হ্যাঁ, বইটা পড়ার সময় আমি ভেবেছিলাম নীল তলোয়ারটা নিশ্চয়ই ওই ব্রোঞ্জ যুগে একটা বিস্ময়কর বস্তু ছিল। কাজেই রাজপুত্রকে দেওয়ার মতো একটা উপহার হতেই পারে। তাহলে, রাজপুত্রের জনক, যিনি কিনা জনক নন, আসলে ট্যানাস? বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করলো নিকোলাস। আপাতত আপনার করা অর্থ আমি মেনে নিলাম।
ধন্যবাদ। ফারাও মামোস নামেমাত্র মেমননের জনক ছিলেন, রক্তসম্পর্কিত বাবা নন। এখানেও আবার বলা হচ্ছে, রাজপুত্রের জনক, যিনি কিনা জনক নন। মামোস, প্রিন্সকে ঈজিপ্টের, দ্বৈত মুকুট দান করে যান, উচ্চ এবং নিম্ন রাজ্যে রক্ত ও ছাই।
এটুকু হজম করতে তেমন অসুবিধে হচ্ছে না। বাকিটুকু?
এবার আসুন, হাতে হাতে ধরে। প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় এর অর্থ হতে পারে কাছাকাছি, অথবা দৃষ্টিসীমার ভেতর। হাপি হলেন নীল নদের উভলিঙ্গ দেবতা বা দেবী, তিনি কখন কি জেন্ডার গ্রহণ করবেন তার উপর নির্ভর করে। স্ক্রোলের সব জায়গায় নদীটার বিকল্প নাম হিসেবে হাপিকে ব্যবহার করেছে টাইটা।
তাহলে সপ্তম স্ক্রোল আর রাণীর সমাধিতে পাওয়া দেয়াললিপি এক করলে পুরো বক্তব্যটা কী দাঁড়াচ্ছে? জানতে চাইলো নিকোলাস।
সংক্ষেপে এই–দ্বিতীয় জলপ্রপাতের কাছাকাছি কোথাও অথবা দৃষ্টিসীমার ভেতর কোথাও ট্যানাসকে করব দেওয়া হয়েছে। তাঁর সমাধির বাইরে বা ভেতরে কোথাও একটা মনুমেন্ট অথবা লিপি আছে, যাতে মামোসের সমাধিতে যাওয়ার পথনির্দেশ পাওয়া যাবে।
দাঁতের ফাঁক দিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়লো নিকোলাস। লাফ দিয়ে শূন্য থেকে অর্থ লুফে নিচ্ছি, ফলে আমি ক্লান্ত। আমার জন্য আর কী সূত্র রেখেছেন আপনি?
আর কোনো সূত্র নেই।
কী বলছেন! আর কোনো সূত্র নেই মানে? নিকোলাস হতভম্ব।
সত্যি নেই।
আসুন ধরা যাক, নদীটা চার হাজার বছর পরও আকৃতি ও নকশায় একই রকম আছে। আরো ধরা যাক, টাইটা আসলেও ডানডেরা নদীর দ্বিতীয় জলপ্রপাতের দিকটা নির্দেশ করছেন। ওখানে পৌঁছে তাহলে আমরা ঠিক কী খুঁজবে? যদি শিলালিপি থাকে, তা কি অটুট অবস্থায় পাব? নাকি স্রোত আর রোদ বৃষ্টির অত্যাচারে ক্ষয়ে গেছে সব?
রোয়েন বলল, হাওয়ার্ড কার্টারের কাছেও এরকম অস্পষ্ট ও দুর্বল একটা সূত্র ছিল। মাত্র এক টুকরো প্যাপাইরাস, তা-ও সেটার অথেনটিসিটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় নি। অথচ ওই সূত্রই আমাদেরকে তুতেনখামেনের সমাধিতে পৌঁছে দিয়েছে।
হাওয়ার্ড কার্টারকে শুধু ভ্যালি অভ দ্য কিংস সার্চ করতে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও দশ বছর লেগে যায় তাঁর। আর আপনি আমাকে ইথিওপিয়া দিচ্ছেন, আকারে ফ্রান্সের দ্বিগুণ। কতদিন লাগবে আমাদের, ধারণা করতে পারেন?
ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়লো রোয়েন। ক্ষমা করুন আমাকে। এখানে আর থাকার কোনো অর্থ হয় না, শুধু শুধু সময় নষ্ট করছি। বরঞ্চ, হাসপাতালে মায়ের কাছে যাই।
এখন তো ভিজিটিং আওয়ার নয়।
নিজের একটা রুম আছে ওনার, রোয়েন বলে।
চলুন, আমি পৌঁছে দিয়ে আসি, ভদ্রতা করে নিকোলাস বলল।
কোনো প্রয়োজন নেই। ট্যাক্সি নিয়ে নিতে পারবো আমি। শীতল স্বরে বলে উঠলো রোয়েন।
এক ঘণ্টা লাগবে ট্যাক্সিতে করে যেতে। কাজেই, অনিচ্ছাসত্ত্বেও, সবুজ রেঞ্জ রোভারে উঠলো রোয়েন।
পনেরো মিনিট কাটলো নিঃশব্দে। কেউ কোনো কথা বলছে না। এক মনে গাড়ি চালাচ্ছে নিকোলাস। শেষমেষ সে মুখ খুলে। মাপ চাইতে খুব একটা অভ্যস্ত
নই আমি। সত্যি দুঃখিত–যদি রুঢ় ব্যবহার করে থাকি। একটু উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম।
রোয়েনের নীরবতা না ভাঙতে, নিকোলাস ফের বলে, দেখুন, যদি কথাবার্তা বলেন, তবে তো চিঠি লিখে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। অ্যাবে গিরিপথে সেটা বেশ ঝামেলার ব্যাপার হবে।
আমার তো মনে হলো–ওদিকে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা আপনার নেই। সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে বলল রোয়েন।
আমি হলাম গে এক নাছোড়বান্দা, নিকোলাস হাসছে, রোয়েন না হেসে পারে না।
সত্যি, এ ব্যাপারে আমাকেও একমত হতে হচ্ছে। আপনি একজন বর্বর নাছোড়বান্দা।
কাজেই, এখনো আমরা পার্টনার আছি–তাই না? নিকোলাস বলে।
এই মুহূর্তে এক আপনি ছাড়া আর কোনো বর্বর নেই কাছেপিঠে। কাজেই আপনিই আমার পার্টনার!
হাসপাতালের প্রবেশপথে রোয়েনকে নামিয়ে দেয় নিকোলাস। তিনটার দিকে ওকে তুলে নেবে, এ প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইয়র্কের শহরতলীর পথে রওনা হয় সে।
ইয়র্ক মিনিস্টারের কাছে সেই ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন সময় থেকেই একটা ফ্ল্যাট আছে তার। কেইম্যান আইল্যান্ড কোম্পানির নামে বরাদ্দ ওই অফিসে একটা আনলিস্টেড এবং নিরাপদ ফোন আছে। কেউই এ নম্বর ট্রেস করতে সক্ষম হবে না। রোসেলিনের সঙ্গে পরিচয়ের আগে এখানে অনেকটা সময় ব্যয় করতো সে। এখন অবশ্য কেবল গোপনীয় কাজের জন্য জায়গাটা ব্যবহার করে থাকে নিকোলাস। লিবিয়া এবং ইরাক অভিযানের সময়ও এখান থেকেই গোটা পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
বহুবছর ব্যবহার করা হয় নি। ভ্যাপসা একটা গন্ধ বাড়িতে। কেতলিতে পানি চড়িয়ে দুটো ফোন লাগালো নিকোলাস। একটা জার্সিতে অবস্থিত ব্যাঙ্কে, অপরটি কেইম্যান আইল্যান্ডে।
ওদের পরিবারে একটা কথা প্রচলিত ছিল–বুদ্ধিমান হঁদুরের অনেকগুলো পথ খোলা থাকে। এ ধরনের হঠাৎ প্রয়োজনের জন্য একটা টাকা সরিয়ে রেখেছিল নিকোলাস। এ মুহূর্তে অভিযান চালাতে হলে টাকা চাই।
