিজ এক্সিলেন্সি একটু উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে গোজাম-এর ওদিকে শয়তানদের বসবাস। উনি চান না আর রোয়েনকে নিয়ে ওদিকে যাও তুমি। আমি অবশ্য বলেছি, নিজেকে তুমি রক্ষা করতে জানো।
খুব অল্প সময়ের ভেতর কাজ সেরে ফিরে এলো ওইজিরো টিসে। আপনাদের লাগেজ, ফায়ার আর্মস আর অ্যামুনিশনের কাস্টমস ক্লিয়ার্যান্স পাওয়া গেছে। এটা আপনাদের সাময়িক পারমিট, ইথিওপিয়ায় যতোক্ষণ থাকবেন সঙ্গে রাখতে হবে। পাসপোর্টগুলোও রাখুন, ভিসায় সীল মারা হয়েছে। এক ঘণ্টা পর লেক টানা ফ্লাইট, কাজেই হাতে কিছুটা সময় আছে।
যদি কখনো চাকরি পেতে অসুবিধে হয়, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, মেয়েটার দক্ষতার প্রশংসা করলো নিকোলাস।
ওদের সঙ্গে ডিপারচার গেট পর্যন্ত হেঁটে এলো জিওফ্রে। বিপদ হলে আমরা আছি। জন্মেছি নেতৃত্বদানের জন্য!
জন্মেছি নেতৃত্বদানের জন্য–কথাটার মানে কী? অপেক্ষমাণ বিমানের পথে যেতে যেতে রোয়েন শুধায় নিকোলাসকে।
স্যান্ডহার্সট কলেজের আপ্তবাক্য। নিকোলাস ব্যাখ্যা করে বলে।
দারুণ, সত্যি, নিকি!
আমার কাছে নিকোলাস নামটাই বেশি অভিজাত আর সুন্দর শোনায়!
তা ঠিক। তবে নিকি, বেশ সুইট লাগছে শুনতে!
*
টুইন অটার বিমান ওদেরকে সুউচ্চ গগনে তুলে আনলেও নিচের জমিন এতো কাছে যে গ্রাম আর খেতগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এর কারণ পাহাড়ি এলাকার উপর রয়েছে প্লেন। তারপর নিচে একটা মালভূমি দেখা গেল, হঠাৎ সেটার সামনে মুখ ব্যাদান করে থাকতে দেখা গেল বিশাল এক গিরিখাদকে, আকারে এতোই বড় যে কল্পনাকেও যেনো হার মানায়। অ্যাবে নদী! সিট থেকে। সামনের দিকে ঝুঁকতে হলো রোয়েনকে নিকোলাসের কাঁধে টোকা দেওয়ার জন্য।
খাদটার কিনারা বা ধার খাড়া ও স্পষ্টভাবে কাটা, আর তারপরই ত্রিশ ডিগ্রি কোণ সৃষ্টি করে নেমে গেছে ঢাল। মালভূমির ফাঁকা ও নিঃস্ব সমতল জমিন জায়গা ছেড়ে দিয়েছে ঘন বন-জঙ্গলে আচ্ছাদিত খাদের পাঁচিলগুলোকে। এখানে সেখানে জঙ্গল ভেদ করে মাথাচাড়া দিয়ে আছে বাতিদানে সাজানো লম্বা মোমের মতো পাথরের বিশাল সব স্তম্ভ, একেকটা পাঁচ সাত তলা বাড়ির মতো বড়। কোথাও কোথাও ধসে পড়েছে পাঁচিল, সেখানে শুধু কোটি কোটি টন আলগা পাথর ছড়িয়ে আছে। পাঁচিলের গায়ে ব্লাফ তৈরি হয়েছে, সেগুলোর বিস্তার ক্রমশ উপর দিকে, মাথার দিকে কোনটার চেহারা সূচের মতো, কোনোটা আবার প্রকৃতির তৈরি ভাস্কর্য শিল্প, ঠিক যেনো মানুষের আকৃতি।
ঢল নেমেছে তো নেমেছেই, যেনো কোনো শেষ নেই, তারপর দুই ঢাল যেখানে দৃষ্টিভ্রমের কারণে মিলিত হয়েছে বলে মনে হলো, এক মাইল বা আর বেশি গভীরে, সেখানে চিকচিক করতে দেখা গেল সাপের মতো আঁকাবাঁকা নদীটাকে। কুপি বা চিমনি আকৃতির উপরের পাঁচিল দ্বিতীয় একটা কিনারা তৈরি করেছে নীল • নদের পানি থেকে পাঁচশো ফুট উপরে, এ অংশটাকে উপখাদ বলা যেতে পারে। উপখাদের পাঁচিলগুলো একদমই খাড়া, মাঝখানে লাল স্যান্ডস্টোনের উপর দিয়ে ছুটে চলেছে নদী। কোনও কোথাও খাদটা চল্লিশ মাইল চওড়া, আবার কোথাও মাত্র দশ। তবে পুরো দৈর্ঘ্য জুড়েই ভীতিকর গাম্ভীর্য আর অশেষ নির্জনতা বাসা বেঁধে আছে। মানুষের কোনো চিহ্ন চোখে পড়ে না।
ওখানেই আপনারা নামতে যাচ্ছেন, ভয় ও শ্রদ্ধা মেশানো কণ্ঠস্বর, ফিসফিস করলো ওইজিরো টিসে। নিকোলাস রোয়েন কথা বলছে না। এ ধরনের আদিম, রোমহর্ষক ও রহস্যময় প্রকৃতির মুখোমুখি হলে সব ভাষাই হারিয়ে যায়।
প্রায় স্বস্তির সঙ্গে দেখলো, ওদের নাগাল পাওয়ার জন্য উঠে আসছে উত্তরের পাঁচিল, দীর্ঘ নীল আফ্রিকান আকাশের গায়ে মাথা তুলে দাঁড়ালো চোক রেঞ্জের সারি উঁচু পাহাড়, ওদের খুদে ও ভঙ্গুর বিমানের চেয়ে অনেক ওপরে।
বাঁক ঘুরে সেই পবর্তশ্রেণীর ভেতর ডাইভ দিল বিমান। স্টারবোর্ড উইংটিপের দিকে হাত তুললাম টিসে।
লেক টানা, বলল সে। চওড়া পাত্রে ঢালা পারদের মতো টলটল করছে লেকের পানি। টানা লেক লম্বায় পঞ্চাশ মাইল, এখানে সেখানে মাথা তুলেছে কয়েকটা দ্বীপ, প্রতিটিতে একটা করে মঠ বা প্রাচীন চার্চ আছে। ল্যান্ড করার জন্য লেকের উপর দিয়ে শেষবার ওড়ার সময় প্যাপারাসের তৈরি খুদে বোটে সাদা আলখেল্লা পরা পাদ্রীদের দেখতে পেল ওরা, এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যাচ্ছে।
লেকের পাশে মেঠো স্ট্রিপে ল্যান্ড করলো অটার, পেছনে ধুলোর মেঘ উঠলো। তাল পাতার গায়ে রঙিন নকশা করা কয়েকটা ঘর, এটাই এখানকার টার্মিনাল বিল্ডিং। রোদ এতো উজ্জ্বল যে খাকি জ্যাকেটের পকেট থেকে সানগ্লাস বের করে পরতে হলো নিকোলাসকে। প্লেন থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে ও। সাদা ও নোংরা টার্মিনাল ভবনের গায়ে বুলেটের গর্ত দেখা গেল, রানওয়ের কিনারায় ঘাসের উপর পড়ে রয়েছে একটা রাশিয়ান টি-তারটিফাইভ ব্যাটল ট্যাংকের পোড়া খোল। নিকোলাসকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে অন্যান্য আরোহীরা বেরিয়ে এলো, বিল্ডিঙের পাশে ইউক্যালিপটাস গাছের ছায়ায় তাদের অস্থির আত্মীয় স্বজনরা দাঁড়িয়ে আছে। ওখানে একটাই মাত্র গাড়ি, বালি রঙের টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার। ড্রাইভারের দরজায় বড় বড় হরফে লেখা ওয়াইল্ড চেস্ সাফারি।
