প্রতি সন্ধ্যাতেই, নিকোলাসের আগমনের সময়টার জন্য উৎকণ্ঠা ভরে অপেক্ষায় থাকলো রোয়েন–যদিও নিজের কাছে স্বীকার গেল না, ভদ্রলোক কাছে থাকলে আলাদা একটা নিরাপত্তাবোধ ঘিরে রাখে তাকে।
*
শনিবার সকালে হিথরোর চার নম্বর টার্মিনালে পৌঁছে লাগেজগুলো পরীক্ষা করলো নিকোলাস। রোয়েনের কাঁধে একটা স্লিং ব্যাগ, আর নিয়েছে নরম একটা ক্যানভাস ব্যাগ। নিকোলাসের হান্টিং রাইফেলটা লেদারে মোড়া, আলাদা একটা প্যাকেটে রয়েছে একশো রাউন্ড অ্যামুনিশন। ওর সঙ্গে আর শুধু একটা লেদার ব্রীফকেস রযেছে। মাথায় পানামা হ্যাঁ, চেক-ইন কাউন্টারে থেমে বসে থাকা মেয়েটার উদ্দেশে মুচকি হাসলো।
প্লেন ছাড়ার পর দাবার খুঁটি সাজালো নিকোলাস, বোর্ডটা খোলা হয়েছে দুই সীটের মাঝখানের আর্ম-রেস্টে। কেনিয়ার জোমো কেনিয়াত্তা এয়ারপোর্টে যখন প্লেন নামছে, তৃতীয় গেমটা তখনো শেষ হয় নি। দু জনেই একটা করে জিতেছে, শেষটা অমীমাংসিত থেকে গেল। যদিও রোয়েন এগিয়ে ছিল শেষ খেলাটায়।
নাইরোবির নরফোক হোটেলে একজোড়া গার্ডেন বাংলো বুক করেছে নিকোলাস। রোয়েন বিছানায় উঠেছে দশ মিনিটও হয় নি, পাশের বাংলো থেকে নিকোলাসের ফোন পেল। আজ রাতে ব্রিটিশ হাই কমিশনে ডিনার খাচ্ছি আমরা। পুরানো বন্ধু। নরমাল ড্রেস পরলেই চলবে। আটটার দিকে বেরুতে পারবেন তো?
এ লোকের সঙ্গে সফরে বেরিয়ে আলস্যে ভেসে যাওয়ার কোনো উপায় নেই মনে মনে ভাবলো রোয়েন।
*
নাইরোবি থেকে আদ্দিসআবাবা অতটা দূরে নয়, তবে নিচের প্রকৃতি একের পর এমন সব বিচিত্র শোভা মেলে ধরছে যে এয়ার কেনিয়া ফ্লাইটের জানালার সঙ্গে আঠার মতো সেঁটে থাকলো রোয়েন। মাউন্ট কেনিয়ার চূড়াটাকে অনেক বছর পর মেঘমুক্ত দেখলো নিকোলাস, তুষার মোড়া জোড়া শৃঙ্গ রোদ লেগে চকচক করছে। তারপর শুরু হলো মরুভূমি, মরুভূমি শেষ হতে ইথিওপিয়ান মালভূমি দেখা গেল। আফ্রিকায় ইথিওপিয়ার চেয়ে পুরানো সভ্যতা শুধু মিশর, রোয়েনকে বলল নিকোলাস। আমরা, পশ্চিমারা যখন নেংটি পরে ঘুরতাম, তখনো এরা ছিল অত্যন্ত সভ্য; এদের দেব-দেবীর বিপরীতে আমরা করতাম প্যান এবং ডায়ানার পুজো।
হ্যাঁ। চার হাজার বছর আগে টাইটা যখন এ পথ দিয়ে গেছে এ এলাকার লোকজন তখনো সভ্য ছিল। এদের খুব প্রশংসা করেছে স্লোলে, বলেছে, তার কালচারের মতোই এদের কালচার উন্নত। এটা একটা ব্যতিক্রমই বলব, কারণ অন্য প্রায় সব জাতিকে নিকৃষ্ট বলে উল্লেখ করেছে সে।
আকাশ থেকে আদ্দিস যে কোনো আফ্রিকার শহরের মতোই। নতুন এবং পুরোনোর মিশ্রণ; ঐতিহ্যবাহী এবং রূপময় স্থাপত্যরীতি–দুই-ই আছে এখানে। আছে ইটের বাড়ির সঙ্গে সঙ্গে পাতায় ছাওয়া বাড়ি-ঘর।
জমিনের উল্লেখযোগ্য ব্যাপার বলতে লম্বা ইউক্যালিপটাস গাছের সারি। জ্বালানি কাঠ যোগায় এ গাছ। দরিদ্রস্য দরিদ্য এ জনপদে এ কাঠই একমাত্র জ্বালানি। চিরকাল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইথিওপিয়া। আগে হানাদার বর্বরেরা অত্যাচার করতো, এখন করে অপরিচিত রাজনৈতিক মতাদর্শ।
এতো উচ্চতার কারণে ইথিওপিয়ার বাতাস অত্যন্ত শীতল, মিঠে রাগলো রোয়েন এবং নিকোলাসের কাছে।
প্লেন থেকে নেমে টার্মিনাল বিল্ডিঙে চলে এলো ওরা।
স্যার… নিকোলাস! দু জনেই ওরা লম্বা এক তরুণীর দিকে ঘুরে দাঁড়ালো, ওদের দিকে এস্ত পায়ে এগিয়ে আসছে, হাঁটার ভঙ্গিতে নৃত্যশিল্পীর মনকাড়া সমস্ত বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। একেই বোধহয় কলঙ্কবিহীন ত্বক বলে, গাঢ় মধুর মতো রঙ, লাবণ্যে ভরপুর। মেয়ে হাসতেও জানে, যেনো কতদিনের পরিচয়। ঐতিহ্যবাহী
পূর্ণদৈর্ঘ্য স্কার্ট পরে আছে, হাঁটার সময় ফুলে উঠছে।
আমার দেশ ইথিওপিয়ায় স্বাগতম, স্যার নিকোলাস। আমি ওইজিরো টিসে। কৌতূহল আর আগ্রহ নিয়ে রোয়েনের দিকে তাকালো সে। আপনি নিশ্চয়ই ওইজিরো রোয়েন। রোয়েনের দিকে ডান হাত বাড়ালো সে। নিকোলাস লক্ষ করলো, প্রথম দর্শনেই মেয়ে দু জন পরস্পরকে পছন্দ করছে।
ওদের পাসপোর্ট নিয়ে চলে যাচ্ছিল টিসে, ফিরে এসে একটা খবর দিল। আপনারা ভিআইপি লাউঞ্জে বিশ্রাম নিন। ব্রিটিশ এমব্যাসির এক ভদ্রলোক ওখানে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করেছেন। জানি না কীভাবে খবর পেল ওঁরা।
ভিআইপি লাউঞ্জে মাত্র একজন লোককে দেখা গেল, ট্রপিকাল স্যুট পরা ব্রিটিশ, ডোরাকাটা স্যান্ডহার্সট টাই পরনে। নিকোলাসকে দেখেই সোফা ছেড়ে এগিয়ে এলো সে। নিকি! কেমন আছো, বন্ধু? ভাবিনি এতো থাকতে এখানে তোমার সঙ্গে দেখা হবে। প্রায় বারো বছর পর, তাই না?
হ্যালো, জিওফ্রে। জানতাম না এখানে চাকরি করছ তুমি।
মিলিটারি অ্যাটাশে। হিজ এক্সেলেন্সি নাইরোবি থেকে খবর পান তুমি আসছ। আমাকে জানালেন, কারণ উনি জানেন তুমি আমার পুরানো বন্ধু, স্যান্ডহার্সট কলেজের। আগ্রহ চেপে রাখতে পারছে না, বারবার রোয়েনের দিকে তাকাচ্ছে। খানিকটা হতাশ ভঙ্গি করে তার সঙ্গে রোয়েনের পরিচয় করিয়ে দিল নিকোলাস।
জিওফ্রে টেনেন্টে। আপনাকে একটু সাবধানে থাকার পরামর্শ দিব। বিষুব রেখার উত্তরে সবচেয়ে নামকরা প্লেবয়। ওর আধ মাইলের মধ্যে কোনো মেয়েই নিরাপদ নয়।
হয়েছে, এতোটা বাড়িয়ে বলতে হয় না! নিকোলাস তার যে পরিচয় দিল, তাতে জিওফ্রেকে গর্বিত ও তৃপ্ত মনে হলো। প্লিজ, এ লোক যা বলছে তার একটা কথাও বিশ্বাস করবেন না, ডক্টর আল সিমা। কুখ্যাত একজন নিন্দুক।
