বুড়ো দাদা জোনাথন-এর শিকার বিষয়ক বর্ণনা। লেখার ফাঁকে ফাঁকে হলুদ কালিতে আঁকা ছবিও রয়েছে। পাতার মাঝে পুরোনো ফুল, গাছের পাতা ইত্যাদি। শিরোনাম পড়লো নিকোলাস:
২ ফেব্রুয়ারি, ১৯০২। অ্যাবে নদীর ক্যাম্প থেকে। আজ সারাদিন বিশাল দুটো হাতিকে ধাওয়া করি, কিন্তু নাগালের মধ্যে পেলাম না। সাংঘাতিক গরম। হাল ছেড়ে দিয়ে ক্যাম্পে ফিরে এলাম। ফেরার পথে দেখি ছোট একটা হরিণ নদীর তীরে ঘাস খাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে রাইফেল তুলে ফেলে দিলাম ওটাকে। তারপর কাছ থেকে পরীক্ষা করে দেখি, এটা আসলে জীনাস মাডুকা-র সদস্য। এ প্রজাতিটা আগে কখনো দেখি নি আমি। সাধারণ ডিক-ডিকের চেয়ে আকারে এটা বড়, গায়ে ডোরা আছে। এটা সম্ভবত নতুন একটা আবিষ্কার।
কাগজটা থেকে মুখ তুললাম নিকোলাস। অ্যাবে গিরিখাদে যেতে হলে আমাদের একটা অজুহাত দরকার ডিক-ডিক সেটা এনে দিচ্ছে।
হ্যাঁ, আমিও এ বিষয়টা নিয়ে ভাবছিলাম। ইথিওপিয়া সরকার অনুমতি দেবে তো?
আমাদের উদ্দেশ্য জানতে পারলে অবশ্য দেবে না, বলল নিকোলাস। সেজন্যই তো ডিক-ডিককে ব্যবহার করব আমরা। অনুমতি নিয়ে বহু সাফারি কোম্পানি ইথিওপিয়ায় অপারেশন। চালাচ্ছে। প্রয়োজনীয় পারমিট, সরকারের নো অবজেকশন সার্টিফিকেট, যানবাহন, ক্যাম্পিং ইকুইপমেন্ট, আইনগত পরামর্শ ইত্যাদি সবই তাদের আছে। এ অভিযানের প্ল্যান আয়োজন যদি আমরা করি, কয়েক মাস সময় লেগে যাবে। সাফারি কোম্পানির সীল-ছাপ্পড় ছাড়া গেলে লোকাল জঙ্গী গ্রুপগুলোও হুমকি হয়ে দেখা দেবে।
তাহলে ডিক-ডিক শিকারী হিসেবে যাব আমরা, যাব একটা সাফারি কোম্পানির অধীনে?
একজন সাফারি অপারেটরের সঙ্গে আদ্দিসআবাবায় এরই মধ্যে যোগাযোগ করেছি আমি, অন্তত প্রথম পর্যায়ে আমরা তার সাহায্য নেব, বলল নিকোলাস। প্রয়োজনীয় সূত্র হাতে এলে দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হবে, তখন আমরা নিজেদের লোকজন আর ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করব। তৃতীয় পর্যায়টা হবে ইথিওপিয়া থেকে লুটের মাল বের করে আনা। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, কাজটা সহজ হবে না।
সত্যিই তো, বের করব…
জিজ্ঞেস করবেন না, কারণ এ মুহূর্তে জবাব দিতে পারব না।
কবে রওনা হচ্ছি আমরা?
তার আগে আরেকটা প্রসঙ্গ। টাইটার ধাঁধার যে অর্থ আপনারা বের করেছেন, ভিলা থেকে চুরি যাওয়া আপনার নোটে সেটা লেখা ছিল?
হ্যাঁ, ছিল। সব কিছুই হয় নোটে নয়তো মাইক্রোফিল্মে ছিল। দুঃখিত।
তার মানে আমরা যা জানি প্রতিপক্ষও তাই জানে।
হ্যাঁ।
তাহলে আমার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে, বলল নিকোলাস। অ্যাবে গিরিখাদে খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছতে চাই আমি প্রতিপক্ষ পৌঁছবার আগেই। ওরা আপনার ধারণা ও উপসংহার চুরি করেছে প্রায় এক মাস হয়ে এলো। কে জানে, হয়তো এরই মধ্যে . রওনা হয়ে গেছে।
কবে? আবার জিজ্ঞেস করলো রোয়েন।
নাইরোবি হয়ে আদ্দিসআবাবায় যাচ্ছি, শনিবারে। প্লেনের টিকিট কাটা হয়ে গেছে। ওখান থেকে এয়ার কেনিয়া ফ্লাইট ধরে আদ্দিসে যাবো আমরা, সোমবার দিনের মধ্য ভাগে নামবো সেখানে। আজ সন্ধ্যাতেই লন্ডনে গিয়ে রাতটা আমার ফ্ল্যাটে পার করে, কাল রওনা হবো। ইয়েলো ফিভার আর হেপাটাইটিস ইনজেকশন নেওয়া আছে?
আছে, কিন্তু নিজের মাল-সামান কিছুই তো কায়রো থেকে নিয়ে আসতে পারি নি।
ওটা লন্ডনে গিয়ে দেখা যাবে। কী কী দরকার, কিনে নিব। ইথিওপিয়ায়। ভয়াবহ গরম।
নিজের হাতের লিস্টিতে এক এক করে দাগ দিচ্ছে নিকোলাস।
এখন থেকেই ম্যালেরিয়ার প্রতিরোধমূলক টেবলেট খেতে শুরু করব আমরা। এমন এক এলাকায় যাচ্ছি, যেখানে ক্লোরোকুইন রেজিস্টেন্ট ফ্যালসিপেরাম মশা আছে, কাজেই
তালিকায় দ্রুত চোখ বুলাচ্ছে নিকোলাস।
কায়রো থেকে সবেমাত্র এসেছেন, কাজেই আপনার পাসপোর্ট ঠিক আছে। ইথিওপিয়ার ভিসা লাগবে আমাদের, তবে জানাশোনা লোক আছে, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পেয়ে যাব।
হাতের কাজ শেষ হতেই রোয়েনকে তার জিনিসপত্র প্যাক করার জন্য রুমে পাঠিয়ে দিল নিক।
যতক্ষণে কুয়েনটন পার্ক থেকে বের হচ্ছে ওরা, আঁধার ঘনিয়েছে ততক্ষণে। ইয়র্ক হাসপাতালে কিছু সময় থেমে মা-কে বিদায় বলল রোয়েন। দেখা-সাক্ষাত শেষ করে আবারো সবুজ রেঞ্জ রোভারে চড়লো সে।
নিকোলাসের শরীরের পুরুষালি সৌরভ, আর তার উপস্থিতির নিরাপত্তার ভেতর গাড়ির মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লো রোয়েন।
*
নিকোলাসের লন্ডনের বাড়িটা নাইটসব্রিজে। কুয়েনটন পার্কের মতো অভিজাত নয়, কিন্তু এখানে বরঞ্চ স্বস্তি অনুভব করলো রোয়েন। এ যেনো তার বাড়ির মতো হোক না, মাত্র দু দিনের জন্য থাকা। এ সময়টাতে খুব কমই নিকোলাসের দেখা পেল সে। শেষ মুহূর্তের টুকিটাকি ব্যস্ততায় দম ফেলার ফুরসত নেই তার। হোয়াইট হলে, সরকারি ভবনে যেতে হলো কয়েকবার। পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত এবং দূতাবাসের উদ্দেশ্যে লেখা সরকারি কাগজ নিয়ে ফিরে এলো নিকোলাস।
ইংরেজরা আসলেই সুবিধা আদায় করে নিতে সবচেয়ে পটু মনে মনে রোয়েন ভাবে। নিকোলাসের ব্যস্ততার সময়টাতে তালিকা মিলিয়ে কিছু কেনাকাটা সেরে নিল ও। পথে প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কায় কাটালো, কখন কোন্ দিক থেকে কে আবার আক্রমণ করে বসে। কেউ অনুসরণ করছে কি না–তাও নিশ্চিত হয়ে নিল রোয়েন। নিজেকেই অবশ্য চোখ রাঙালো এমন ছেলেমানুষি ভয় করছে বলে।
